ঢাকা     বুধবার   ১৭ আগস্ট ২০২২ ||  ভাদ্র ২ ১৪২৯ ||  ১৮ মহরম ১৪৪৪

ক্যাম্পাস সাংবাদিকদের সমুদ্র বিলাস

সোহান সিদ্দিকী, ইবি || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৬:৩৬, ১৬ এপ্রিল ২০২২  
ক্যাম্পাস সাংবাদিকদের সমুদ্র বিলাস

সাংবাদিকতা মানেই যেন ব্যস্ততার সমুদ্র। একটি কাজের ঢেউ শেষ না হতেই আরও দশটি কাজের ঢেউ চলে আসে। সপ্তাহান্তে যেখানে অন্য পেশাজীবীদের একদিন হলেও কর্ম অব্যাহতির ফুরসত মেলে, সেখানে সংবাদকর্মীদের ব্যস্ততা বছরের ৩৬৫ দিন।

কিন্তু এবার সময় এবং সুযোগের সন্ধি ঘটায় আমাদের সুযোগ হয়েছিল সাগরকন্যার তীরে যাওয়ার। তাই ব্যস্ততার গণ্ডি পেরিয়ে তিন দিনের ভ্রমণে পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার লতাচাপলী ইউনিয়নের শেষ প্রান্তে সাগরকন্যার দেশ কুয়াকাটায় পাড়ি জমিয়েছিলাম ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার্স ইউনিটির একদল তরুণ সাংবাদিক।

কর্মব্যস্ততাই আমাদের জীবন। আর ক্যাম্পাস সাংবাদিকদের জন্য ব্যস্ততা যেন একটু বেশিই হয়। তবে ব্যস্ততাই জীবনের সবকিছু নয়, এর বাইরেও রয়েছে নির্মল শুভ্র সুন্দর এক জগৎ। তাই প্রাণের টানে সৌন্দর্য উপভোগের জন্য গত ১৭ মার্চ রাতে ক্যাম্পাস থেকে শুরু হয় আমাদের যাত্রা।

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ১৮ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এ সমুদ্রসৈকতে আমরা পৌঁছাই ভোর ৪টার দিকে। যাত্রাপথে প্রায় সারারাস্তা নাচে-গানে মজা করে সবাই বেশ ক্লান্ত ছিলাম। যদিও ক্লান্তি ছিল বেশ, তবে আনন্দটাও ছিল অসীম।

বাস থেকে নেমে হোটেলে ব্যাগ-পত্র রেখে ফ্রেশ হয়ে আমরা চলে যাই সমুদ্রের তীরে। এত ভোরে চারপাশে যখন নিশ্চুপ নীরব ঘুমন্ত, তখন সমুদ্রের গর্জন ছিল সত্যিই ভয়ংকর। সমুদ্রের যে একটা ভয়ংকর রূপ আছে তা বোঝা যায় এ সময়টায়। সৈকতের পাড়ে বসে নির্জন আকাশের তারা, চাঁদের আলো আর সাগরের ঢেউয়ের শব্দ নৈসর্গিক অনুভূতির সৃষ্টি করে। এদিকে বেলা বাড়তে থাকে আর ভোরের সূর্য উঁকি দিয়ে জানান দেয় তার উপস্থিতি। নৈসর্গিক সৌন্দর্যের এ সমুদ্রসৈকত বাংলাদেশের একমাত্র পর্যটন কেন্দ্র যেখান থেকে সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্ত দুটোই অবলোকন করা যায়।

সমুদ্রসৈকতে ঘোরাঘুরি শেষে সকালের নাস্তা শেষে ৯টার দিকে সিদ্ধান্ত হলো সুন্দরবনে যাবে সবাই। নৌকায় করে মাঝ সমুদ্রে গিয়ে উঠতে হয় ট্রলারে, তারপর ৪৫ মিনিটের যাত্রাপথ। সমুদ্রের স্রোতে আমাদের ট্রলারটি মাঝে মধ্যেই দুলে উঠছিল। মনে হচ্ছিলো এই বুঝি ডুবে গেলাম। ভয়ে জড়সড় হয়ে অনেকেই দেখি তওবা করছে, বেঁচে ফিরলে আর কোনোদিন সমুদ্রের মাঝে ট্রলারে উঠবে না তারা। সমুদ্রের বুকে ভেসে চলার অনেকক্ষণ পর চোখে পড়ল সাগরের বুকে জেগে ওঠা ফাতরার চরের বনভূমি। এ যেন সাগরের বুকে ভাসমান কোনো অরণ্য। দুপাশে ঘন সবুজ বন দেখতেই অসম্ভব সুন্দর লাগে। সাগরের বুকে সবুজ প্রকৃতি এবং বিভিন্ন প্রজাতির ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদ সব মিলিয়ে এটি এক ভিন্ন জগৎ।

ফাতরার চর থেকে ফেরার পথে দেখা মেলে কুয়াকাটার অন্যতম আকর্ষণীয় স্থান লাল কাঁকড়ার চর আর লেবুর বন। লেবুবনে কোনো লেবু গাছ ছিল না, ছিল কেওড়া আর গেওয়ার ঝোঁপ। কিন্তু সমুদ্রের ধারে এমন একটি মনোরম পরিবেশ মনকে সত্যিই অনেক প্রশান্তি দেয়। এরপর গ্রুপ সেলফি আর ছবি তোলা শেষে আমরা ফিরে এলাম হোটেলে।

সন্ধ্যায় আমরা কয়জন সমুদ্রতীরে সূর্যাস্ত দেখতে যাই। ধীরে ধীরে সাগরের বুকে ডুবতে থাকে সূর্য আর সেই রঙে আবির রাঙা হয়ে ওঠে চারদিক। এ সময় সূর্যের লাল আভা ছড়িয়ে যায় সাগরজলেও। আস্ত সূর্যটাও হারিয়ে যায় সাগরের বুকে।

সন্ধ্যার পর আমরা আর এক দফা বের হই কেনাকাটায় তবে অন্যরা যায় পেটপূজা করতে। রাতে রুটি আর কোরাল মাছের বারবিকিউ দিয়ে হয় অন্যরকম পেটপূজার আরতি। ক্যাম্পাস সাংবাদিকদের নিয়ে অতিবাহিত হয় কুয়াকাটা ভ্রমণের প্রথম দিনটি।

পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে নাস্তা শেষে আমরা যাই সমুদ্রসৈকতে। কুয়াকাটার সমুদ্রসৈকত বেশ পরিচ্ছন্ন। সাগরপাড়ে এসময় সবচেয়ে মজার ঘটনাটি ছিল সিনিয়র বনাম জুনিয়র সাংবাদিকদের হ্যান্ডবল ম্যাচ। যদিও শেষ পর্যন্ত খেলাটি ড্র হয়েছিল। সমুদ্রের নোনা জলে লাফঝাঁপ, গোসল, ছবি তোলা আর ঢেউয়ের সাথে মাতামাতি করে কাটে আনন্দের সময়। পরে সমুদ্রস্নান শেষে আমরা ফিরে আসি হোটেল রুমে।

এরপর বিশ্রাম নিয়ে হোটেলে দুপুরের খাবার খেয়ে কুয়াকাটার বিখ্যাত বৌদ্ধমন্দিরে যাই আমরা। রাখাইন মার্কেটেও যাওয়া হয় আমাদের। সেখানেও নানান বৈচিত্র্য। সমুদ্রের ছোট ছোট শামুক, ঝিনুক থেকে তৈরি বাহারি সব জিনিসপত্র থেকে শুরু করে পোশাক সামগ্রী- কী নেই সেখানে। পাশাপাশি ছিল নানারকম চকলেট আর আচার।

সন্ধ্যায় বাস, তাই বিকালে আরও এক দফা মার্কেটগুলোতে টুকটাক কেনাকাটা আর ঘোরাঘুরিতেই দেখি সময় শেষ। ফিরতে হবে ক্যাম্পাস পানে। ফেরার দিন বিকালবেলা সমুদ্রপারে আয়োজন করা হয় কুইজ প্রতিযোগিতা। ইবি রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি মুরতুজা হাসান নাহিদের পরিচালনায় সকলের অংশগ্রহণ ছিল বাধ্যতামূলক। এই কুইজটি ছিল একটু ভিন্নরকম। প্রশ্নোত্তর পর্বের সঙ্গে যার যার প্রতিভার কথা উল্লেখ করা ছিল, যা সত্যি অনেক আনন্দদায়ক। পাশাপাশি সবার জন্য ছিল আকর্ষণীয় পুরস্কার। সন্ধ্যায় বাসে ফেরার সময় গান, গল্প আর আড্ডায় কখন যে আমরা প্রিয় ক্যাম্পাসে চলে এলাম টের পাইনি।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আধার কুয়াকাটায় আনন্দ ভ্রমণের পর সব ক্লান্তি আর অবসাদ ঝেড়ে ফেলে আমরা নতুন উদ্যমে কাজ করার শক্তি পাই। আর স্বপ্ন দেখি আগামী বছর হয়ত এভাবে আবারও হারিয়ে যাব অপরূপ বাংলাদেশের কোনো এক কোণে। সাংবাদিকতার জীবনে যেতে হবে আরও একটি ছুটির গল্পে।

লেখক: শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।

/মাহি/

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়