ঢাকা, সোমবার, ১৬ চৈত্র ১৪২৬, ৩০ মার্চ ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

নায়কের প্রবেশ ও প্রস্থান

সুশীল সাহা : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০২-২৩ ১২:০৬:০২ এএম     ||     আপডেট: ২০২০-০২-২৩ ৩:০৯:৩৮ পিএম
তাপস পাল (১৯৫৮-২০২০)

মাত্র ক’দিন হলো প্রয়াত হয়েছেন অভিনেতা ও সাংসদ তাপস পাল। ৬১ বছর বয়সে তাঁর এই অকালপ্রয়াণ কতখানি অনিবার্য ছিল জানি না, তবে তাঁর নামের পাশে এখন বোধ হয় নিয়তিতাড়িত শব্দটি অনায়াসে যোগ করা যায়, কিংবা নির্মম ভাগ্যবিড়ম্বিত। আশ্চর্য কলকাতা! জীবন যেমন চলছিল, সেই গতিতেই চলছে। অথচ তাপস পালের মত একজন তারকার শবযাত্রায় তেমন লোক পাওয়া গেল না। প্রথামাফিক তাঁর শবদেহ রবীন্দ্রসদনে ও টালিগঞ্জের ফিল্মপাড়ায় আনা হলো ঠিকই কিন্তু অশ্রুসজল তেমন কাউকে কাউকে দেখা গেল না, কেওড়াতলা শ্মশানে তাঁর দেহ পুড়ে ছাই হয়ে গেল। দেখা মিলল না সংবাদ শিকারী কিংবা তুখোড় ফটোগ্রাফারদের। কিছু রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীর চাপান উতোর চলল সারাক্ষণ আর খবরের কাগজে পাতায় দেখা মিলল বিভিন্ন প্রজন্মের তারকাদের প্রথামাফিক শোকোচ্ছ্বাস। আর ওদিকে ফেসবুকের পাতা জুড়ে চলল গায়ের ঝাল মেটানো নানারকম আমোদগেঁড়ে উক্তি।

অথচ বাংলা ছায়াছবির জগতে তাঁর আবির্ভাবের সময়টি ছিল সত্যি সত্যি মনে রাখার মতো। উত্তম পরবর্তী যুগে প্রায় ম্রিয়মান কলকাতার ছায়াছবির জগতে সেই সময় তরুণ মজুমদারের ‘দাদার কীর্তি’ (১৯৮০) ছিল এক সত্যিকারের চমক। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সুরসৃষ্টি, অসাধারণ গল্পের বুনুনি, চমৎকার লোকেশন সর্বোপরি মহুয়া রায়চৌধুরী, দেবশ্রী রায়, রুমা গুহঠাকুরতা, কালী ব্যানার্জী এবং অনুপকুমারের দুঁদে অভিনেতাদের পাশে নতুন একটি নাম সংযোজিত হলো তাপস পাল। কুড়ি/একুশ বছরের গোবেচারা নিপাট সোজা সরল গ্রাম্য যুবকের চরিত্রে তাঁর অভিনয় সবার মন ছুঁয়ে গেল। তাঁর লিপ দেওয়া হেমন্তর ‘চরণ ধরিতে দিও, নিও গো আমারে’ তখন মুখ মুখে ফিরতে থাকল। জন্ম হলো একজন সুপার স্টারের।

চন্দননগরের লোকাল ট্রেনের ঘামে ভেজা নিত্য যাত্রার জীবন ছেড়ে দক্ষিণ কলকাতার বিলাসবহুল শীততাপ নিয়ন্ত্রিত ফ্ল্যাটে আরাম আয়েসের জীবনে ঢুকতে তাঁর বেশি সময় লাগল না। পরের ছবি ‘সাহেব’ (১৯৮১) সুপারহিট। ক্রমে তাঁর অভিনীত গুরুদক্ষিণা, ভালবাসা ভালবাসা, অনুরাগের ছোঁয়া, পারাবত প্রিয়া ইত্যাদি ছবিগুলো বক্স অফিসের রেকর্ড স্পর্শ করল। আর পিছন ফিরে তাকাতে হলো না তাঁকে। টালিগঞ্জ পাড়ায় তাঁর জায়গা হলো নায়কোপম এক উচ্চাসনে। এইভাবে গোটা আশির দশক দাপিয়ে বেড়ালেন তিনি। প্রসেনজিৎ আর চিরঞ্জীতের পাশে তাঁর নামও সমানভাবে উচ্চারিত হতে থাকল। যদিও সেই সময়টা বাংলা ছবির ক্ষেত্রে তেমন একটা ভালো সময় নয়। ঋত্বিক নেই, সত্যজিৎ রায় অসুস্থ। তপন সিংহ বা মৃণাল সেন ছবি করলেও তাপস পালের সৌভাগ্য হয়নি তাঁদের নজরে পড়ার। একমাত্র বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত অনেক পরে ‘উত্তরা’ (২০০০) ছবিতে এক কুস্তিগিরের ছোট্ট চরিত্রে তাঁকে সুযোগ দিয়ে বেশ চমকে দিয়েছিলেন। বলতে দ্বিধা নেই, তাপস পাল সেই সুযোগের পূর্ণ সদ্ব্যবহার করেছিলেন। ক্রমশ তাঁর পেলব কোমল চেহারাটি কোথায় যেন হারিয়ে গেল। ভারি শরীর নিয়ে তবু নর্তন কুর্দনের নানা ভঙ্গি দিয়ে তিনি আরো কিছুদিন তবু টালিগঞ্জে টিকে থাকলেন।

‘মঙ্গলদ্বীপ’-এ রণজিৎ মল্লিকের সঙ্গে 

নতুন শতাব্দীর প্রায় প্রারম্ভকালেই তাঁকে আমরা পেলাম আলিপুরের বিধায়ক রূপে। বসলেন বিরোধী শিবিরের চেয়ারে। অনতিকাল পরেই তাঁকে কৃষ্ণনগরের সাংসদ হিসেবেও আমরা দেখতে পেলাম। সিনেমা জগতের ক্যারিশমা দিয়েও যে রাজনৈতিক নেতা হওয়া যায়, তার প্রমাণ তো ভারতীয় রাজনীতিতে কম নেই। তবে বিরোধী শিবিরের তকমা মাথায় নিয়ে তৃণমূল কংগ্রেসে আস্থাভাজন হয়ে তাপস পাল তাঁর ভবিষ্যৎ গোছানোর রাস্তাটা মোটামুটি পাকা করে রাখলেন। এবং প্রকৃতপক্ষে ২০১৩ সালে তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় আসার পরে তাঁকে প্রভূত পারিতোষিকে ভূষিত করা হলো। দুর্ভাগ্যের কথা, ওই ২০১৩ সালেই মাত্র ৫৩ বছর বয়সে  তিনি তাঁর ছায়াছবির ক্যারিয়ারের ইতি টানেন।

শুরু হয় পালাবদলের পালা। তিনি রীতিমত জড়িয়ে পড়েন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে। ২০১৪ সালের নির্বাচনেও তিনি ওই কৃষ্ণনগরের সাংসদ হিসেবে পুনর্নিবাচিত হন। সম্ভবত তখন থেকেই তাঁর মুখে ক্ষমতার দম্ভ উচ্চারিত হতে থাকে। ২০১৪ সালেই লোকসভা নির্বাচনে জেতার পরে নাকাশিয়াড়ার চৌমুহায় গিয়ে তাঁর মুখের ‘কুবাক্য’ রীতিমতো ‘ভাইরাল’ হয়ে যায়। তাঁর ক্লিন ইমেজে কিছুটা কালি ছিটিয়ে দেয়। পরে তিনি ক্ষমা চাইলেও এর রেশ চলতে থাকে, চলতেই থাকে। তাঁর নিজের দলেও তখন থেকেই তাঁর জায়গাটা নড়বড়ে হয়ে যায়। ততদিনে তাপস পাল রোজভ্যালি সংস্থার অর্থনৈতিক কেলেঙ্কারীর সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছেন। এই দুর্নীতির টানাপোড়েনেই তিনি সিবিআইয়ের বেড়াজালে আটকে পড়েন এবং গ্রেফতার হয়ে তেরো মাস হাজতবাস করেন। ইতোমধ্যে প্রবলভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাঁর রক্তে উচ্চ শর্করার প্রকোপ দেখা দেয়। গাড়ি দুর্ঘটনার পরে তাঁর হেড ইনজুরিও হয়, মেরুদণ্ড ও কোমরের যন্ত্রণা হয় নিত্যসঙ্গী। অবসাদে অবসাদে বিষণ্ণ এক ক্লান্তির শিকার হন তিনি।

কেমন অভিনেতা ছিলেন তাপস পাল? এককথায় বলা যায়- মধ্যমানের। টালিগঞ্জের দুর্ভাগ্য যে উত্তমকুমার, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, অনিল চট্টোপাধ্যায়, বসন্ত চৌধুরী নিদেনপক্ষে বিশ্বজিতের যোগ্য উত্তরাধিকার পেল না গোটা আশির দশকে। যেমন ছবির মান, তেমনি অভিনয়। বাংলাদেশ থেকে ফেরদৌসকে এনে অনেকটা অভাব পূরণ করতে হয়েছিল তখন। কিন্তু অঞ্জন চৌধুরী কিংবা স্বপন সাহার দৌরাত্মে বাংলা ছবির বেহাল দশা শুরু হলো। সেই খরা আজও তেমনভাবে কাটে নি। একমাত্র ব্যতিক্রম ঋতুপর্ণ ঘোষ। তাঁর অকালপ্রয়াণের ক্ষতি আজও পূরণ হয় নি।

আর মানুষ তাপস পাল? এ নিয়ে নানা বিতর্ক ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। ফেসবুকের পাতায় তাঁর নামে অজস্র লেখা হয়েছে। তাঁর গুডি গুডি ইমেজের অভ্যন্তরে যে একটা মেফিস্টোর আত্মা লুকিয়ে ছিল, এ নিয়ে এখন আর কেউ দ্বিমত পোষণ করেন না। নইলে কেন তিনি এতদিন জেলের ঘানি টানলেন? তবে বেশ কয়েক বছর আগে চন্দননগরের বসত বাড়ি নিয়ে মায়ের সঙ্গে বিবাদ বিসম্বাদের খবর আমরা পেয়েছিলাম নানা সূত্র থেকে। বস্তুত ঘটনার গভীরে না গিয়েই তখন কিন্তু জনমত গিয়েছিল তাপস পালের বিরুদ্ধেই। তারপর এই রোজভ্যালি কাণ্ড। দুয়ে দুয়ে অবশেষে চার হলো।

অতীতে যা কিছুই ঘটুক না কেন, মৃত্যু এসে সব কালিমা দূর করে দিয়েছে। অন্তত টালিগঞ্জ পাড়ার নক্ষত্রেরা এখন তাপস বন্দনা করেছেন এমনভাবে, যেন কোনো কলঙ্কের কালি ওঁর গায়ে ছিল না কোনো দিন। প্রসেনজিৎ বলেছেন, ‘... বাংলা সিনেমা একজন নক্ষত্রকে হারাল। আর আমি একজন বন্ধুকে।’ চিরঞ্জিৎ বলেছেন, ‘... বাংলা সিনেমা ইতিহাসে তাপস একজন অসাধারণ হিসেবে থেকে যাবে।’

‘অবোধ’-এ তিনি জুটি বেঁধেছিলেন মাধুরী দিক্ষীতের সঙ্গে। তিনিই মাধুরীর প্রথম নায়ক

যে যাই বলুক, তাপস পাল বাংলা ছায়াছবির জগতে ক্ষণিক আলোর চমক দেখিয়েছিলেন ঠিকই। অন্য ছবিগুলো বাদ দিলেও তাঁর অভিনীত ‘দাদার কীর্তি’ ও ‘সাহেব’ ছবিটা কিন্তু বাঙালি দর্শক বারবারই দেখবে। অমন ইনোসেন্ট লাজুক মানুষটাকে কি সহজে ভোলা যায়! বাংলা সিনেমার কয়েকজন নামি স্টারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তিনি তাঁর সবটা দিয়ে অভিনয়ও করেছিলেন। নিজের অস্তিত্বকে প্রতিষ্ঠা করার মূলমন্ত্র তিনি আয়ত্ব করতে পেরেছিলেন সেই সময়েই, আর পেরেছিলেন বলেই প্রথম ও দ্বিতীয় ছবিতেই তিনি দর্শক হৃদয়ে নিজের আসন পাকা করে নিতে পেরেছিলেন। দুর্ভাগ্যের বিষয় সেই আসন তিনি শেষ পর্যন্ত রক্ষা করতে পারেন নি। এই আক্ষেপ কেবল আমার নয়, আরো অনেকের।

তবে যে ব্যবস্থা মানুষকে লোভের ফাঁদে পা দিতে সাহায্য করে তার বিরুদ্ধেও তো সমানভাবে সোচ্চার হওয়া দরকার। কেননা আসল অপরাধী তো তাঁরাই, যাঁরা তাপস পালের মত দক্ষ অভিনেতাদের হাতের পুতুল বানিয়ে ইচ্ছেমতো ওঠবস করায়। খ্যাতি-বিত্তের চটকদার লোভ দেখিয়ে কুকর্মগুলি করিয়ে নেয় এবং কাজ মিটে গেলে গা ঢাকা দেয়।

তাপস পালের মৃত্যুতে বাংলা চলচ্চিত্র জগতের এক অপূরণীয় ক্ষতি হলো, এমন একটি বাক্য দিয়ে এই লেখা শেষ করব না। তাঁর মৃত্যুতে কেন জানি না ডিএল রায়ের একটি গানের লাইন বারবার মনে আসছে। লাইনটি হলো-

‘আমরা এমনি এসে ভেসে যাই                                                                                                  আলোর মতন, হাসির মতন,
কুসুমগন্ধ রাশির মতন,
হাওয়ার মতন, নেশার মতন
ঢেউয়ের মতন ভেসে যাই
আমরা এমনি এসে ভাসে যাই।’


কলকাতা/তারা