হালনাগাদের অভাবে পিছিয়ে কুবির ওয়েবসাইট
এমদাদুল হক, কুবি প্রতিনিধি || রাইজিংবিডি.কম
প্রতিষ্ঠার দুই দশক পার হলেও এখনো আধুনিক ও তথ্যসমৃদ্ধ ওয়েবসাইট গড়ে তুলতে পারেনি কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় (কুবি)। তথ্যের অপ্রতুলতা, নিয়মিত হালনাগাদের অভাব ও অনলাইন সেবার সীমাবদ্ধতায় শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং সংশ্লিষ্টদের নানা ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।
প্রযুক্তির আধুনিকতা ও তথ্যের সহজলভ্যতার যুগে যেকোনো বিষয়ে সমাধান বা তথ্য জানতে মানুষ এখন নির্ভর করে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও ওয়েবসাইটের ওপর। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের জন্যও একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইট একাডেমিক জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তথ্যভান্ডার। ভর্তি, ক্লাস রুটিন, পরীক্ষার সময়সূচি, ফলাফল, গবেষণা কার্যক্রম, শিক্ষক পরিচিতি ও প্রশাসনিক তথ্য জানার প্রধান মাধ্যম একটি আধুনিক ও তথ্যবহুল ওয়েবসাইট।
একই সময়ে প্রতিষ্ঠিত দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইট যেখানে আধুনিক ও কার্যকর, সেখানে কুবির ওয়েবসাইট এখনো তথ্য হালনাগাদের অভাব ও প্রয়োজনীয় তথ্যের সংকটে পিছিয়ে রয়েছে। এতে শিক্ষার্থী ও বিশ্ববিদ্যালয়সংশ্লিষ্টরা পড়ছেন নানা বিড়ম্বনায়।
সরেজমিনে ওয়েবসাইট পর্যালোচনা ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে দীর্ঘদিন ধরেই তথ্যের অপ্রতুলতা ও নিয়মিত হালনাগাদের অভাব রয়েছে। অধিকাংশ বিভাগে একাডেমিক কারিকুলাম, রুটিন, ফলাফল ও স্নাতকোত্তর কার্যক্রমসংক্রান্ত প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়া যায় না। গবেষণা ও প্রকাশনাসংক্রান্ত তথ্যও অধিকাংশ ক্ষেত্রে অনুপস্থিত। এছাড়া, অনলাইন সনদ ও ফলাফল যাচাইয়ের কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় উচ্চশিক্ষা ও চাকরির ক্ষেত্রে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের।
ওয়েবসাইট ঘেঁটে দেখা যায়, কিছু বিভাগে একাডেমিক কারিকুলাম ও রুটিন দেওয়া থাকলেও অধিকাংশ বিভাগে শুধু লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যসংক্রান্ত সংক্ষিপ্ত তথ্য রয়েছে। প্রতিটি বিভাগের শিক্ষার্থীদের ফলাফল প্রকাশের সুযোগ থাকলেও সংশ্লিষ্ট সেকশনগুলোতে তথ্য হালনাগাদ করা হয়নি। অনেক বিভাগে স্নাতকোত্তর কোর্স চলমান থাকলেও সে সম্পর্কিত প্রয়োজনীয় তথ্যেরও উল্লেখ নেই।
শিক্ষার্থীরা দীর্ঘদিন ধরে ওয়েবসাইটে সনদ যাচাই পদ্ধতি ও শিক্ষার্থীদের তথ্য অনলাইন ডাটাবেজে সংরক্ষণের দাবি জানিয়ে আসলেও কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। তাদের অভিযোগ, নামের মিল থাকায় একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। ফলে সনদ যাচাই করতে গিয়ে উচ্চশিক্ষা ও চাকরির বিভিন্ন পর্যায়ে বিড়ম্বনায় পড়তে হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের পরিচিতিও ওয়েবসাইটে পর্যাপ্ত নয়। শুধু নাম, ছবি, ই-মেইল ও ফোন নম্বর পর্যন্ত তথ্য সীমাবদ্ধ। কিছু বিভাগে শিক্ষকদের গবেষণার বিষয় যুক্ত থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে এ-সংক্রান্ত তথ্য অনুপস্থিত। এতে শিক্ষার্থীরা গবেষণার জন্য উপযুক্ত শিক্ষক নির্বাচনেও দ্বিধায় থাকেন।
বিশ্ববিদ্যালয়সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক র্যাংকিং সংস্থা কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা ও একাডেমিক প্রকাশনাসংক্রান্ত তথ্য না পাওয়ায় বিশ্ব র্যাংকিংয়েও পিছিয়ে পড়ছে প্রতিষ্ঠানটি। ওয়েবসাইটে গবেষণার জন্য আলাদা সেকশন থাকলেও সেখানে কোনো তথ্য হালনাগাদ করা হয়নি।
আইন বিভাগের শিক্ষার্থী বায়জিদ হোসেন বলেন, “আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে প্রয়োজনীয় তথ্যের বড় অভাব রয়েছে। ওয়েবসাইটটি দেখলে মনে হয় আমরা কয়েক যুগ পিছিয়ে আছি। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মান, কার্যক্রম ও আন্তর্জাতিক পরিচিতির বড় অংশ প্রকাশ পায় তার ওয়েবসাইটের মাধ্যমে। কিন্তু আমাদের ওয়েবসাইট সেই মানদণ্ডে অত্যন্ত দুর্বল। বিদেশে উচ্চশিক্ষায় যেতে অনেক শিক্ষার্থীকে সনদ ও একাডেমিক তথ্য যাচাইয়ের জন্য নানা ভোগান্তিতে পড়তে হয়।”
তিনি আরো বলেন, “অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে শিক্ষকদের গবেষণা, প্রকাশনা ও চলমান প্রকল্পের বিস্তারিত তথ্য সহজেই পাওয়া যায়। অথচ আমাদের ওয়েবসাইটে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ‘নো ডাটা ফাউন্ড’ লেখা দেখা যায়। গুটিকয়েক শিক্ষক ছাড়া অন্যদের গবেষণা বা প্রকাশনার তথ্য সেখানে নেই।”
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী মো. এমদাদুল হক বলেন, “একটি বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে জানার সর্বোত্তম উপায় হচ্ছে তার ওয়েবসাইট। কিন্তু আমাদের ওয়েবসাইটের বর্তমান অবস্থা দেখে মনে হয়, এখানে দীর্ঘদিন কোনো কার্যক্রম নেই। নিয়মিত হালনাগাদ না হওয়ায় শিক্ষার্থীদের প্রায়ই ভোগান্তিতে পড়তে হয়। ক্লাস, নোটিশ, ফলাফল কিংবা চলমান গবেষণার তথ্যও পাওয়া যায় না। বিদেশে পড়তে যাওয়া অনেক শিক্ষার্থীও ওয়েবসাইটসংক্রান্ত বিভ্রান্তির কারণে দুর্ভোগে পড়েছেন। আমি চাই, ওয়েবসাইটটি আধুনিকায়ন ও নিয়মিত হালনাগাদ করা হোক।”
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের প্রভাষক মশিউর রহমান বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটই হচ্ছে তার মুখচ্ছবি। দূরের কেউ বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে জানতে চাইলে প্রথমেই ওয়েবসাইটে প্রবেশ করে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, গবেষণা ও একাডেমিক কার্যক্রম সম্পর্কে ধারণা নেয়। কিন্তু অনেক তথ্য পূর্ণাঙ্গভাবে উপস্থাপন না হওয়ায় কুবি আন্তর্জাতিক মূল্যায়নে পিছিয়ে রয়েছে।”
তিনি আরো বলেন, “ওয়েবসাইট তৈরির সময় বড় বাজেটের একটি প্রকল্প ছিল বলে শুনেছি। কিন্তু সেই বাজেটের প্রতিফলন বর্তমান ওয়েবসাইটে দেখা যায় না। ল্যান্ডিং পেজে শুধু স্থির ছবি না রেখে নিয়মিত সংবাদ, নোটিশ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম যুক্ত করা প্রয়োজন।”
শিক্ষকদের প্রোফাইল প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “বর্তমানে প্রোফাইলে মৌলিক কিছু তথ্য থাকলেও তা অনেক ক্ষেত্রেই অসম্পূর্ণ। অনেক শিক্ষক ব্যস্ততা বা প্রয়োজনীয়তার অভাবে নিজেদের তথ্য হালনাগাদ করেন না। সম্প্রতি শিক্ষকরা কোন কোর্স পড়ান, সে-সংক্রান্ত একটি নতুন অপশন যুক্ত হয়েছে। নিয়মিত তথ্য সংযোজনের মাধ্যমে এটি আরও কার্যকর করা সম্ভব।”
শিক্ষার্থীদের গবেষণা সংযুক্ত করার বিষয়ে তিনি বলেন, “অনার্স ও মাস্টার্স পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের গবেষণা ও থিসিস ডিজিটালভাবে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। লাইব্রেরি সেকশনে ‘স্টুডেন্টস ওয়ার্ক’ নামে আলাদা অংশ চালু করা হলে শিক্ষার্থীদের গবেষণার আগ্রহ বাড়বে।”
তিনি আরো বলেন, “প্রতিটি বিভাগের নিজস্ব ড্যাশবোর্ড থাকা উচিত, যেখানে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা নিয়মিত রুটিন, নোটিশ ও ফলাফল আপলোড করবেন। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা লগইন সিস্টেম চালু করলে ফলাফল, ট্রান্সক্রিপ্ট, সনদ যাচাই ও বিভিন্ন আবেদন অনলাইনে সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।”
গবেষণাসংক্রান্ত তথ্যের ঘাটতির বিষয়ে তিনি বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষক ইউজিসি থেকে গবেষণা অনুদান পেলেও সেই গবেষণার তথ্য ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয় না। কোন শিক্ষক কোন বিষয়ে কাজ করছেন, কী পরিমাণ অনুদান পেয়েছেন কিংবা গবেষণার অগ্রগতি কী—এসব তথ্য নিয়মিত হালনাগাদ করা উচিত। ওয়েবসাইটের বর্তমান অবস্থা পরিবর্তনে বড় ধরনের উদ্যোগ প্রয়োজন। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি, র্যাংকিং ও শিক্ষার্থীদের সেবাপ্রাপ্তিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।”
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. এম এম শরীফুল করীম বলেন, “আমি আইসিটি সেল ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলব। সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”
ঢাকা/জান্নাত