ঢাকা     বৃহস্পতিবার   ০৬ অক্টোবর ২০২২ ||  আশ্বিন ২১ ১৪২৯ ||  ০৯ রবিউল আউয়াল ১৪১৪

‘এসএমই নিয়ে সবাই কথা বলে, কিন্তু কাজ করে না’

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৯:৪৫, ১৪ আগস্ট ২০২২  
‘এসএমই নিয়ে সবাই কথা বলে, কিন্তু কাজ করে না’

এফবিসিসিআই কার্যালয়ে সেমিনারে শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূন

শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূন বলেছেন, ‘এসএমই নিয়ে সবাই কথা বলে, কিন্তু কোনো কাজ করে না। নানা সীমাবদ্ধতা দ্রুত কাটিয়ে উঠে এসএমই ফাউন্ডেশনকে আর্থিকভাবে সক্ষম করতে হবে।’

রোববার (১৪ আগস্ট) এফবিসিসিআই কার্যালয়ে ‘বঙ্গবন্ধুর এসএমই উন্নয়ন ভাবনা ও বর্তমান প্রেক্ষাপট’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি।

শিল্পমন্ত্রী বলেন, ‘শুধু ডলার বিক্রি করে লাভ করার জন্য এতগুলো ব্যাংকের অনুমোদন দেওয়া হয়নি। এটা নৈতিকতার মধ্যে পড়ে না। শুধু মুনাফা করাই ব্যাংকের কাজ নয়। তাদেরকে অবশ্যই জাতীয় দায়িত্ব পালন করতে হবে। সেজন্যই তাদের লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। নগরাঞ্চলে বড় গ্রাহকদের ঋণ দিয়ে শহর-গ্রামের মধ্যে বৈষম্য বাড়ানো ব্যাংকের কাজ নয়। বরং উন্নয়ন সুষম করাও তাদের দায়িত্ব।’

মূল প্রবন্ধে এফবিসিসিআই’র প্যানেল উপদেষ্টা ও সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো তাদের মোট বিতরণকৃত ঋণের মাত্র ১৮ শতাংশ দেয় দেশের এসএমই খাতে। যা পায় মাত্র ৯ শতাংশ ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠান। বাকি ৯১ শতাংশ এসএমই ব্যাংক ঋণের সহায়তা থেকে বঞ্চিত। এছাড়া, গত কয়েক বছরে ব্যাংকের মোট ঋণের অনুপাতে এসএমই ঋণের হার কমেছে। যা দেশের টেকসই উন্নয়নের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।’

তিনি জানান, স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশে এসএমইর উন্নয়ন করে বৈষম্য কমিয়ে আনতে চেয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। দেশের বর্তমান ক্রমবর্ধমান বৈষম্যের পেছনে এসএমই খাতের বিকাশ না হওয়াকে দায়ী করেন এই অর্থনীতিবিদ।

তিনি আরও জানান, বিশ্বব্যাংকের হিসাবে দেশের এসএমই ঋণের সম্ভাব্য বাজার ২৬ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। কিন্তু ব্যাংকের ঋণ কাঠামোতে এসএমই খাত অবহেলিত। তাই, এই বিশাল লাভজনক খাতে ব্যাংকগুলো নজর দিচ্ছে না।

এফবিসিসিআইর সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন বলেন, ‘এসএমই অর্থনীতির মেরুদণ্ড। কিন্তু এই খাতে ঋণ দিতে ব্যাংকগুলোর অনীহা আছে। তারা সহজে বড় গ্রাহকদের ঋণ দিতে পছন্দ করে। কেননা, এতে ব্যাংকারদের কষ্ট কম হয়।’

এসএমই খাতের মূল সমস্যা অর্থায়ন, উল্লেখ করে মো. জসিম উদ্দিন বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী এসএমই খাতে ২২ হাজার কোটি টাকা প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছিলেন। বৃহৎ খাতের ঋণ তিন মাসের মধ্যে বিতরণ হলেও এসএমই খাতের ঋণ ২ বছরেও বিতরণ হয়নি। কেননা, ব্যাংকগুলো এসএমই খাতে টাকা দেওয়ার ক্ষেত্রে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে না।’

বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাংলাদেশ ও ২০৪১ সালে উন্নত বাংলাদেশ গড়তে প্রতি বছরে ২০ লাখ নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করতে হবে। এজন্য প্রধান ভূমিকা পালন করবে ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাত। তাই তাদের পাশে ব্যাংকগুলোকে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান এফবিসিসিআই সভাপতি।

এ সময় ব্যাংকগুলোর ডলার নিয়ে ব্যবসা করার বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডলার বিক্রিতে মুনাফার হার নির্ধারণ করে দেওয়া উচিত। কোনো কোনো ব্যাংক ডলার বিক্রিতে ৪২৫ শতাংশ পর্যন্ত মুনাফা করছে। এমন চললে দেশ গভীর সংকটে পড়বে।’

এসএমই খাতে অর্থায়ন নিশ্চিত করতে বিশেষায়িত ব্যাংক প্রতিষ্ঠার সুপারিশ করেন এফবিসিসিআইর সিনিয়র সহ-সভাপতি মোস্তফা আজাদ চৌধুরী বাবু। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশে উপজেলা পর্যায়ে বিসিক শিল্পনগরী স্থাপন ও অর্থনৈতিক অঞ্চলে এসএমইর জন্য প্লট বরাদ্দের আহ্বান জানান তিনি।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে এসএমই ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ড. মো. মাসুদুর রহমান অভিযোগ করেন, বড় শিল্প যেভাবে সরকারি নীতি সহায়তা পায়, ছোট উদ্যোক্তারা সেভাবে পান না। কর ও শুল্ক কাঠামোর কারণে স্থানীয় বাজার থেকে কাঁচামাল ও মধ্যবর্তী পণ্য না কিনে বিদেশ থেকে আমদানি উৎসাহীত হচ্ছে।

তিনি সরকারি প্রকল্পের জন্য স্থানীয় বাজার থেকে ক্রয়ের বাধ্যবাধকতা আরোপের আহ্বান জানান।

একই অভিযোগ করে এসএমই ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. মো. মফিজুর রহমান জানান, এসএমই বিকাশে সরকারের আর্থিক আনুকূল্য ও প্রকল্প আনুকূল্য পাওয়া যায় না। ২০১৯ সালের এসএমই নীতিমালা বাস্তবায়নের জন্য ২ হাজার ১৪১ কোটি টাকার বাজেট হলেও তার বিপরীতে কোন অর্থ পাওয়া যায়নি বলে জানান এসএমই ফাউন্ডেশনের এমডি।

তৃণমূলের এসএমই উদ্যোক্তাদের ব্যাংকিং সেবার আওতায় আনতে প্রতিটি ব্যাংককে শহরে প্রতি তিনটি শাখার বিপরীতে গ্রামাঞ্চলে সাতটি শাখা স্থাপনের নিয়ম করার আহ্বান জানান বেঙ্গল কমার্শিয়াল ব্যাংক লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তারিক মোর্শেদ। তিনি জানান, তার ব্যাংকের ৯০ শতাংশ গ্রাহক এসএমই খাতের।

মুক্ত আলোচনায় নারী ক্ষুদ্র ও কুটির উদ্যোক্তাদের ট্রেড লাইসেন্সসহ অন্যান্য সনদ প্রাপ্তি সহজ করা, বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীর ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতে বিনিয়োগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণ বন্ধে প্রতিযোগিতা আইন কার্যকর করা, এসএমই খাতে গবেষণা ও পণ্য উন্নয়নে ইনস্টিটিউট স্থাপন করা, সরকারের নীতির কারণে কারখানা বন্ধ হলে যথাযথ ক্ষতিপূরণ দিয়ে এক্সিট পলিসি প্রণয়ন, শিল্প খাতে দীর্ঘমেয়াদে ঋণ, প্রকৃত এসএমই উদ্যোক্তাদের ঋণপ্রাপ্তি নিশ্চিত করতে সংজ্ঞা পুনঃনির্ধারণের দাবি জানান বক্তারা।

এনএফ/রফিক

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়