Risingbd Online Bangla News Portal

ঢাকা     শুক্রবার   ২৩ এপ্রিল ২০২১ ||  বৈশাখ ১০ ১৪২৮ ||  ০৯ রমজান ১৪৪২

কে নেবেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দায়িত্ব?

সুকান্ত দাস || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৮:০৫, ৬ মার্চ ২০২১   আপডেট: ১৮:০৮, ৬ মার্চ ২০২১
কে নেবেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দায়িত্ব?

বৈশ্বিক মহামারি করোনার কারণে দীর্ঘ দিন ধরে বন্ধ রয়েছে দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলে। দীর্ঘ দিন বন্ধ থাকার পর গত বছরের শেষ দিকে শিক্ষার্থীদের  আবাসিক হল বন্ধ রেখে কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স চতুর্থ বর্ষ এবং মাস্টার্সের পরীক্ষা নেওয়ার অনুমতি দেয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। যদিও আবাসিক হল বন্ধ রেখে পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত শিক্ষার্থীদের হতাশ করেছিল। কিন্তু তারা অনেক দিনের আটকে থাকা পরীক্ষা দেওয়ার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের আশেপাশে মেস এবং বাসা ভাড়া করে থাকতে শুরু করেন। 

কিন্তু একটা প্রশ্ন সবার মনে ঘুরপাক খাচ্ছিল যে, মেসে কিংবা হলে যেখানেই থাকুক থাকবে তো শিক্ষার্থীরা। হলে থাকলে করোনার ঝুঁকি থাকবে, তাহলে কি মেসে থাকলে সেই ঝুঁকি থাকবে না? সে যাইহোক এই সিদ্ধান্ত মেনে শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা দিতে শুরু করেন। তবে এই সিদ্ধান্তও বেশি দিন স্থায়ী হলো না। শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়েছে আগামী ১৭ মে আবাসিক হল খুলবে এবং ২৪ মে থেকে ক্লাস শুরু হবে। এই সময় পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ধরনের পরীক্ষা স্থগিত থাকবে। শিক্ষামন্ত্রীর এই ঘোষণা হতাশ করেছে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের। এই ঘোষণা কতটুকু শিক্ষার্থী বান্ধব হয়েছে, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে শিক্ষার্থীদের মনে। 

অনার্স চতুর্থ বর্ষ এবং মাস্টার্সের যেসব পরীক্ষা এক বছর আগে শেষ হওয়ার কথা ছিল তা এখনো শেষ হয়নি। এতে বিভিন্ন চাকরির পরীক্ষাও দিতে পারছে না শিক্ষার্থীরা। আর আবাসিক হল বন্ধ থাকার কারণে অগ্রিম টাকা দিয়ে বাসা এবং মেস ভাড়া করেছিল যাদের পরীক্ষা শুরু হয়েছিল সেইসব শিক্ষার্থী। পরীক্ষা তিন মাস স্থগিতের ফলে তারা উভয় সংকটে পড়েছেন। এই সময় তারা মেসে থেকে কী করবেন। আবার তারা মেস ছেড়েও দিতে পারছেন না। কারণ অগ্রিম অনেক  টাকা দেওয়া রয়েছে। এই শিক্ষার্থীদের অবস্থা ‘জলে কুমির, ডাঙায় বাঘ’-এর মতো।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষার্থীই মধ্যবিত্ত এবং নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে আসা। করোনার কারণে এসব শিক্ষার্থীর পরিবারের আর্থিক অবস্থা শোচনীয়। কিন্তু যেহেতু আবাসিক হল বন্ধ এবং সময়টা শীতকাল, তাই ধার-দেনা করে অনেকে মেস ভাড়া নিয়েছিল। এছাড়া অনেক শিক্ষার্থী বিভিন্ন ধরনের কাজ করে টাকা জমিয়ে সেই জমানো টাকা দিয়ে মেস ভাড়া নিয়েছিল। হঠাৎ পরীক্ষা বন্ধের সিদ্ধান্ত মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ার মতো অবস্থা হয়েছে তাদের। একে তো পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভালো না আবার নিজেদেরও অর্থ উপার্জনের কোনো মাধ্যম নেই। এমতাবস্থায় এইসব শিক্ষার্থীদের দায়িত্ব কে নেবে? সরকার নাকি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন?

বর্তমানে দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নিরাপত্তা হীনতায় ভুগছেন। এতদিন বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকার কারণে তীব্র সেশন জট সৃষ্টির সম্ভাবনার তৈরি হয়েছে। শিক্ষার্থীদের ধারণা ছিল বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এবং শিক্ষামন্ত্রণালয় এই সেশন জট নিরসনে ব্যবস্থা নেবে। কিন্তু ঘটলো তার উল্টো। পরীক্ষা স্থগিত হয়ে গেলো। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে খুবই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। 

এছাড়া সাম্প্রতিক কালে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনার পর অস্তিত্ব সংকটে ভুগছেন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা। সবার মনে একটাই প্রশ্ন, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের দায়িত্ব আসলে কার? কিছু দিন আগে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশ্ববর্তী মেসে রাতে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্র অসুস্থ হয়ে পড়েন। জরুরি চিকিৎসার জন্য তাকে শহরে নেওয়ার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাম্বুলেন্স চাইলে তা দেওয়া হয়নি এবং সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি বলেছিলেন, ক্যাম্পাসের বাইরে থাকা শিক্ষার্থীদের দায়িত্ব প্রশাসন নেবে না। এই ঘটনা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের মনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করে এবং সবার মনে একটাই প্রশ্ন ওঠে আর তা হলো আবাসিক হল বন্ধ আবার ক্যাম্পাসের বাইরে থাকা শিক্ষার্থীদের দায়িত্ব প্রশাসন নেবে না, তাহলে ওইসব শিক্ষার্থীদের দায়িত্ব কে নেবেন?

সম্প্রতি পরপর দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের উপর হামলা হয়েছে। বরিশালে রাতের অন্ধকারে পরিবহন শ্রমিকেরা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের উপর নৃশংস হামলা চালায়। এতে অনেক শিক্ষার্থী আহত হয়েছে। এর দুই দিন পর ক্রিকেট খেলাকে কেন্দ্র করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের উপর হামলা চালিয়েছে স্থানীয়রা। এতেও অনেক শিক্ষার্থী আহত হয়। এর কিছু দিন পর ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্শ্ববর্তী এলাকার একটি ছাত্রী মেসে গভীর রাতে দফায় দফায় হয়রানির শিকার হয়েছেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন ছাত্রী। এমন হাজারো ঘটনা ঘটছে দেশের বিভিন্ন স্থানে, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে। এসব ঘটনার শিকার হওয়া শিক্ষার্থীদের দ্বায়িত্ব কে নেবেন। এর একটা ঘটনারও সুষ্ঠু তদন্ত এখনো বের হয়নি। 

প্রশাসন শুধু আশ্বাস দিয়ে যাচ্ছে, কাজের কাজ কিছু হচ্ছে না । ফলস্বরূপ বার বার এমন ঘটনার শিকার হচ্ছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। তাহলে কি শিক্ষার্থীদের কোনো মূল্য নেই? যদি থাকে, তাহলে পরিবহন শ্রমিক দ্বারা শিক্ষার্থীদের উপর হামলা চালানো হলো কেনো। এর জবাবদিহি জাতির কাছে করতে হবে। কিন্তু আসল বিষয় হলো কে জবাবদিহি করবেন, শিক্ষার্থীদের দায়িত্বই কেউ নিতে চাচ্ছেন না বর্তমানে। যদি জবাবদিহি করার কেউ থাকতেন, তাহলো নিশ্চয়ই শিক্ষার্থীদের উপর এমন নৃশংস হামলা চালানোর সাহস কেউ করতো না। 

শিক্ষার্থীরা হলো জাতির ভবিষ্যৎ। বার বার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের উপর এমন হামলা জাতির ভবিষ্যতের উপর হামলার সামিল। এই দেশের গুরুত্বপূর্ণ সব আন্দোলনে ছাত্রদের ভূমিকা ছিল অপরিসীম। ৫২'র ভাষা আন্দোলন, ৬৬'র ছয় দফা, ৬৯'র গণঅভ্যুত্থান, ৭১'র মহান মুক্তিযুদ্ধ, ৯০'র স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনসহ সব গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ছাত্ররা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন এবং দেশের জন্য, ভাষার জন্য জীবন দিয়েছেন। আর আজ স্বাধীন দেশে স্বাধীনতার স্বপক্ষের দল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় প্রতি পদে পদে হেনস্তার শিকার হচ্ছেন ছাত্ররা। 

শ্রমিকরা ছাত্রদের উপর হামলা করবে, স্থানীয়রা ছাত্রদের উপর হামলা করবে, ছাত্রীরা গণপরিবহনে হেনস্তার শিকার হবেন এই যদি হয় অবস্থা, তাহলে জাতির উন্নতি কীভাবে হবে, দেশের ভবিষ্যতের উপর এমন অবিচার হলে দেশ এগিয়ে যাবে কিসের উপর ভিত্তি করে? এসব শিক্ষার্থীদের দায়িত্বও বা কে নেবে। অভিভাবক হীন ছেলেমেয়েদের যেমন যে যা খুশি তাই বলতে পারেন, প্রতিবাদ করার কেউ নেই, তেমনি বর্তমানে শিক্ষার্থীরাও আপাতদৃষ্টিতে অভিভাবক হীন। তাই যে যেভাবে পারছেন, শিক্ষার্থীদের হেনস্তা করে যাচ্ছেন। কেউ প্রতিবাদ করছেন না। যাদের অভিভাবক হিসেবে থাকার কথা, তারা কেউই শিক্ষার্থীদের  দায়িত্ব নিতে আগ্রহী নন। এ কারণে দুষ্কৃতকারীরা বার বার শিক্ষার্থীদের তাদের লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে। কারণ তারা বুঝে গেছে, এদের সঙ্গে যত অবিচারই করা হোক না কেন, এদের পাশে কেউ দাঁড়াবেন না। এর আগেও বহুবার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে এমন আচরণ এবং হামলার ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু প্রতিবারই এসব ব্যাপার দোষীদের বিচারের আওতায় আনার প্রতিশ্রুতি পর্যন্তই থেকেছে। দৃষ্টান্তমূলক তেমন বিচার দেখা যায়নি। ফলে বার বার এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটছে। এজন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের শিক্ষার্থীদের দায়িত্ব যথেষ্টভাবে পালন না করা অনেকাংশে দায়ী। 

বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের উপর হামলাকারীদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। হলে থাকুক কিংবা মেসে সব বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নিতে হবে। দেশের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ই এখনো সবার জন্য হলে সিটের ব্যবস্থা করতে পারে নাই। তাই ক্যাম্পাসের বাইরে থাকলে তার দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয় নেবে না, এমন বক্তব্য কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়। সব শিক্ষার্থীদের দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নিতে হবে এবং শিক্ষার্থীদের সুরক্ষার ব্যাপারে আরো সচেষ্ট হতে হবে। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্ভুক্ত সাত কলেজের  পরীক্ষা চালু আছে, বিভিন্ন চাকরির পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে, মাদ্রাসাগুলো আগে থেকেই চালু রয়েছে, বিসিএসের পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে, স্কুল, কলেজ খোলার তারিখ ঘোষণা করা হয়েছে, হাটে-বাজারে  স্বাস্থ্য বিধি মানছেন না মানুষ, সারাদেশে বিভিন্ন ধরনের অনুষ্ঠান হচ্ছে। এসবে কেউ বাধা দিচ্ছেন না, সরকারিভাবে স্বাস্থ্য বিধি মেনে চলতে বললেও কেউ মানছেন না। দেশের অন্য সবকিছুই স্বাভাবিকভাবে চলছে কিন্তু শুধু বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বন্ধ রাখা হয়েছে এবং মাঝে পরীক্ষা শুরু হওয়ার পর আবার সব ধরনের পরীক্ষা স্থগিত রাখা হয়েছে। অনেক শিক্ষার্থী হঠাৎ পরীক্ষা বন্ধের সিদ্ধান্তে চরম বিপাকে পড়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উচিত শিক্ষামন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে অতিদ্রুত বন্ধ হওয়া পরীক্ষাগুলো শুরু করার ব্যবস্থা করা। 

গণপরিবহনে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের যাতে কোনো প্রকার হেনস্তার শিকার না হতে হয়, সে ব্যাপারে শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে বসে নীতিমালা প্রণয়ন করা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের দায়িত্ব। সর্বোপরি যে কোনো প্রয়োজনে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে শিক্ষার্থীদের পাশে থাকতে হবে। মনে রাখতে হবে, বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য শিক্ষার্থী নয়, শিক্ষার্থীদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়। 

লেখক: শিক্ষার্থী, পরিসংখ্যান বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়।

কুষ্টিয়া/মাহি 

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়