Risingbd Online Bangla News Portal

ঢাকা     রোববার   ১৬ মে ২০২১ ||  জ্যৈষ্ঠ ২ ১৪২৮ ||  ০৩ শাওয়াল ১৪৪২

পাবজি, তিন পাত্তি ও ফ্রি-ফায়ারেই দিন পার 

রফিক সরকার || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৩:০১, ২২ এপ্রিল ২০২১   আপডেট: ১৫:৩৩, ২২ এপ্রিল ২০২১
পাবজি, তিন পাত্তি ও ফ্রি-ফায়ারেই দিন পার 

করোনাভাইরাসের (কোবিড-১৯) কারণে এক বছরেরও বেশি সময় ধরে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ। এই অবসর সময়ে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা মোবাইলে গেমের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। প্রযুক্তির হাত ধরে গাজীপুর জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলেও মোবাইলে ইন্টারনেট চলে গেছে। আর সেই সুবাদে স্থানীয় কিশোর, তরুণ ও যুবকরা পাবজি, তিনপাত্তি, ফ্রি-ফায়ার গেমসে ঝুঁকে পড়ছে। 

সরেজমিনে দেখা গেছে, উপজেলার প্রতিটি ইউনিয়নে উঠতি বয়সের শিক্ষার্থীরা ও পুরো যুব সমাজ দিন দিন পাবজি, তিনপাত্তি, ফ্রি-ফায়ার নামক গেম খেলছে। যে সময় তাদের ব্যস্ত থাকার কথা শিক্ষা, বই পাঠ, ও খেলা ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে, সে সময়ে তারা প্রযুক্তির কল্যাণে ঘরকুনো হয়ে এসব নেশায় বুঁদ হয়ে পড়ে আছে। ১০ বছর থেকে ২৫ বছর বয়সী এসব শিশু, কিশোর ও তরুণরা প্রতিনিয়ত স্মার্ট ফোন দিয়ে গেমে আসক্ত হচ্ছে। এসব গেম থেকে শিক্ষার্থী বা তরুণ প্রজন্মকে ফিরিয়ে আনতে না পারলে বড় ধরনের ক্ষতিতে পড়ার সম্ভাবনা দেখছেন স্থানীয় সচেতন মহল।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পাবজি গেমে আসক্ত এক যুবক জানান, প্রথমে তার কাছে পাবজি গেম ভালো লাগত না। কিছু দিন বন্ধুদের দেখাদেখি খেলতে গিয়ে এখন তিনি আসক্ত হয়ে গেছেন। এখন গেমস না খেললে তার অসস্তিকর মনে হয়।

স্থানীয় দশম শ্রেণির আরেক শিক্ষার্থী জনায়, সে পূর্বে এসব গেমস সম্পর্কে কিছু জানতো না। এখন সে নিয়মিত এসব গেমস খেলে। মাঝে মধ্যে গেমস খেলতে না পারলে মুঠোফোন ভেঙে ফেলার ইচ্ছাও হয় তার। এসব গেমস যে একবার খেলবে, সে আর ছাড়তে পারবে না বলে দাবি করে ওই শিক্ষার্থী।

মোবাইল গেমের আসক্তিকে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা বলে আখ্যা দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। সংস্থাটি এই প্রথমবারের মতো এটাকে একটা মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করলো। যেটাকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে রোগব্যাধির শ্রেণি বিন্যাসের তালিকায় ‘গেইমিং রোগ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

এবিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষাক্ষীর মায়ের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি জানান, করোনায় সবচেয়ে বেশি শিক্ষার্থী আসক্ত হচ্ছে এ খেলায়। শিক্ষার্থীরা পড়ালেখা নিয়ে ব্যস্ত থাকার কথা। কিন্তু লেখাপড়া বাদ দিয়ে তারা ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে ফ্রি-ফায়ার নামক গেম নিয়ে ব্যস্ত। যা শিক্ষার্থীকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তার ছেলেও এই গেমে আসক্ত।

এসব গেম মাদকদ্রব্যর নেশার চেয়ে ভয়ঙ্কর উল্লেখ করেন গাজীপুর জজ কোর্টের এডভোকেট মো. আতিকুর রহমান ভূঁইয়া বলেন, ‘দীর্ঘ দিন যাবৎ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার কারণে কিশোর, তরুণ ও যুবকরা হতাশায় দিন পার করার কারণেই ভয়ঙ্কর ওইসব গেমে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। আর গেমে আসক্তির কারণে তারা নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। বাড়ছে কিশোর অপরাধ।’ তাই এই সমস্যা থেকে আমাদের সন্তানদের বাঁচাতে হলে অভিভাবকদের পাশাপাশি সমাজের সচেতন মহল, শিক্ষক এবং প্রশাসনকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।

এ ব্যাপারে উপজেলার ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ মসলিন কটন মিলস উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক তাপস কুমার দাস বলেন, ‘আমাদের সময় আমরা অবসর সময়টা বিভিন্ন খেলাধুলার মধ্য দিয়ে পার করতাম, কিন্তু এখনকার যুগে এ প্রজন্মের সন্তানদের দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র। উপজেলার গ্রামগঞ্জে মোবাইলে গ্রুপ গেম মহামারি আকার ধারণ করেছে। শিক্ষার্থীরা অনেকে পড়ার টেবিল ছেড়ে খেলছে এসব গেম, কখনো ইন্টারনেটে বিভিন্ন সাইটে পর্ন ছবি দেখছে। এতে একদিকে তাদের ভবিষ্যৎ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, অন্যদিকে কিশোর অপরাধসহ বিভিন্ন সামাজিক নানা অপরাধ বেড়েই চলছে।’

কালীগঞ্জ উপজেলা প্রেস ক্লাবের সভাপতি আশরাফুল আলম আইয়ুব বলেন, ‘পাবজি, তিন পাত্তি বা ফ্রি-ফায়ার খেলায় আসক্ত যারা, তারা যদি একদিন না খেলে, তাহলে কোনো কিছু ভালো লাগে না তাদের। এ খেলা খেলতে বিভিন্ন লেভেল পার করতে হয়, যার বিনিময় অনেক অর্থ ব্যয় হয়। ফ্রি ফায়ার খেলায় যারা একবার আসক্ত হয়েছে, তারা আর এ খেলা ছাড়তে পারবে না বলে মনে করেন তিনি।’

কিশোর-কিশোরীদের মা-বাবাসহ সমাজের সবারই খেয়াল রাখতে হবে, সিক্ষার্থীরা যেন মাত্রাতিরিক্ত মোবাইল আসক্ত না হয়। অভিভাবক, সচেতন মহল প্রত্যেকেই নিজ নিজ অবস্থানে সচেতন হলে তরুণ ও যুব সমাজকে এ আসক্তি থেকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব বলে মনে করছেন কালীগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ একেএম মিজানুল হক।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. শিবলী সাদিক বলেন, ‘বর্তমানে এ ফ্রি-ফায়ার নামক গেমে সবচেয়ে বেশি আসক্ত হচ্ছে স্কুল পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা। অনেকেই এর খেলার পেছনে অর্থ ব্যয় করছেন।’ অভিভাবকসহ সমাজের সবাই মিলে এ বিষয়ে তদারকি না করলে ভবিষতে ফ্রি ফায়ার নামক গেম মাদকের চেয়ে বেশি ভয়ঙ্কর হতে পারে বলে মনে করেন তিনি। তাই এই বিষয়ে সবাইকে সচেতন হতে আহ্বান জানান ইউএনও।

গাজীপুর/মাহি 

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়