ঢাকা     রোববার   ০৯ আগস্ট ২০২০ ||  শ্রাবণ ২৫ ১৪২৭ ||  ১৯ জ্বিলহজ্জ ১৪৪১

‘ঘরে স্ত্রী-সন্তানের মুখের দিকে তাকাতে পারি না’

রাহাত সাইফুল || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ০৯:৩৮, ১১ জুলাই ২০২০  
‘ঘরে স্ত্রী-সন্তানের মুখের দিকে তাকাতে পারি না’

করোনায় যন্ত্রশিল্পীদের জীবনে নেমে এসেছে দুর্দিন (ফাইল ফটো)

বাদ্যযন্ত্র ছাড়া গান অপূর্ণ। সুর এবং তালের মিলিতভাব বাদ্যযন্ত্রের মাধ্যমেই প্রকাশ পায়। ঢোল, তবলা, হারমোনিয়াম, বাঁশির মতো বাদ্য গানে অনেক আগে থেকেই ব্যবহৃত হয়ে আসছে। আধুনিক এই সময়ে গানের সঙ্গে আরো বাদ্যযন্ত্র যুক্ত হয়েছে। ফলে গায়কের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নিত্যনতুন যন্ত্রশিল্পী।

কম্পিউটারের কিবোর্ডে আটকে গেছে যন্ত্রশিল্পীদের সুদিন। এখন অনেক বাদ্যযন্ত্র কম্পিউটারের মাধ্যমেই বাজানো যায়। ফলে যন্ত্রশিল্পীদের কাজের ক্ষেত্র আগের তুলনায় অনেক কমেছে। মরার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে এসেছে করোনা। এই করোনাকালে স্টেজ শো বা টেলিভিশনে লাইভ সংগীতানুষ্ঠান একেবারেই হচ্ছে না। ফলে যন্ত্রশিল্পীরা পড়েছেন বিপাকে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দেশের যন্ত্রশিল্পীরা এখন বেকার সময় কাটাচ্ছেন। উপার্জন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাদের অনেকেই বাধ্য হয়ে ভিন্ন পেশায় ঝুঁকছেন। অনেকে অর্থাভাবে রাজধানী ছেড়ে চলে যাচ্ছেন বলেও জানা গেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন যন্ত্রশিল্পী রাইজিংবিডিকে বলেন, ‘একমাত্র কনসার্টে বাজিয়েই আমরা কিছুটা উপার্জন করতে পারি। মুজিব বর্ষের কারণে বেশ কিছু প্রোগ্রামে বাজানোর ডাক পেয়েছিলাম। বছরজুড়েই বিভিন্ন স্থানে কনসার্ট হওয়ার কথা ছিল। করোনার কারণে সব ভেস্তে গেছে।’

তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘গত তিনমাস বেকার। বাসা ভাড়া দিতে পারছি না। বাড়িওয়ালার কাছ থেকে পালিয়ে থাকা যায় কিন্তু ঘরে স্ত্রী-সন্তানদের মুখের দিকে তাকাতে পারি না। অনেক বড় বড় শিল্পীর সঙ্গে বাজিয়েছি। এই বিপদের দিনে একজনও জানতে চায়নি- কেমন আছি? কীভাবে আমাদের দিন কাটছে?’

অন্য অনেক পেশাজীবীর মতো যন্ত্রশিল্পীরাও কেউ ভাবেননি এমন দুর্দিন সহসা আসবে! গিটারবাদক অভিজিৎ চক্রবর্তী জিতু বলেন, ‘১৮ বছর হলো গিটার বাজাই। দেশের সব শিল্পীর সঙ্গে বাজিয়েছি। এক লাখ টাকা শিল্পীরা পেলে আমরা মিউজিশিয়ানরা পাই ৫ হাজার টাকা। এতো কম পারিশ্রমিকেই আমরা কাজ করে যাচ্ছি। স্টেজ শো ছাড়া আমরা বেকার। অর্থাভাবে ঢাকা ছেড়ে গ্রামের বাড়ি চলে যাচ্ছেন অনেকে। কেউ অন্য ব্যবসা শুরু করেছেন।’

যন্ত্রশিল্পীদের পারিশ্রমিক তুলনামূলক অনেক কম। তারপরও গান ভালোবেসে অনেকে যন্ত্রশিল্পীর পেশাজীবন বেছে নেন। এই দুর্দিনে বুঝতে পারছেন যন্ত্রশিল্পীর যন্ত্রণা! পুঁজি নেই। সরকারি অনুদান নেই। যে গায়কের সঙ্গে একদিন স্টেজ মাতিয়েছেন তিনিও এখন খোঁজ নেন না। অভিজিৎ বলেন, ‘ব্যাংক আমাদের লোন দেয় না। কারো কাছে হাত পাততে লজ্জা লাগে! এই অসময়ে কেউ সহযোগিতা করলে হয়তো ঢাকা ছেড়ে যেতে হতো না। এভাবে চললে অনেকেই এই পেশা থেকে দূরে চলে যাবে।’

সহসা কনসার্ট শুরু হবে এমন কোনো সম্ভাবনা নেই। এখন হাতে গোনা যে নতুন গান হচ্ছে, সেগুলোর বেশিরভাগই ইউটিউবে আপলোড করা হচ্ছে। এ ধরনের গান তৈরির ক্ষেত্রে যন্ত্রশিল্পী গুরুত্বপূর্ণ নয়। ফলে যন্ত্রশিল্পীদের প্রয়োজনীয়তা আরো কমেছে। বাধ্য হয়েই তাদের বেছে নিতে হচ্ছে অন্যজীবন। অথচ অনেক সাধনার পরেই একজন দক্ষ যন্ত্রশিল্পী তৈরি হয়।

যন্ত্রশিল্পীদের চরম অর্থ সংকটে শিল্পীরাও পাশে এসে দাঁড়াননি। এখন যন্ত্রশিল্পীদের সহযোগিতায় সরকারি প্রণোদনা ও বিত্তবান শিল্পীরা এগিয়ে না এলে প্রতিভাবান অনেক যন্ত্রশিল্পী হারিয়ে যাবেন। তাহলে সংগীতাঙ্গন চরম ঝুঁকিতে পড়বে বলে মনে করছেন সংগীতবোদ্ধারা।

 

ঢাকা/তারা

রাইজিংবিডি.কম

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়