ঢাকা     বৃহস্পতিবার   ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০ ||  আশ্বিন ৯ ১৪২৭ ||  ০৬ সফর ১৪৪২

লোকসানি শাখা বাড়ছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব‌্যাংকগুলোর

কেএমএ হাসনাত || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৯:৫৮, ১২ আগস্ট ২০২০   আপডেট: ১০:৩৯, ২৫ আগস্ট ২০২০
লোকসানি শাখা বাড়ছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব‌্যাংকগুলোর

করোনার কারণে রাষ্ট্রায়ত্ত ব‌্যাংকগুলো ঠিকমতো ঋণের টাকা আদায় করতে পারছে না। একইসঙ্গে কমেছে আমানতের ওপর সুদের হারও। এছাড়া ব্যাবসা-বাণিজ্য সংকুচিত হয়ে আসাসহ নানা কারণে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো বিভিন্ন ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে। এসব কারণে ব্যাংকগুলোর মুনাফা কমছে। বাড়ছে লোকসানি শাখাও। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো থেকে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে পাঠানো সর্বশেষ প্রতিবেদন পর্যালোচনায় এমন তথ‌্য পাওয়া গেছে। 

ব্যাংকগুলোর তথ্য অনুযায়ী এক বছরের ব্যবধানে এসব ব্যাংকের লোকসানি শাখা বেড়েছে ৬১টি। গত ২০১৮-২০১৯ অর্থবছর শেষে রাষ্ট্রায়ত্ত—সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী ও বিডিবিএল-এর মোট লোকসানি শাখার সংখ্যা ছিল ৩৩১। ২০১৯-২০২০ অর্থবছর শেষে এ সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৯২টিতে। অর্থাৎ এ সময়ের মধ্যে লোকসানি শাখার সংখ্যা বেড়েছে ৬১টি। রাষ্ট্রায়ত্ত ৬ ব্যাংকের লোকসানি শাখার মধ্যে রয়েছে সোনালী ব্যাংকের ১১০টি, অগ্রণী ব্যাংকের ৯৫টি, জনতা ব্যাংকের ৬৮টি, রূপালী ব্যাংকের ৬০টি, বেসিক ব্যাংকের ৩০টি এবং বিডিবিএল ব্যাংকের ২৯টি লোকসানি শাখা রয়েছে। 

গত ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে সবচেয়ে বেশি লোকসানি শাখা বেড়েছে রূপালী ব্যাংকের। এক বছরে ব্যাংকটির লোকসানি শাখা বেড়েছে ৩৯টি। এছাড়া বিডিবিএল-এর ৯টি ও সোনালী, অগ্রণী ও বেসিক ব্যাংকের লোকসানি শাখা বেড়েছে ৫টি করে। এদিকে ছয় ব্যাংকের মধ্যে লোকসানি শাখা কমেছে একমাত্র জনতা ব্যাংকের। এক বছরে ব্যাংকটি ২টি শাখার লোকসান কমাতে পেরেছে।

করোনা পরিস্থিতিতে লোকসানি শাখা বাড়লেও চলতি অর্থবছরে এসব ব্যাংকের লোকসানি শাখার স্থিতি কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে বড় ধরনের সুযোগ দিয়েছে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। এই বিভাগের সঙ্গে করা বার্ষিক কর্মসম্পাদন চুক্তির আওতায় ছয় ব্যাংকের লোকসানি শাখার সংখ্যা ৩২০ রাখার কথা বলা হয়েছে। গত অর্থবছরে ব্যাংক ছয়টির লোকসানি শাখার স্থিতির লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২৫০টি। 

প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, গত অর্থবছরে সোনালী ব্যাংকের লোকসানি শাখার স্থিতির লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৯০টি এবং জনতা ব্যাংকের লোকসানি শাখার স্থিতির লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫৬টি। এটি চলতি অর্থবছরেও অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। এছাড়া অগ্রণী ব্যাংকের লোকসানি শাখার স্থিতির লক্ষ্যমাত্রা ৬০টি থেকে বাড়িয়ে ৮০টি, রূপালী ব্যাংকের ১৫টি থেকে বাড়িয়ে ৫০টি, বেসিকের ১৫টি থেকে বাড়িয়ে ২৪টি ও বিডিবিএল-এর লোকসানি শাখার স্থিতির লক্ষ্যমাত্রা ১৪টি থেকে বাড়িয়ে ২০টি নির্ধারণ করা হয়েছে।

রাষ্ট্রায়ত্ত ছয় বাণিজ্যিক ব্যাংকের পরিচালন মুনাফাও কমে যাচ্ছে। চলতি অর্থবছরে সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী ও বিডিবিএল ব্যাংককে মোট ৩ হাজার ৬০ কোটি টাকা পরিচালন মুনাফা অর্জন করতে হবে। অন্যদিকে, বেসিক ব্যাংকের লোকসান ৩৮০ কোটি টাকার মধ্যে সীমিত রাখতে হবে। সব মিলিয়ে ছয় ব্যাংকের পরিচালন মুনাফার লক্ষ্যমাত্রা হচ্ছে ২ হাজার ৬৮০ কোটি টাকা।

গত ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে ব্যাংকগুলোর পরিচালন মুনাফার লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪ হাজার ২৬১ কোটি টাকা। অর্থাৎ চলতি অর্থবছরে ব্যাংকগুলোর পরিচালন মুনাফার লক্ষ্যমাত্রা ১ হাজার ৫৮২ কোটি টাকা কমিয়ে ধরা হয়েছে।

আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বার্ষিক কর্মসম্পাদন চুক্তি অনুযায়ী, সোনালী ব্যাংককে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা (গত অর্থবছরে ছিল ১ হাজার ৯০০ কোটি টাকা); জনতা ব্যাংককে ৮০০ কোটি টাকা (গত অর্থবছরে ছিল ১,০০০ কোটি টাকা); অগ্রণী ব্যাংককে ৭০০ কোটি টাকা (গত অর্থবছরে ছিল ৮০০ কোটি টাকা); রূপালী ব্যাংককে ৩০০ কোটি টাকা (গত অর্থবছরে ছিল ৪৫০ কোটি টাকা) ও বিডিবিএল-কে ৬০ কোটি টাকা (গত অর্থবছরে ছিল ১১০ কোটি টাকা) পরিচালন মুনাফা অর্জন করতে হবে।

এছাড়া, লোকসানি বেসিক ব্যাংককে গত অর্থবছরে মাত্র ১ কোটি টাকা পরিচালন মুনাফা অর্জন করতে বলা হয়েছিল। কিন্তু ব্যাংকটি তা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানিয়েছে।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘সরকারি ব‌্যাংকগুলো খেলাপি ঋণ আদায় করতে পারছে না। কারণ, তারা রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের  ঋণ বেশি দেয়। অনেক সময় অসৎ ব‌্যবসায়ীদের যোগসাজশ করে তারাও টাকা হাতিয়ে নেন।  এসব কারণে রাষ্ট্রায়ত্ত ব‌্যাংকগুলোর পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাচ্ছে।  তাদের কোনো জবাবদিহিতা নেই।’

জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ‌্যালয়কেন্দ্রিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিসার্চ অ‌্যান্ড ইন্টিগ্রেডেট পলিসি (র‌্যাপিড) নির্বাহী পরিচালক ড. এম আবু ইউসুফ বলেন, ‘এমনিতেই রাষ্ট্রায়ত্ত ব‌্যাংকগুলোর অবস্থা খারাপ। এর মধ্যে খেলাপি ঋণও বেড়ে গেছে। সেগুলো আদায় করা যাচ্ছে না। এছাড়া, দেশের সার্বিক অবস্থার ওপর করোনা প্রভাব ফেলেছে।’ এসব কারণে রাষ্ট্রায়ত্ত ব‌্যাংকগুলোর লোকসানি শাখা বাড়ছে বলেও তিনি মন্তব‌্য করেন। 

হাসনাত/এনই

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়