ঢাকা     রোববার   ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২ ||  আশ্বিন ১০ ১৪২৯ ||  ২৮ সফর ১৪৪৪

জয়িতা রায়ের ‘একাকিত্ব’ 

জয়িতা রায় || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৫:৪০, ১৪ জুন ২০২১  
জয়িতা রায়ের ‘একাকিত্ব’ 

সকাল থেকেই শুভ্রর মন খারাপ। বেশ কিছু দিন ধরেই বেশ মন মরা ভাব তার, তবে এটা নতুন কিছু না। বরাবরই শুভ্র এমন মন খারাপ করে মুখ কালো করে থাকে। কিন্তু আজ শুভ্রর অন্যদিন থেকে একটু বেশি মন খারাপ। ওর সকালটা আজকে শুরু হলো মায়ের সঙ্গে ঝগড়া দিয়ে। মজার ব্যাপার হলো, এটাও তেমন নতুন কোনো কিছু না। দুইদিন পর পরই এমন ঝগড়া ওদের বাড়িতে হয়। 

মন খারাপ হলেই শুভ্র বিল্ডিংয়ের ছাদে গিয়ে একা সময় কাটায়। ছাদ টা বেশ পুরনো। কেউ তেমন সেই ছাদে যায় না। কাপড় শুকাতে দেওয়ার জন্য দড়িগুলোও ব্যবহার হয় না বছর খানেক। ছাদটার মধ্যে কেমন একটা অন্ধকার, দম আটকায় আশার পরিবেশ, যে কেউ সেখানে গেলে মন খারাপ হয়ে যাওয়াটাই স্বাভাবিক। তবে, শুভ্র অন্যরকম, ওর এমন একা একটা দম বন্ধ করা জায়গায় বসে থাকতে বেশ ভালো লাগে। ওর গান শুনতে ভালো লাগে, মুঠোফোনটা গান শোনা ছাড়া তেমন কোনো কাজে ব্যবহার করা হয় না। 

বন্ধুবান্ধব আড্ডা এসবই ওর জীবনের অনেক বড় একটা অংশ ছিল এক সময় কিন্তু এখন ওর এসব ভালো লাগে না। সেই ছোটবেলা থেকেই এই একা একা থাকার অভ্যাসটা। একবার স্কুল থেকেও প্রিন্সিপাল শুভ্র এমন একা থাকে বলে ওর বাবা-মাকে বলেছিল সাইকোলজিস্টের কাছে নিয়ে যেতে। নিয়ে যদিও কোনো লাভ হলো না। 

বেশ কিছু দিন একা ছিল শুভ্র কিন্তু আজকে সে ঠিক করলো বন্ধুদের সঙ্গে একটু দেখা করবে। মে মাসের কড়া রোদ বাইরে, ওর এত প্ল্যান করার পর এখন আর বের হতে ইচ্ছা করছে না। কিন্তু এখন কিছু করার নেই, সবাই এসে ওর জন্য অপেক্ষা করছে। নীল একটা শার্ট আর খয়েরী হাফপ্যান্ট পরে বেরিয়ে পড়লো। সে একটা রিকশা নিলেই পারে কিন্তু তাও হেঁটেই যাবে ঠিক করলো। বন্ধুরা ওই দিকে অপেক্ষা করতে করতে অস্থির হয়ে ওকে কল দিচ্ছে। পকেটে ফোন বাজছে কিন্তু ধরছে না। 

শুভ্র দূর থেকে দেখলো যে সবাই চলে এসেছে। ও যেতেই সবাই মিলে একটা ঝাড়ি দিলো ওকে। দেওয়াটাই স্বাভাবিক কারণ দুই ঘণ্টা সবাইকে বসায় রেখে এতক্ষণে এসেছে। ওখানে কিছুক্ষণ থাকার পর শুভ্রর একদম ভালো লাগছে না। বাসায় চলে আসতে চাইলেও এখন ওর ওখানে থাকতে হবে অন্তত পক্ষে দুই ঘণ্টা। এখানে এসে ওর মনটা আরও বেশি খারাপ হয়ে গেলো। ওর নিজেকে কেমন জানি আলাদা মনে হচ্ছে অন্যদের থেকে। সবাই হাসি-খুশি কিন্তু ওর মন মরা। 

শুভ্রর আজ-কাল মন খারাপ করার কোনো কারণ লাগে না ও এমনিই এমন মন খারাপ করে থাকে। সবাই একটু একটু বোঝলো যে ওর কিছু হয়েছে কিন্তু কেউ এটা নিয়ে মাথা ঘামানোর প্রয়োজন মনে করছে না। সবাই আরও বিরক্ত হচ্ছে যে হাসি-খুশি একটা আড্ডায় একজন এমন চুপচাপ কেনো বসে আছে। ওরা বুঝছে যে এখানে এসে শুভ্র একদমই মজা পাচ্ছে না। 

শুভ্র একটু পরে নানা অজুহাত দিয়ে বের হয়ে আসলো ওখান থেকে। বের হতে যাবে, তখনই তার আরেক বন্ধু সৃজন বললো যে শুভ্রর সঙ্গে সে যেতে চায়। শুভ্র মনে মনে অনেক বেশি বিরক্ত হলো কিন্তু কিছু বলতে পারলো না। ওরা ফেরার পথটা হেঁটে ফিরলো।

শুভ্র সৃজনকে তার ঘরে নিয়ে গেলো। ছোট একটা ঘর, সেখানে একটা খাট, আলমারি আর পড়ার টেবিল ছাড়া কিছু নেই। আর সাথে কোনো বারান্দা কিংবা বাথরুম নেই, শুধু আছে একটা জানালা। জানালার বাইরে তাকালে আকাশ দেখা যায় খানিকটা আর অনেক বিল্ডিং। সৃজন ঘরে ঢুকেই বললো, এখানে ২৪ ঘণ্টা থাকলে তো মানুষের দম আটকায় আসার কথা। শুনে শুভ্র আর কিছু বললো না, খালি নিচের দিকে তাকিয়ে হাসলো। 

শুভ্র বিরক্ত হলেও ওর এখন সৃজনের সঙ্গে সময় কাটাতে হবেই। কিছুক্ষণ এমন কথার পর সব স্বাভাবিক হলো ওদের, মাঝ খানে আর রুমের মধ্যে থাকা নিস্তব্দতা কমে গেলো বেশ খানিকটা। শুভ্রর এই মন খারাপ থাকার কথা সৃজনকে বললো। সৃজন ছাড়া কেউ জানে না শুভ্রর ডিপ্রেশনের কথা। সৃজন ওই দিন শুধু চুপচাপ শুনলো কিন্তু কিছু বললো না। চলে গেলো।

কথা বলে শুভ্রর ভালো লাগার কথা কিন্তু তা লাগলো না। বরং আরও কষ্ট হলো। শুভ্র আসলে কাউকে কিছু বলতে চায় না। সেজানে বলেও লাভ নেই। সে আস্তে আস্তে বুঝতে পারে মানুষের সঙ্গে নিজের কথা শেয়ার করে তেমন কোনো লাভ হবে না। একা তার মন খারাপ থাকলেও মানুষের সঙ্গে কথা বলে ভালো লাগে। সেভাবে ও হয়তো বেশি দিন বাঁচবে না। এই পৃথিবীটা আসলে সবার জন্য না। সবাই বাঁচতে ভালোবাসে না।

ঠিক তখনি শুভ্রর কানে এলো পাখির ডাক– ঘর থেকে বেড়িয়েই দেখলো সৃজন এসেছে আবারো। হাতে বিরাট কি যেন একটা কাগজে মোড়ানো। শুভ্র এগিয়ে গেলো। সৃজন বললো, এখানে না, চল ছাদে যাই। বিরক্ত মনে শুভ্র ছাদে উঠল। সেই গুমোট ছাদটা। সৃজন কাগজের ঢাকা খুলে বের করলো চার জোড়া বাজরিকা পাখির খাঁচাটা। বললো, এখন থেকে পাখির ডাকে তোর সকাল হবে। দেখিস, ভালো লাগবে। শুভ্র হতবাক। দুজনে মুখোমুখি। কয়েক মিনিটের নীরবতা। হঠাৎই শুভ্র খুলে দিলো খাঁচার বন্ধদরজা। পাখিগুলো প্রথমে বুঝলো না। তারপর একে একে আটজনেই ডানা মেললো আকাশে।

ঠিক তখনি শুভ্রর মনে হয়, কেটে গিয়েছে ছাদের গুমোট ভাব। মনটাও কেমন হালকা লাগছে। ও আকাশে উড়ে যাওয়া পাখিদের খোঁজে। দেখা মেলে না। আর তখনই ও আবিষ্কার করলো, ওর সেই মন খারাপগুলোও পাখিরা নিয়ে গেছে। আগে বিরক্ত লাগা সৃজনকে জড়িয়ে ধরলো শুভ্র। মনে হলো চারদিকে মুক্ত পাখির ডানা ঝাপটানোর শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই, বিষাদের শিশা রঙের আকাশে অনেক আলো–কষ্টগুলো ফানুস হয়ে উড়ে যাচ্ছে। এ এক অন্যরকম স্বস্তি– বলতে গেলে নতুন করে জন্ম নেওয়া।

লেখক: শিক্ষার্থী, সহজপাঠ, ঢাকা।

/মাহি/ 

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়