Risingbd Online Bangla News Portal

ঢাকা     মঙ্গলবার   ১৩ এপ্রিল ২০২১ ||  চৈত্র ৩০ ১৪২৭ ||  ২৮ শা'বান ১৪৪২

দেয়ালের ওপারেই হয়তো মুক্তি…

আর এস মাহমুদ হাসান || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৬:৪৮, ২ মার্চ ২০২১   আপডেট: ১৮:০৭, ২ মার্চ ২০২১
দেয়ালের ওপারেই হয়তো মুক্তি…

সম্প্রতি একটি চিড়িয়াখানায় অজগরের খাঁচার গ্রিল ধরে অসহায়ভাবে দাঁড়িয়ে থাকা একটি খরগোশের ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। জীবিত খরগোশটিকে খাঁচায় রাখা হয়েছে অজগরের খাবার হিসেবে। ও হয়তো ইতোমধ্যে জেনে গেছে মৃত্যু অবধারিত, তবুও গ্রিলের ওপারে মুক্তির খোঁজে বিভোর হয়েছে বার বার। এ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা চলছে সমাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। প্রশ্ন উঠেছে চিড়িয়াখানার মতো পরিবেশে মাংসাশী প্রাণীদের খাদ্য হিসেবে জীবন্ত প্রাণী দেওয়া কতটা যৌক্তিক? 

আমরা খাদ্য শৃঙ্খলের দিকে তাকালে দেখতে পাই বাঘ, সিংহ, নেকড়ে, হায়েনা, শিয়াল, অজগরসহ সব মাংসাশী প্রাণী প্রাকৃতিক পরিবেশে জীবন্ত প্রাণীদের শিকার করেই খায়। প্রকৃতির প্রতিটি প্রাণী খাবার ও জীবনধারণের জন্য একে-অপরের উপর নির্ভরশীল, পরিপূরক। তৃণভোজি প্রাণী গরু, ছাগল, হরিণ প্রভৃতি তৃণলতা খেয়ে জীবন ধারন করে। এসব তৃণভোজি থেকে কিছু প্রাণীকে শিকারি প্রাণীরা (প্রিডেটর অ্যানিম্যাল) তাদের প্রধান খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে জীবনধারণ করে। সাপকে আবার চিল বা শকুন শিকার করে খায়।

মাংসাশী প্রাণীরা বন্য পরিবেশে নিজে শিকার ধরে খেয়ে অভ্যস্ত। এজন্য তাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় চিড়িয়াখানাতে জীবিত প্রাণী দেওয়া হয়। তবে চিড়িয়াখানায় অধিকাংশ সময় মাংসাশী প্রাণীকে জবাই করা গবাদিপশুর মাংস দেওয়ার কারণে অল্প পরিশ্রমে আহারের ব্যবস্থা হওয়ায় প্রাণীগুলো দ্রুত অসুস্থ হয়ে পড়ে। জীবিত প্রাণী দেওয়ার ফলে মাংসাশী প্রাণী কিছুটা হলেও নিজস্ব পরিবেশ ও কর্মচাঞ্চল্য ফিরে পায়। বিশ্বের অধিকাংশ চিড়িয়াখানাতে এ পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়। কারণ হিসাবে ভেটেরিনারিয়ান চিকিৎসকেরা দাবি করেন, শিকার ধরে খেলে অজগরের প্রজনন ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। এছাড়া জীবন্ত প্রাণী না দিলে অজগর তার প্রিডেটরি আচরণ ভুলে যায়, যা তার স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।

যদিও প্রাণীপ্রেমীরা দাবি করেন, বন্যপ্রাণীরা শিকার ধরে খেয়ে অভ্যস্ত হলেও চিড়িয়াখানার পরিবেশে এ পদ্ধতি অমানবিক। তাদের কথা বিবেচনায় রেখে মাংসাশী প্রাণীকে খরগোশসহ অন্য যেকোনো প্রাণী খেতে দিতে হলে প্রশিক্ষিত কর্মী দিয়ে খাদ্যে পরিণত হওয়া প্রাণীটিকে সহজভাবে হত্যা করে তাজা খাওয়ানোর ব্যবস্থা করা যেতে পারে। একই সঙ্গে খাবার হিসেবে সরবরাহের পূর্ব পর্যন্ত ওই প্রাণীর খাদ্য, চিকিৎসাসহ তার প্রাপ্য সব অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। আর জীবন্ত প্রাণী যদি দিতেই হয়, তবে তার কষ্ট লাঘব করতে হবে।

সাপ সাধারণত জীবিত প্রাণীই খেয়ে থাকে। জীবন্ত প্রাণী খেতে দেখলে দর্শনার্থীদের বিশেষ করে শিশুদের মনে বিরূপ প্রভাব তৈরি হতে পারে, এজন্য বিকল্প পদ্ধতি হিসাবে অজগর বা অন্যান্য মাংসাশী প্রাণীকে রাতে জীবন্ত প্রাণী দেওয়া যেতে পারে। উন্নত কিছু দেশে অজগরসহ অন্যান্য সাপকে খাওয়ানোর সময় লম্বা লাঠির মাথায় মৃত প্রাণী বা মাংস রেখে নাড়ানো হয় যাতে সাপ খাবারটিকে জীবন্ত মনে করে। তবে এজন্য চিড়িয়াখানার কর্মীদের আগে প্রশিক্ষণ দিতে হবে, সাথে মাংসাশী প্রাণীকেও অভ্যস্ত করাতে হবে।

একজন মানুষের যেমন অধিকার আছে, তেমনই প্রত্যেক প্রাণীরও অধিকার আছে। চিড়িয়াখানার প্রাণীকে জীবন্ত খাদ্য দেওয়া যাবে কিনা, তার ইঙ্গিত প্রতিটা দেশের প্রাণীকল্যাণ আইনে দেওয়া থাকে। আর তাই ২০১৯ সালে বাংলাদেশে প্রণীত হয়েছে প্রাণীকল্যাণ আইন। বাংলাদেশের প্রাণী কল্যাণ আইনে জীবন্ত প্রাণী খাদ্য হিসাবে দেওয়া যাবে না এই মর্মে কোনো ধারা, উপধারা সংযোজন করা হয়নি বরং চিড়িয়াখানা পরিচালনার স্বার্থে ক্ষেত্র বিশেষ নিষ্ঠুরতাকে শিথিল করা হয়েছে।

বাংলাদেশ সরকারের প্রাণীকল্যাণ আইন ২০১৯ এর ০৬(১) ধারায় প্রাণীকে অতিরিক্ত পরিশ্রম করানো, মারধর করা, প্রয়োজনীয় খাবার না দেওয়া, খেতে না চাইলেও জোরপূর্বক খাওয়ানো, অপ্রয়োজনীয় প্রহার, অতিরিক্ত পরিশ্রম করানো, বসবাসের উপযুক্ত ব্যবস্থা না করে দেওয়া, বিরক্ত করা, ক্ষতিকর ওষুধ দেওয়া, অসুস্থ অবস্থায় বা মৃত্যু ঘটানোর জন্য কোনো প্রাণীকে লোকালয়ে ছেড়ে দেওয়া, প্রাণী দিয়ে লড়াই করানো, রাইফেল শুটিং বা তীর ছোড়া প্রতিযোগিতায় প্রাণীকে লক্ষ্যবস্তু হিসাবে ব্যবহার করা, আহত প্রাণীর চিকিৎসা না করা, অনুমোদন ছাড়া বিনোদনের স্বার্থে ব্যবহার করা, প্রভৃতি প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ হিসাবে গণ্য করা হয়েছে।

একই আইনের ০৬(৪) ধারায় বর্ণিত নিষ্ঠুরতাগুলো যদি নিজ নিজ ধর্ম কর্তৃক স্বীকৃত আচারানুষ্ঠানের জন্য করা হয়, কোনো স্বীকৃত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা গবেষণা প্রতিষ্ঠানে করা হয় অথবা চিড়িয়াখানার ব্যবস্থাপনার জন্য প্রচলিত আইন, বিধি বা নীতিমালার আলোকে চিড়িয়াখানায় রক্ষিত প্রাণীর ক্ষেত্রে কোনো কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়, তা এই আইনের আওতায় অপরাধ বলে গণ্য হবে না। 

প্রতিবেশি দেশ ভারতের Prevention of Cruelty to Animal Act 1962 (Ammended in 1982) এর ১১ ধারায় যে নিষ্ঠুরতাগুলো উল্লেখ করা হয়েছে, সেখানে প্রাণীকে জীবন্তু খাদ্য সরবরাহের কথা উল্লেখ নেই। আফ্রিকা, চায়নাতেও জীবন্ত প্রাণী খাদ্য হিসাবে সরবররাহ করতে আইনগত কোনো বাঁধা নেই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আইন The Veterinary Surgeons Act and The Humane Method of Slaughter Act-এ স্পষ্ট করা হয়েছে, প্রাণীকে জবাই করার পূর্বে অবশ্যই অজ্ঞান করতে হবে। তাই তারা মাংসাশী প্রাণীকে জীবন্ত প্রাণী দেওয়ার ক্ষেত্রে অজ্ঞান বা সদ্য মৃত প্রাণী সরবারহ করে থাকে। কিন্তু জীবন্ত প্রাণী দেওয়া যাবে না, এমন কোনো কথা আইনে উল্লেখ নেই।

প্রিডেটরের খাবার জীবন্ত যাবে না মৃত যাবে, এ বিষয়ে বাংলাদেশের জন্য নির্দিষ্ট কোনো আইন বা আইনি কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। ভেটেরিনারি সার্জন যদি জীবন্ত প্রাণী দেবার এডভাইস করেন, তবে জীবন্ত প্রাণী দেওয়া যাবে, তা নাহলে নিরুৎসাহিত করতে হবে। প্রিডেটর জোনের সামনে ছবি উঠানো নিষেধ, এটা সঠিকভাবে কার্যকর করতে হবে। কারণ, যেখানে ছবি তোলা নিষেধ, সেটা মেনে চলার বিধান নিশ্চিত করা প্রাণীকল্যাণের অংশ। 

আমাদের প্রাণীর ফিজিওলজি-ইকোলজি সম্পর্কে ভালোভাবে ধারণা রাখতে হবে। মাংসাশী প্রাণীর অভ্যাস বোঝার চেষ্টা করতে হবে। কোনো প্রাণীর পক্ষে অতিরিক্ত পক্ষপাত দেখিয়ে অন্য প্রাণীকে অভুক্ত রাখার অধিকার আমাদের নেই। কারো পক্ষপাত না করে, সব প্রকার প্রাণীর অধিকার যেন নিশ্চিত হয়, সেটা খেয়াল রাখতে হবে।

লেখক: শিক্ষার্থী, ভেটেরিনারি মেডিসিন বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

জাককানইবি/মাহি 

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়

শিরোনাম

Bulletলকডাউন: ১৪-২১ এপ্রিল। যা যা চলবে: ১. বিমান, সমুদ্র, নৌ ও স্থল বন্দর এবং তৎসংশ্লিষ্ট অফিস। ২. পণ্য পরিবহন, উৎপাদন ব্যবস্থা ও জরুরি সেবাদানের ক্ষেত্রে এ আদেশ প্রযোজ্য হবে না ৩. শিল্প-কারখানা ৪. আইনশৃঙ্খলা এবং জরুরি পরিসেবা, যেমন, কৃষি উপকরণ (সার, বীজ, কীটনাশক, কৃষি যন্ত্রপাতি ইত্যাদি), খাদ্যশস্য ও খাদ্যদ্রব্য পরিবহন, ত্রাণ বিতরণ, স্বাস্থ্যসেবা, কোভিড-১৯ টিকা প্রদান, বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস/জ্বালানি, ফায়ার সার্ভিস, বন্দরগুলোর (স্থল, নদী ও সমুদ্রবন্দর) কার্যক্রম, টেলিফোন ও ইন্টারনেট (সরকারি-বেসরকারি), গণমাধ্যম (প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া), বেসরকারি নিরাপত্তা ব্যবস্থা, ডাক সেবাসহ অন্যান্য জরুরি ও অত্যাবশ্যকীয় পণ্য ও সেবার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অফিসসমূহ, তাদের কর্মচারী ও যানবাহন এ নিষেধাজ্ঞার আওতা বর্হিভূত থাকবে। ৫. ওষুধ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি ক্রয়, চিকিৎসা সেবা, মৃতদেহ দাফন/সৎকার ৬. খাবারের দোকান ও হোটেল-রেস্তোরাঁয় দুপুর ১২টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা এবং রাত ১২টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত কেবল খাদ্য বিক্রয়/সরবরাহ করা যাবে। ৭. কাঁচাবাজার এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি সকাল ৯টা থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত উন্মুক্ত স্থানে স্বাস্থ্যবিধি মেনে ক্রয়-বিক্রয় করা যাবে || যা যা বন্ধ থাকবে: ১. সব সরকারি, আধাসরকারি, সায়ত্ত্বশাসিত ও বেসরকারি অফিস, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকবে ২. সব ধরনের পরিবহন (সড়ক, নৌ, অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ফ্লাইট) বন্ধ থাকবে ৩. শপিংমলসহ অন্যান্য দোকান বন্ধ থাকবে