ঢাকা, রবিবার, ৯ ফাল্গুন ১৪২৬, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

প্রোডাকশন বয়ের চোখে শুটিং

আমিনুল ইসলাম শান্ত : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০১-২২ ৮:২৪:৪৮ এএম     ||     আপডেট: ২০২০-০১-২২ ৮:৪৪:৪২ পিএম
ছবি : মিলটন আহমেদ

‘‘দৃশ্যটা চা খাওয়ার ছিল। অভিনয় করছিলেন শর্মিলা মা (শর্মিলী আহমেদ)। পরিচালক মাসুদ মহিউদ্দিন ভাই বললেন, কাপে চা দেওয়ার দরকার নাই, শুধু পানি দিয়ে দে। আমিও তাই করি। শর্মিলা মা শটে দাঁড়িয়ে বলেন, ‘কিরে তোদের কি চায়ের বাজেটও নেই? পানি দিয়ে শুটিং করতে হবে!’ কথাগুলো মাসুদ ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বলেন তিনি। আমি বলি, এখুনি চা দিচ্ছি আন্টি। এর মধ্যে মাসুদ ভাই আমার পিঠে একটা থাপ্পড় মারেন। চা দিয়ে রান্না ঘরে ফিরে এসে মনে পড়ে—মাসুদ ভাই পানি দিতে বললেন, আবার মাসুদ ভাই আমাকে থাপ্পড় মারলেন। তখন বুক ফেটে কান্না আসছিল। কিন্তু জোরে কান্না করতে পারছিলাম না। এর মধ্যে খুঁজতে খুঁজতে মাসুদ ভাই এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে বলেন, ‘সরি, সরি! তুই রাগ করিস না।’ এসময় আমার আরো জোরে কান্না আসতে থাকে।’’—রাইজিংবিডির সঙ্গে আলাপকালে কথাগুলো বলেন প্রোডাকশন ম্যানেজার মো. আব্বাস আলী।

দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে নাটক-টেলিফিল্ম ও বিজ্ঞাপনের শুটিংয়ে কাজ করছেন আব্বাস। ২০০২ সালে ছোটবেলার বন্ধু প্রোডাকশন ম্যানেজার গিয়াসের হাত ধরে এই জগতে পা রাখেন তিনি। তখন কাঁচামালের ব্যবসা করতেন আব্বাস। এ ব্যবসা বাদ দিয়ে এই অঙ্গণে পা রাখেন শুধু নায়ক-নায়িকা দেখার লোভে।

তার ভাষায়—‘বিনোদনের জন্য এই অঙ্গণে পা রাখি। এখানে সেটল হবো এমন চিন্তা থেকে আসিনি। আগে শুটিং দেখলেই রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতাম। নায়ক-নায়িকা দেখার জন্য এফডিসির গেটে দাঁড়িয়ে থাকতাম। এজন‌্য বিএফডিসির দারোয়ানদের লাঠির অনেক বাড়ি খেয়েছি। এখানে কাজ করে কত টাকা পাব, ব্যবসা করি সেটার লোকসান হবে, এসব নিয়ে কোনো চিন্তা ছিল না। মাথায় একটা বিষয়ই ছিল নায়ক-নায়িকা দেখতে পাব।’

২০০২ সালে প্রোডাকশন বয় হিসেবে কাজ শুরু করেন আব্বাস। নগরীর উত্তরার লাবণী ২ শুটিং হাউসে প্রথম কাজ করেন তিনি। প্রথম দিনের কাজের স্মৃতি হাতড়ে আব্বাস বলেন, ‘‘আমি প্রথম কাজ করি ‘কালো চশমা’ নাটকে। পরিচালকের নাম ভুলে গেছি। কাজটি বিটিভির ছিল। এ নাটকে অভিনয় করেন মাহফুজ আহমেদ ভাই ও তনিমা হামিদ আপা। নাটকটির নাম হৃদয়ে খুব যত্ন করে লালন করেছি। কারণ, এটি আমার জীবনের প্রথম কাজ। এখন ডিওপিদের সঙ্গে বন্ধুর মতো সম্পর্ক। কিন্তু তখন প্রধান ক্যামেরা ম্যানের খুব পাওয়ার ছিল। সেটে বন্ধু গিয়াস বলল, ‘দুজন আর্টিস্ট, প্রধান ক্যামেরা ম্যান, ম্যানেজার ও পরিচালককে ঠিক রাখবি।’ কিন্তু ঠিক রাখব কীভাবে? গিয়াস বলল, ‘আধা ঘণ্টা পর পর পানি ও চা সাধবি।’’

 

 

শুটিং সেটে মাহফুজ আহমেদের অদ্ভুদ অভ্যাস ছিল। খাবারের মেন্যুতে তার মাছের মাথা চাই-ই চাই। আব্বাস বলেন, ‘মাহফুজ ভাইয়ের খাবারের মেন্যুতে মাছের মাথা রাখতেই হতো। সব শুটিং সেটে মাহফুজ ভাই মাছের মাথা খেতেন। এদিন হঠাৎ মাহফুজ ভাই হাঁক ছাড়লেন—প্রোডাকশনে কে আছস, চা দে। ভাই, সবসময় তুই বলে সম্বোধন করতেন। আমি যখন চা বানাচ্ছিলাম তখন ভেতরে ভেতরে উত্তেজনা কাজ করছিল। আমি মাহফুজ ভাইকে চা খাওয়াব! তনিমা আপাকে চা খাওয়াব! এদিন রাত ৮টা পর্যন্ত শুটিং করি। পারিশ্রমিক হিসেবে ২০০ টাকা পেয়েছিলাম। এ নিয়েই খুশিতে আত্মহারা ছিলাম।’

তারপর থেকে প্রোডাকশন বয় হিসেবে চলতে থাকে আব্বাসের কাজ। ব্যবসার পাশাপাশি মাসে ২-৪ দিন প্রোডাকশন বয়ের কাজ করেন তিনি। ধীরে ধীরে শুটিংয়ের কাজ বাড়িয়ে দেন। ২০০৪ সালে কাঁচামালের ব্যবসা বাদ দিয়ে এই অঙ্গণে স্থায়ী হয়ে যান তিনি। তবে এর পেছনে রয়েছে পরিশ্রম ও দায়িত্ববোধ। কারণ আব্বাসের কাজে মুগ্ধ হয়ে সারা মাস কাজ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন আরেক প্রোডাকশন ম্যানেজার হানিফ।

আব্বাস বলেন, ‘‘সেদিন চয়নিকা দিদির শুটিং করছিলাম। শুটিংয়ের বিরতি চলছিল। সবাই এদিক ওদিক ঘুরতে যায়। কিন্তু আমি সেটে বসে থাকি। হানিফ ভাই বলেন, ‘সবাই ঘুরতে গেল তুই বসে আছিস কেন?’ আমি বললাম, সেটে আর্টিস্ট আছে, সবাই চলে গেলে তাদের কিছু লাগলে কে এনে দেবে? একথা শোনার পর হানিফ ভাই বলেন, ‘এখন থেকে তুই মাসের ৩০ দিন আমার সঙ্গে কাজ করবি। তবে শর্ত হলো—অন্য কোথাও কাজ করতে পারবি না। করলেও সেটা আমার কাছে শুনে করবি।’ এ কথা শোনার পর আমি তো আত্মহারা। এত খুশি যে, ঈদের চেয়েও বেশি আনন্দ লাগছিল।’’

চার বছর প্রোডাকশন বয়ের কাজ করার পর ২০০৬ সালে প্রোডাকশন ম্যানেজার হিসেবে কাজ শুরু করেন আব্বাস। দীর্ঘ ১৮ বছরে অসংখ্য নাটক-টেলিফিল্ম ও বিজ্ঞাপনে কাজ করেছেন আব্বাস। ওয়ালটনের একটি বিজ্ঞাপন দিয়ে তার বিজ্ঞাপনের কাজ শুরু। আর এ সুযোগ করে দেন মিলটন আহমেদ ও শাহিন সরকার।

অভিনয়ও করেছেন আব্বাস। ছোট ছোট চরিত্রে শতাধিক নাটক-টেলিফিল্মে অভিনয় করেছেন তিনি। এমনও হয়েছে ঈদে তার অভিনীত ১০-১২টি নাটক প্রচার হয়েছে। নরেশ ভূঁইয়ার একটি নাটকে প্রথম রিকশাওয়ালার চরিত্রে অভিনয় করেন আব্বাস। প্রথম অভিনয়ের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, ‘এক রিকশাওয়ালাকে ডেকে আনা হয়। সে শটের সময় শুধু ক্যামেরার দিকে তাকাচ্ছিল। পরে ওই রিকশাওয়ালাকে ধমক দিয়ে বলি, এইভাবে চালাবি। পাশেই বসা ছিলেন নরেশ দা ও মিলটন ভাই। ওনারা চুপচাপ আমার কাণ্ড দেখেন। এ সময় নরেশ দা বলেন, ‘তুই হেতেরে কিলাই কস, তুই নিজেই তো দিতে পারস। এই মিলটন আব্বাইসারে এই চরিত্র করতে ক।’ তারপর চরিত্রটা করি।’’

 

 

কাজ করতে গিয়ে শিল্পী পরিচালকদের যেমন ভালোবাসা পেয়েছেন, তেমনি অপ্রীতিকর ঘটনাও তার সঙ্গে ঘটেছে। যে মানুষদের দিন-রাত খেটে সেবা করে যান, তারাই আবার দুর্ব্যবহার করেছেন। এমন এক ঘটনা ঘটেছিল ‘কবি’ নাটকের শুটিং সেটে। এটি যৌথভাবে পরিচালনা করছিলেন আরিফ খান ও সাধনা আহমেদ।

সেদিনের ঘটনা বর্ণনা করে আব্বাস বলেন, ‘মহেড়া জমিদার বাড়িতে শুটিং করছিলাম। আমাকে গান প্লে করতে বলা হয়। আমি প্লে করি কিন্তু গানটি যেখান থেকে প্লে করার কথা তার চেয়ে এক লাইন আগে থেকে প্লে হয়। তখন সাধনা আপা গালি দিয়ে ওঠেন। আমার খুব মন খারাপ হয়ে যায়। কারণ, কাজটি নিয়ে অনেক পরিশ্রম করেছিলাম। এই নাটকের শুটিংয়ের এক লটে তারিন আপাও আমাকে গালি দিয়েছিলেন। তারপর আরিফ ভাই নাটকের কাজ সাত মাস বন্ধ রাখেন। পরে জানতে পারি, তারিন ও সাধনা আপা আমার কাছে সরি না বললে শুটিং আর করবেন না আরিফ ভাই। ততদিনে এই নাটকের জন্য আরিফ ভাই ১৭ লাখ টাকা খরচ করে ফেলেছেন। অথচ শুধু আমাকে ভালোবেসে আরিফ ভাই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। বিষয়টি জানতে পেরে আমি খুব আবাক হয়েছিলাম। অনেক রিকোয়েস্ট করার পর আরিফ ভাই কাজটি আবার শুরু করেন।’

‘আমরা প্রোডাকশন বয়েরা শিল্পীদের সেবা করার চেষ্টা করি। এতটাই চেষ্টা করি যে, পারলে নিজের টাকা খরচ করে তাদের সেবা করার চেষ্টা করি। তারপরও অনেক আর্টিস্ট দুর্ব্যবহার করেন। এটা আবার সব আর্টিস্ট করেন না। যখন কোনো আর্টিস্ট একজন প্রোডাকশন বয়ের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেন, তখন খুব কষ্ট লাগে।’ বলেন আব্বাস।

প্রোডাকশন বয়দের যে পারিশ্রমিক দেওয়া হয় তা দিয়ে সংসার চালানো কঠিন। তারপরও কাজটি ভালোবাসার জায়গা থেকে করেন। জীবনের বাকি সময়টাও এই অঙ্গণে কাজ করতে চান আব্বাস। তার ভাষায়, ‘আসলে মিডিয়াটা হিরোইনের নেশার মতো। একবার মিডিয়ার পানি পেটে পড়লে ছাড়া যায় না। আমাদের অনেক বন্ধু-বান্ধব এ কাজ ছেড়ে গেছে কিন্তু কিছুদিন পর আবারো ফিরে এসেছে। আসলে অর্থ কম পেলেও এখানে বিনোদন ও ভালোবাসা দুটোই আছে।’



ঢাকা/শান্ত/সনি