Risingbd Online Bangla News Portal

ঢাকা     শনিবার   ২৪ জুলাই ২০২১ ||  শ্রাবণ ৯ ১৪২৮ ||  ১২ জিলহজ ১৪৪২

নারী অবমাননার কিছু রকম-সকম 

আনিকা তাসনিম সুপ্তি || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৭:৫৯, ৮ মার্চ ২০২১  
নারী অবমাননার কিছু রকম-সকম 

প্রয়োজনীয় সব ধরনের ক্ষমতা নিয়েই নারীর সৃষ্টি হয়েছে। নারীর আছে নিজস্ব মতামত, ইচ্ছাশক্তি, কল্পনা শক্তি, নিজের পরিচয় গড়ার মনমানসিকতা আরো অনেক কিছু, যা কিছু জন্ম থেকেই নারীর ভেতর প্রোথিত থাকে। কিন্তু কিছু স্বার্থান্বেষী মানুষের স্বার্থ রক্ষার চেষ্টা আর ভীরুতার কারণে নারীর এসব জন্মগত ক্ষমতাকে শুরুতেই নষ্ট  করা হয় বিভিন্ন অযুহাতে বিভিন্নভাবে। 

অনেক আফসোস হয় যখন দেখি প্রতিটি মানুষের মতোন নারীরও সব ধরনের কাজ করার ইচ্ছা আগ্রহ ক্ষমতা থাকার পরও নারীকে নতুন করে তার ক্ষমতার প্রমাণ দিতে হয়। এরপরও নারী এগিয়ে যেতে পারে না, তাকে টেনে ধরা হয় সরাসরি কিংবা কৌশলে। নারী জাতকে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তার নিজস্ব সব জন্মগত অধিকার জোর করে আদায় করে নিতে হয়। 

অবমাননার রকম সকম

সমাজের বা ধর্মের কিছু সুন্দর এবং অপরিহার্য প্রথা আছে, এর মধ্যে বিবাহ প্রথা একটি যা নারী ও পুরুষকে নতুন জীবনের সন্ধান দেয়। কিন্তু আমাদের সমাজে বিবাহ প্রথা যেনো দিনদিন নারীকে দমিয়ে রাখার বা তাকে বলি দেওয়ার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে! কিছুক্ষেত্রে এমন ভাবতেও বাধ্য হই যেনো নারীর জন্মই হয়েছে বিয়ে করার জন্য! সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত গুণাবলী ছাড়াও নারীর অর্জিত জ্ঞান, যোগ্যতা, শিক্ষা সবকিছুই যেনো বিয়ে করার জন্যই! বিয়ের মাধ্যমে যেনো আরেকবার নারীর পরীক্ষা নেওয়ার জন্য মুখিয়ে থাকে অন্ধকার সমাজের প্রতিনিধিরা। 

বহু আগে থেকেই বিবাহ পরবর্তী জীবনে নারীকে একাধিক মানুষের সাথে মানিয়ে চলতে হয়, তাদের মন বুঝতে হয়, তাদের খুশি করার কাজে নিয়োজিত হতে হয়! এর অন্যথা হলে বা এসব কাজে নারী ব্যর্থ হলে নারীর নামের সাথে বিচিত্র রকমের বিশেষণ লাগানো হয় যেনো নারীর জন্মই হয়েছে অন্যের মনোরঞ্জনের জন্য। অথচ যুক্তি কিন্তু তা বলছে না! নারী একা একজন মানুষ যে কিনা নিজের পরিচিত গণ্ডি ছেড়ে বেরিয়ে আসতে বাধ্য হচ্ছে সেই নারীকেই কেনো একাধিক মানুষের মনের উপর নির্ভর করতে হবে? 

যুক্তির কথা বাদ দিয়ে যদি মানবিকতা কিংবা সামাজিকতার কথা বলি তাতেও এই এক জায়গায় খটকা থেকেই যাচ্ছে৷ অনেকে নারীর অবমাননার পক্ষে ধর্মের বিভিন্ন বিষয়ের ভুল ব্যাখ্যা দিতে সদা প্রস্তুত থাকে। নারীর উপর দায়িত্ব পালনের বদলে নারীর উপর কর্তৃত্ব ফলানোতেই পুরুষতান্ত্রিক সমাজ এবং ধর্মের ভুল ব্যাখ্যায় বিশ্বাসী মানুষদের বেশি আগ্রহ। কিন্তু সেসব তথাকথিত ধর্মবিশ্বাসীরা ভুলে যায় যে ধর্মে মানবিকতা এবং ন্যায়ের প্রাধান্যই আগে। 

পারিবারিক ও সামাজিক অবমাননা 

সবচেয়ে দুঃখজনক এটিই যে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে একটি মেয়েকে এসব পরনির্ভরশীল চিন্তাভাবনা করতে তার আপন পরিবারই বাধ্য করে। একটা সময় ছিল যখন নারীকে ছোটবেলা থেকেই এমনভাবে গড়ে তোলা হতো যাতে সে ধরেই নিত তাকে সবসময় কারো না কারো অধীনেই থাকতে হবে। কোন মেয়ে এর বাহিরে ভাবতে গেলেই সবাই মিলে তার চিন্তাধারা ভুল প্রমাণের চেষ্টায় মত্ত হয়। এই ধরনের চিন্তাধারার পিছনে কারণ হিসেবে লেবেল লাগানো থাকে নারীর নিরাপত্তার বিষয়টি। কিন্তু যেইসব মানুষের মতো দেখতে অমানুষের কারণে নারী আজ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে সেই গোষ্ঠীর প্রতি যেনো কারো কোনো রাগ নেই বরং কিছুক্ষেত্রে আছে এক অঘোষিত সমর্থন। 

এখন এমন এক সময় চলছে যেখানে যুগের সাথে তাল মিলিয়ে নারীকে শিক্ষার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে, স্বাধীন চিন্তাভাবনা, মতপ্রকাশের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে কিন্তু নির্দিষ্ট সময় পর নারীকে টেনে হিচঁড়ে সেই পুরোনো দাসত্বের জায়গায়ই নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। নারীর নিরাপত্তার কথা যদি বলতেই হয় তাতে বর্তমান বিভিন্ন ঘটনার প্রেক্ষিতে এটাই সত্য যে একজন নারী কোথাও ই নিরাপদ নয়। তাই নিরাপত্তার উছিলায় নারীকে দমিয়ে রাখার চেষ্টা অযৌক্তিক। বরং যেই ধরনের মানুষদের কারণে আজ নারী নিরাপদ নয় তাদের অবাধ চলাফেরায় ব্যাঘাত ঘটানো উচিত। নারীর দুর্বলতা বা অক্ষমতার জায়গা ত নারীর নিজের সৃষ্টি নয়, এ ও সমাজেরই সৃষ্টি। এই দূর্বলতার অবস্থান নারীর শরীর কিংবা মনে নয়, এই দূর্বলতা বিরাজ করছে সমাজের ভীরু এবং সুবিধাবাদী মানুষের মনে আর চিন্তাধারায়।

নারীর ব্যক্তিস্বাধীনতা 

নির্দিষ্ট কারো অধীনে চলার জন্য নারীর জন্ম হয়নি। নারী মানুষ নামেরই এক বস্তু! হয়ত পুরুষের চাইতে আলাদা জাত, হয়ত শারীরিক বা মানসিকভাবে আলাদা গঠন বা চিন্তাভাবনার অধিকারিণী কিন্তু নারী মানুষই৷ ব্যক্তিস্বাধীনতা জগতের যেকোন ধরনের যেকোন জাতের প্রতিটি মানুষের জন্যই চিরন্তন সত্য। এই চিরন্তন সত্যকে যদি কেউ নিজস্ব স্বার্থ হাসিলের জন্য কিংবা মানসিকতার অযাচিত সীমাবদ্ধতার কারণে অস্বীকার করে তার দায় সম্পূর্ণ সেই ব্যক্তির! আর ব্যক্তিস্বাধীনতার ব্যাঘাত ঘটানোকে বড় ধরনের অন্যায়ই বলা চলে। 

নারীর প্রতি নারীর অবমাননা

সবচেয়ে দুঃখজনক এটিই যে নারীর ব্যক্তিস্বাধীনতায় আঘাত হানা অন্যায়কারী গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত শুধু পুরুষ নয়, নারীও। কিছুক্ষেত্রে এমন উদাহরণও পাওয়া যায় যেখানে বুঝে বা না বুঝে নারীই নারীকে মানুষের মতোন বাঁচতে দেওয়ার পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়। কিছুক্ষেত্রে দেখা যায় কিছু মা নিজেই তার ছেলে সন্তানকে শুধুমাত্র একজন পুরুষ হিসেবে গড়ে তোলার কাজেই নিয়োজিত! সেসব মহিলাদের মাথায় এই জিনিস কাজ করে না যে তার সন্তানকে আগে মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা জরুরি!

কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায় কিছু মা তার মেয়েকে প্রতিমুহূর্তে এই জিনিসটি মাথায় ঢুকানোর জন্যই ব্যস্ত থাকে যে সে একটি মেয়ে, সমাজের যা কিছু যৌক্তিক বা অযৌক্তিক সবই তার মেনে নিতে হবে! কিন্তু ভুলেও এটি কখনই বলে না যে সবার আগে সে মানুষ, সবার মতোই তার অধিকারও সমান! শুধু কুসংস্কারকে এর পেছনে দায়ী করা যায় না। কুসংস্কারকে এড়িয়ে যেতে পারলেও অনেক নারী সমাজের গৎবাঁধা বস্তাপঁচা কিছু রীতিকে এড়িয়ে যেতে পারে না। তবে কারণ যা ই থাকুক না কেনো, দিনশেষে একজন নারীর প্রতি অন্য নারীর অবমাননা কোনো ক্ষেত্রেই কাম্য নয়! 

অনুপ্রেরণায় বাঁধা

মা এবং বাবা প্রতিটি মেয়ের জীবনের প্রথম এবং প্রধান অবলম্বন। বর্তমানের নোংরা এবং স্বার্থপর সমাজে টিকে থাকার জন্য হোক অথবা নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য হোক জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে  যতটুক মানসিক জোর প্রয়োজন নারী তা সর্বাংশে  শুষে নিতে পারে একমাত্র তার মা বাবার অনুপ্রেরণার মাধ্যমেই। নারী সমাজে মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারলে এ সম্মান শুধু নারীর নয়, এ সম্মান সর্বাংশে নারীর মা বাবার এবং অনেকাংশে নারীর পরিবারের। তবে আফসোস হয় যখন দেখি কিছু মা বাবা নিজের মেয়ে সন্তানকে প্রতিষ্ঠিত করার মাধ্যমে সম্মান অর্জনের চাইতে সমাজের দাসত্ব করাকেই বেশি সম্মানের মনে করেন!

নারী অবমাননার সেকাল একাল

সুদূর অতীতে নারীর প্রতি যে অবমাননা বা নারীকে দমিয়ে রাখার যে চেষ্টা ছিল তাকে মানবিকতা বিরুদ্ধ বলা গেলেও সরাসরি অন্যায় বলা যায় না কারণ এসবের পেছনে তখন অনেক শক্তিশালী কারণ ছিল, ছিল ধর্মের অযৌক্তিক বাড়াবাড়ি, বংশের রীতিনীতি, সবক্ষেত্রে মূর্খতার পদচারণাসহ আরো অনেক বিষয়। কিন্তু বর্তমানে নারীর সবধরনের অবমাননাই ইচ্ছাকৃত অবমাননা, যা সরাসরি অন্যায়। 

বর্তমানে নারীর অবমাননার প্রধান কারণ পুরুষের আধিপত্যে ভাগ বসানো! পুরুষ এখন বুঝতে পেরেছে নারী তাদের চেয়ে মোটেই নিচু জাত না, নারী তাদেরই সমান জাত আর তখন থেকেই একশ্রেণির পুরুষ যেনো গায়ের জোরে কিংবা আরো ঘৃণ্য কিছু উপায়ে নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখার চেষ্টায় মত্ত। একজন নারীর যা কিছু প্রথাবিরুদ্ধ কিন্তু সৃজনশীল তাতে সমালোচনায় গলা উঁচানো গোষ্ঠীকে অনায়াসে হিংসাত্মক আদিম কিংবা ভীরু মনোভাবসম্পন্ন বলে অভিহিত করাই যায়। সময়ের হিসেবে বা শুধুমাত্র লিখিতভাবে বর্তমানে আমরা এক আধুনিক সময়ে বাস করছি। কিন্তু এই আধুনিকতা শুধুমাত্র উপর উপর আধুনিকতা! ভিতরে ভিতরে নীতি নৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে আমরা  দিনদিন আদিম যুগেরই প্রতিনিধি হয়ে যাচ্ছি! 

প্রথা সংস্কারে বাঁধার দেয়াল

যুগের সাথে সাথে কিছু প্রথার গঠনমূলক সংস্কার প্রয়োজন এবং সংস্কার হচ্ছেও। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই সংস্কার যখন নারীর মাধ্যমে ঘটে তখুনি শুরু হয় বিচিত্র ধরনের অপ্রাসঙ্গিক কাঁদা ছুড়াছুড়ি যাতে করে আমাদের অবস্থানে লোকদেখানো উন্নতি হলেও সত্যিকার উন্নতির বদলে অবনতিই হচ্ছে বেশি। এইসব কাঁদা ছুড়াছুড়ি বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পরিবার থেকেই শুরু হয়৷ সবচেয়ে লজ্জাজনক এটিই যে রাষ্ট্র বা সমাজের অগ্রগতির পেছনে নারীর যে পরিমাণ অবদান আছে, নারীর সমানাধিকার অর্জনে রাষ্ট্র বা সমাজ সেই পরিমাণ সহযোগিতা করতে পারে নি! বরং কিছু ক্ষেত্রে বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং এখনো দাঁড়াচ্ছে। 

নারীর স্বাবলম্বীতা 

জগতের সকল নারী সকল ক্ষেত্রে স্বাবলম্বী হোক৷ সাথে স্বাবলম্বী হোক পরনির্ভরশীল পুরুষরাও। কারণ বর্তমান যুগে শুধুমাত্র অর্থ উপার্জন করতে পারাকেই স্বাবলম্বীতা ধরা হলেও সত্যিকার স্বাবলম্বী তারাই যারা নিজেদের আর্থিক প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি জীবন ধারণে প্রয়োজনীয় সকল কাজ নিজে করার যোগ্যতা রাখে। এই হিসেবে সূক্ষ্ম বিশ্লেষণে কিছু পুরুষও পরনির্ভরশীল, তারা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নারীর উপর নির্ভরশীল কিন্তু নারীর অবদান স্বীকারে তাদের বড়ই আপত্তি। শুনতে তিক্ত লাগলেও বাস্তবতা এই যে, নারীরাও কিছুক্ষেত্রে সম্পূর্ণ স্বাবলম্বী এবং যথারীতি তা স্বীকার করতেও ভীরু গোষ্ঠীর আপত্তি!

বাধা পেরিয়ে সাফল্যের পথে

যুগ বদলেছে এবং এখনো বদলাচ্ছে। জগতে এখন সফল নারীর সংখ্যা কম নয়। যারা সফল সেই সকল নারীদের মধ্যে কিছু নারীর সফলতার কাহিনী খুব করুণ। তারা সারা দুনিয়ার প্রতিটি ক্ষেত্রের পাশাপাশি আপন মানুষদের সাথেও একপ্রকার যুদ্ধ করেই জীবনে জয়ী হয়েছে৷ তাদের সাফল্য তাদের একার৷ যেসব পুরুষ নারীকে মূল্য দিতে জানে, নারীর শক্তিকে কাজে লাগাতে নারীর পথে বাঁধা না হয়ে বরং প্রতিটি ক্ষেত্রে নারীকে এগিয়ে দেয়, নারীর জীবনে অযাচিত খবরদারি না করে নারীকে উৎসাহ দেয়, তারাই নারীদের সফলতার অংশীদার হয়ে নিজেদেরও উজ্জ্বল করার অধিকার রাখে।

শেষ আহ্বান

প্রতিটি দিনই নারীদের। তবুও আজ নারী দিবসে শুভেচ্ছা জানাই পরিবার ও সমাজের কুসংস্কার ও অযাচিত ভীরুতার বিরুদ্ধে যুদ্ধজয়ী নারীসহ সকল নারীদের৷ সাথে শুভেচ্ছা জানাই সেইসকল পুরুষকে যারা আজ নারীর সফলতার সমান অংশীদার হতে পেরেছে। তবে সেই অংশীদার পুরুষরাসহ সকল নারীদের প্রতি নারী দিবসে একটাই আহ্বান-নারীর অবমাননার জন্য দায়ী সব মানুষের অযাচিত চিন্তায় আঘাত হানুন, সেই অবমাননাকারী পুরুষ কিংবা নারী যেই হোক না কেনো। 

আর পুরুষের প্রতি একটাই আহ্বান, নারীর এগিয়ে যাওয়ার পথে সাহায্য করতে না পারলেও অন্তত তাদের পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়াবেন না।

লেখক: শিক্ষার্থী, লোকপ্রশাসন বিভাগ, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়।

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়