ঢাকা     বুধবার   ২৬ জানুয়ারি ২০২২ ||  মাঘ ১২ ১৪২৮ ||  ২২ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

তিন বন্ধু ও তিনটি লাউয়ের গল্প

তৈয়ব আলী, রাবি  || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৭:১১, ৮ ডিসেম্বর ২০২১  
তিন বন্ধু ও তিনটি লাউয়ের গল্প

সেদিন ছিল ডিসেম্বরের কোনো এক মঙ্গলবার। শীতের সময়। আশিক, দীপ্ত আর তৈয়ব তিন বন্ধু। বিকেলের দিকে হঠাৎ করেই তৈয়ব বন্ধুদের নিয়ে কাছেধারে কোথাও বেড়াতে যাবে বলে মনস্থির করে। ঠিক করে তাদের খামার আছে শহর ছেড়ে বেশ কিছুটা দূরে- গ্রামের দিকে, সেখানে যাবে। ওদিকে দীপ্ত ওরফে চুন্নু বরাবরই সব বিষয় নিয়ে নাটক করে থাকে এবং মিথ্যা বলে সে বারবার বন্ধুদের কাছে ধরা খায়। 

সেদিনও তার বাইকে তেল নেই, পকেটে টাকা নেই, নানা কাজ দেখিয়ে নাটক করে এবং শেষ পর্যন্ত বলে সে যাবে না। তবে কোথাও ঘুরতে গেলে চুন্নু যাবে না বলেও শেষ মুহূর্তে সবার আগে তাকেই পাওয়া যায়। তৈয়ব ভালো করেই জানে সে গেলে আশিক যাবে। শেষ পর্যন্ত আশিক আর তৈয়ব যাবে বলে ঠিক করে। বাসা থেকে বের হওয়ার সময় আশিক কল দিয়ে তৈয়বকে বলে চুন্নুও যাবে। 

তারা যাত্রা শুরু করলো এবং পৌঁছালো মাগরিবের আগে আগে। তখন আকাশে লাল আভা ও আবছা করে চাঁদটা দেখা যাচ্ছে। তারা সেখানে গিয়ে বিলের পাড়ে বসে গোধূলী এবং কুয়াশার চাদরে ঘেরা ধানক্ষেত দেখতে দেখতে প্রকৃতির নিস্তব্ধতায় মুগ্ধ হয়ে সন্ধ্যেটা পার করলো। কিছুক্ষণ প্রকৃতির কাছাকাছি থেকে রঙিন দুনিয়ার মাঝে হারিয়ে গেলো। হঠাৎ করেই মনে হল ফিরতে হবে। ঘড়ি দেখে তখন প্রায় রাত ৮টা বাজে। তিনজন তৈয়বদের খামারে এসে বাইক দুটি নিলো এবং সেখানে যিনি থাকেন তাকে তৈয়ব বললো ভাই লাউ গাছে লাউ থাকলে দুটো লাউ আর কিছু কচি পাতা ছিড়ে দেন। 

আসার সময় আশিক চুন্নুর বাইক চালাচ্ছিল। কিন্তু ফেরার সময় সে বললো এখন আর সে বাইক চালাবে না। এখন সে তৈয়বের বাইকে বসে যাবে। তৈয়ব তখন বললো, তাহলে চুন্নু লাউগুলো তোর বাইকে নে, যেহেতু তুই একা যাচ্ছিস। চুন্নুর বাইকে লাউয়ের ব্যাগটা চুন্নু নিজেই বেশ ভালো করে বেঁধে নিলো। এবার তারা রওনা দিলো। কিন্তু  হঠাৎ করেই চুন্নু জোরে বাইক চালিয়ে ওদের আগে চলে গেলো। এদিকে তৈয়ব আর আশিক বলাবলি করতে শুরু করে দিলো যে ও হয়তো কোথাও এক্সিডেন্ট করতে পারে, কারণ সে তো পাগল কিসিমের। কখন কোথায় কী হয়, কে জানে? 

এরই মধ্যে তৈয়ব হঠাৎ দেখে তার পকেটে মোবাইলটা নেই। তারা ফের ফিরে গেলো তাদের খামারে। তার মোবাইলটা সেখান থেকে নিয়ে ক্ষাণিকটা আসার পরেই চুন্নু কল দিয়ে বলে তোরা কোথায়? আমি চায়ের দোকানে আছি। তাকে বলা হলো ওখানেই থাক, আসছি। সেখানে গিয়ে চুন্নুর বাইকে লাউয়ের ব্যাগ না দেখে আশিক বলে ওঠে লাউ কই? চুন্নু বলে, তাহলে হয়তো কোথাও পড়ে গেছে, সে জানে না। 

প্রথমে মজা করছে মনে করলেও পরে দেখা গেলো ঘটনা সত্য। আসলেই সে জানে না। আশিক বললো, চল খুঁজে দেখি। আবার তৈয়ব এবং আশিক সেই রাস্তাতেই লাউ খুঁজতে ফিরে গেলো। এর মাঝে চুন্নুর যে অবস্থা তা নিয়ে বিস্তর আলোচনা চলছে ওদের মাঝে। যেতে যেতে আশিক বললো, মামা তুই রাস্তার ডান দিকে দেখ আমি বামে দেখছি। কিছুদূর আসার পর হঠাৎ তৈয়ব দেখল সেই লাউয়ের ব্যাগ একটা চায়ের দোকানে রাখা আর দোকানি ও একজন লোক বসে আছে। তাদের কে বললো, ভাই এটা কি লাউয়ের ব্যাগ? আপনারা কি রাস্তায় এটা পেয়েছেন? তারা বললো, হ্যাঁ। লাউ ফেরত পেয়ে তৈয়ব আর আশিক তো মহা খুশি। কিন্তু ব্যাগ খুলে দেখা গেলো মাত্র একটা লাউ আছে। যারা পেয়েছে, বললো- এই একটা লাউই তারা কুরিয়ে পেয়েছে ওই ব্যাগসহ। তারপর সেই চায়ের দোকানে বসে লাউ ও ব্যাগ নিয়ে অনেক আলোচনা ও বেশ কিছুক্ষণ লাউ খোঁজাখুঁজি চললো। এরই মাঝে চুন্নুও ফিরে এসেছে কিন্তু তার নষ্ট মাথা আর রঙিন চোখে সে সেখানে ওদের খেয়াল না করেই চলে যাচ্ছিলো। যেই দোকান পার করে চলে যাচ্ছে, তখন আশিক তাকে ডাক দিয়ে থামায়। এবার চুন্নুও বাকি দুটো লাউ খুঁজতে শুরু করে। কিন্তু সেও ব্যর্থ। 

খানিক্ষণ সেই দোকানে গিয়ে এক বাইকে তিনজনই বসলো। কিছু নাস্তা করে তৈয়ব আশিককে বললো, চল আরেকটু এগিয়ে গিয়ে দেখি পেয়েও যেতে পারি। আবার তারা পেছনের দিকে লাউ খুঁজতে গেলো। কিছুদূর গিয়ে হঠাৎ এক জায়গায় রাস্তার মাঝে কিছু লাউয়ের পাতা পড়ে থাকতে দেখে আবার সেখানেও তল্লাশি চালানো হলো। কিন্তু লাউ দুটো আর পাওয়া গেলো না। 

তারা সেই চায়ের দোকানে ফিরে আসে। এবার ওই লাউখানা আশিক হাতে নিয়ে বললো, চলো বাসায় এই একখানা লাউ নিয়েই ফিরে যাই। তৈয়ব বাসায় এসে মাকে বললো, মা খামারে গিয়েছিলাম এই একটা লাউ নিয়ে এসেছি এবং মনে মনে দুটো লাউ হারানোর গল্পটা ভুলে গেলো।

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়