ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ১২ ডিসেম্বর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

ন ডরাই: গল্পের ঘাটতি পূরণ করেছে নির্মাণশৈলী

একা হাসান : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-১২-০২ ৫:৩৬:২০ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-১২-০২ ৯:১৪:৪৮ পিএম

স্ট্রিমিং সার্ভিসের এই যুগে, যখন এক ক্লিকেই ঘরে বসে কিংবা শুয়ে সিনেমা দেখা যায়, তখন ঘণ্টাখানেক জ্যাম ঠেলে কেন মানুষ সিনেপ্লেক্সে যায়? যায় বড় পর্দার স্পেকট্যাকিউলার (Spectacular) ব্যাপারটা ফিল করতে। ঠিক এই জায়গাটাতে ‘ন ডরাই’ সফল। কক্সবাজার বিচ বাস্তবেও মনে হয় এত সুন্দর লাগে না যতটা লেগেছে এই সিনেমায়! এর পুরো ক্রেডিট সিনেমাটোগ্রাফার সুমন সরকারের। তাঁর চমৎকার ফ্রেমিং সেন্স আর কম্পোজিশন এই সিনেমার সেরা দিক। না হলে এই সিনেমার মেলোড্রামাটিক প্লটলাইন কিছু কিছু জায়গায় এত প্রেডিক্টেবল যে মনে হবে- ‘আরে! এই গল্প তো আমি জানি।’ তিন দশক আগের বাংলা সিনেমাতেও বৌমার বাবার সঙ্গে শাশুড়িরা এভাবেই দুর্ব্যবহার করতো। ‘ন ডরাই’-এর সবচেয়ে দুর্বল দিক গল্পের এই ক্লিশে ট্রিটমেন্ট। যেমন বাংলা সিনেমার ট্র্যাডিশনাল ‘কাঁচের বোতলে বাংলা মদের নামে ভাতের মাড়’ খেতে খেতে গালি দেয়ার বিষয়টা আবার ফিরে এসেছে এই সিনেমায়।

তবে গল্পের দিকটার কথা যা বললাম সেই ঘটনাগুলো এখনও এদেশে ঘটে। সে যাই হোক, ঘটনা তো আর গল্প না। একটা গল্প দাঁড় করাতে যেসব অনুষঙ্গ লাগে এই সিনেমায় সেসব পুরোপুরি ছিল বলব না, কিন্তু ছিল। কিন্তু ‘ন ডরাই’কে বলা হচ্ছিল বাংলাদেশের প্রথম সার্ফিং সিনেমা। কিন্তু আড়াই ঘণ্টার সিনেমায় সার্ফিং ছিলো পনেরো মিনিট! যাকে নিয়ে মূল কাহিনী সেই আয়েশাকেই সার্ফিং করতে দেখা গেছে সাকুল্যে দুই মিনিট। বাকিটা টিপিক্যাল বাংলা সিনেমার প্রেমের গল্প। মানে আয়েশা আর সোহেলের হালকা প্রেম দেখানো, পাশাপাশি আয়েশার প্রতিবন্ধকতা। 

তবে প্রশংসনীয় ব্যাপার, অভিনয়ে প্রত্যেকেই যার যার জায়গা থেকে ভালো করেছেন। সুনেহরা-রাজ এবং বাকিদের অভিনয় চমৎকার হয়েছে! এমনিতেই দেশে অভিনেতা-অভিনেত্রীর খরা চলছে। সেই হিসাব করলে এরা বেশ ভালো।  আরেকটা ভালো দিক সিনেমার সাউন্ডট্র্যাক আর কালার টোন। মোহন শরিফের ‘যন্ত্রণা’ ইতিমধ্যেই টক অফ দ্য টাউন। এফডিসির সিনেমার মত ওভারস্যাচুরেটেড কালারের বদলে লাশ (lush) টোন অদ্ভুত সুন্দর লেগেছে!

সিনেমার ভাষা নিয়ে অনেক কথা হচ্ছে। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহার করে একটা ফিচার ফিল্ম বানানোর সাহসকে সাধুবাদ জানাতেই হবে। যদিও সাবটাইটেল না থাকায় অনেক নন-চাঁটগাইয়া দর্শক অখুশি।  অখুশি হওয়া স্বাভাবিক। কিছু শক থেকে হয়তো এই মানসিক হতাশা। চাঁটগাইয়া ভাষায় কিন্তু তাদের সমস্যা না, এই ভাষা নিয়ে তারা হাসি-ঠাট্টা করবে, চাঁটগাইয়া বন্ধুর সাথে মজা করবে বা হালের ব্যাচেলর পয়েন্ট নাটকের মত কিছু একটা হবে অথবা মোশাররফ করিম যেভাবে বরিশালের ভাষা কমেডি করে সেরকম কিছু ঘটালে কিন্তু দর্শক মজা পেত, কিন্তু মেইন ভাষাটাই ছিল চাঁটগাইয়া। আবার কমেডি সিনেমাও না। সেজন্যই অনেকেই হতাশ হবেন বলেই মনে হয়েছে।

তবে উপরি হিসেবে এক বিদেশিনীর কিউট হাসি আর কিছু প্রাপ্তবয়স্ক দৃশ্য আছে। মজার ব্যাপার এই সিকোয়েন্স চলাকালীন থিয়েটারের পিনপতন নীরবতা ছিল অবাক করার মতো!  দর্শক এ ধরনের দৃশ্য বাংলা সিনেমায় আশা করেনি বলেই হয়ত ছোটখাটো শক খেয়েছে। সেজন্য শিষ আর হই-হুল্লোড়ে পুরো হল মেতে ওঠার বদলে চুপসে গেছে। যখন বুঝেছে ততক্ষণে দৃশ্য চলে গেছে পরের দৃশ্যে। রক্ষণশীলেরা মুখ বেজার করলেও, বস্তাপচা নাচের চেয়ে এমন চুম্বন দৃশ্য অনেক শালীন। সিনেমা শেষে সামারি—  গল্পে অজস্র প্লটহোল থাকা সত্ত্বেও ‘ন ডরাই’ যথেষ্ট ওয়েল মেইড একটা সিনেমা।

পৃথিবীতে এমন একটা সিনেমাও নাই, যেটা নিখুঁত। তাই চাইলেও নিখুঁত সিনেমা বানানো সম্ভব না। তবে এতদিন ধরে আমরা যে বলতে পারতাম আমাদের বাজেট নেই, পর্যাপ্ত টেকনিক্যাল সাপোর্ট পান না দেশের পরিচালকেরা, সে সুযোগ আর নেই। এখন দেশের অডিয়েন্সও আসলে গ্লোবাল অডিয়েন্স। তারা নেটফ্লিক্স দেখতে পারে, টরেন্ট দিয়ে সিনেমা পাইরেসি করে ল্যাপটপে বা মোবাইলে দেখতে পারে। এই অডিয়েন্স সামনে আর কোন ক্লিশে কাহিনী গ্রহণ করবে না। খুব ভালো কিছু না হোক, অ্যাভারেজ জিনিসও যদি তারা না পায় তাহলে গাঁটের টাকা খরচ করে, রাস্তার জ্যাম, ধুলা ইত্যাদি পেরিয়ে তারা সিনেমা হলে কেন যাবে? এই অডিয়েন্স কিন্তু আবেগী না। তারা বাস্তববাদী। দেশী সিনেমা তৈরি করলেই দেখতে হবে এমন মনোভাবও তাদের নেই। তারা সবাই জেনেশুনেই সিনেমা দেখতে যান।

আমরা হলে গিয়ে এতোবার হতাশ হয়েছি যে, এখন হলে যেতে চাইলে দশবার ভাবতে হয়। যাব কি যাব না! তাই পরিচালক বা কলাকুশলীরা যতই বলুক, দেশি সিনেমা দেখেন, তখন তারা নাক কুচকে তাকায়। হয়তো মনে মনে বলে- সেই বস্তাপচা সিনেমা! অথচ এই বাংলাদেশে এক সময় হলে সিনেমা রিলিজ হলে লোকের লাইন পড়ে যেত। ‘বেদের মেয়ে জোৎস্না’ দেখার জন্য সাধারণ দর্শক ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেছে। আবার লক্ষ্য করুন, কিছুদিন আগে যখন এ্যাভেঞ্জারের শেষ পার্ট মুক্তি পেল তখন টিকেটের জন্য কত দৌড়াদৌড়ি। এগুলো কিন্তু আমাদের দেশেই হয়েছে। তাহলে বোঝাই যাচ্ছে, হলে গিয়ে সিনেমা দেখার দর্শক প্রচুর আছে। তাদের ঠিকঠাক গল্প, ভিএফএক্স বা পার্ফেক্ট সিনেমার জন্য যা প্রয়োজন সব দিতে হবে।

এতক্ষণ যে কথাগুলো বললাম, বাংলাদেশের সিনেমা নিয়ে দু’চার কথা বলার কিছু আফটার ইফেক্ট আছে- সেটা এখন বলব। এক ‘দেশি পণ্য কিনে হোন ধন্য' দর্শকশ্রেণি সিনেমা যত বাজেই হোক, আবহমানকাল ধরে চলে আসা বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পের দোহাই দিয়ে তাকে খারাপ বলতে দেয় না। আরেক দিক হচ্ছে- ফিল্ম থিওরি জানা, উচ্চমার্গীয় দর্শকশ্রেণি বাংলা সিনেমায় ভালো কিছু খুঁজে পায় না। মাঝ থেকে আমাদের শক্তপোক্ত ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি দাঁড়াচ্ছে না। উল্টো সিনেমা হল এখনও কমছে। যদিও আবার অল্প অল্প করে হলেও সিনেপ্লেক্স-মাল্টিপ্লেক্সের সংখ্যা বাড়ছে। এই অগ্রগতি ধরে রাখতে আমাদের ‘মনপুরা’, ‘আয়নাবাজি’, ‘ঢাকা অ্যাটাক’ কিংবা ‘ন ডরাই’-এর মত সিনেমা দরকার প্রতিনিয়ত। এ কারণেই ‘ন ডরাই’কে শেষ পর্যন্ত ভালোই বলব। কারণ গল্প যাই হোক, মেকিং চমৎকার! যারাই দেখেছেন, সবাই মেকিং নিয়ে তেমন কোনো প্রশ্ন করতে পারবেন বলে মনে হয় না। 

 

ঢাকা/তারা 

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন