ঢাকা     রোববার   ২০ সেপ্টেম্বর ২০২০ ||  আশ্বিন ৫ ১৪২৭ ||  ০২ সফর ১৪৪২

‘করোনা শিখিয়েছে অফিসে না গিয়েও কাজ করা যায়’

রোবেনা রেজা জুঁই || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ০৯:৪৭, ৭ আগস্ট ২০২০   আপডেট: ১০:৩৯, ২৫ আগস্ট ২০২০
‘করোনা শিখিয়েছে অফিসে না গিয়েও কাজ করা যায়’

ছোটবেলা ঈদুল ফিতর ঢাকায় কাটাতাম। কোরবানির ঈদ করতাম গ্রামের বাড়ি। অনার্স তৃতীয় বর্ষে বিয়ে করি। মোশাররফ (মোশাররফ করিম) ও আমার যৌথ জীবন শুরু হয়।

বিয়ের পর প্রথম কোরবানির ঈদ শ্বশুরবাড়িতে করেছিলাম। শুধু প্রথম ঈদ নয়, বিয়ের পর প্রথম শ্বশুরবাড়ি যাওয়া। কারণ আমাদের বিয়ে হয়েছিল ঢাকায়। ফলে ভেতরে আলাদা ভয়, উত্তেজনা, কৌতূহল কাজ করছিল। তাছাড়া আমাদের কালচারাল গ্যাপ আছে। আমি তো বরিশালের মেয়ে না, বরং দূরদেশের মেয়ে— জন্ম, বেড়ে ওঠা ঢাকায়। ফলে এলাকার মানুষের মনে কৌতূহল ছিল— দেখি মেয়েটি বউ হিসেবে কেমন!

তবে আমার ভাগ্য ভালো, সবাই আমাকে ভালোভাবেই গ্রহণ করেছিলেন। শ্বশুরবাড়ির সবার মধ্যেই আন্তরিকতা ছিল। সবাই একসঙ্গে ঈদ করেছিলাম। ওই ঈদ আমার কাছে মেমোরিবল।

ক্লাস এইটে জীবনের প্রথম রান্না করি। গরুর মাংস বরাবরই আমার পছন্দ। ফলে এই রান্নাটা আগে শিখেছি। আমার বাবা-মা দুজনেই খুব ভালো রাঁধতেন। মায়ের চেয়ে বাবার রান্নার হাত ভালো ছিল। কথাটা এ কারণেই বলা, প্রথম শ্বশুড়বাড়ি গিয়েও আমাকে রাঁধতে হয়েছিল। 

মোশাররফ করিমের পরিবার অনেক বড়। ওরা দশ ভাই-বোন। বোনদের বাড়ির আশেপাশের গ্রামে বিয়ে হয়েছে। ফলে যখন ওদের বাড়িতে ঈদের ছুটিতে যেতাম হাট বসে যেত। বিশাল আয়োজন! অনেক মানুষের রান্না একসঙ্গে হতো। সবাই একসঙ্গে খেতে বসতাম। খুব উপভোগ করেছি!

ছোটবেলা আমার সব আবদার ছিল বড় চাচার কাছে। বাবাকে ভয় পেতাম! তিনিও ছেলে-মেয়েদের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রাখতেন। ঈদুল আজহায় গ্রামে গিয়েই বড় চাচার সঙ্গে মার্কেটে চলে যেতাম। দোকানিকে চাচা বলতেন— ও যা যা চায় দাও। তখন জামাকাপড় ছাড়াও প্রয়োজনী-অপ্রয়োজনীয় অনেক কিছু নিয়ে আসতাম। বাড়ি আসার পর আম্মা বকতেন। ঈদে অন্যরকম এক আনন্দ ছিল!

এখন ঈদে নিজের জন্য খুব কমই কিছু কেনা হয়। সব সময় চেষ্টা করি পরিবারের মুরুব্বি, ছোটদের জন্য আগে কেনাকাটা করতে। পাশাপাশি মোশাররফের জন্যও কিনতে হয়। কিন্তু এবার কিছুই হলো না। এর কারণ করোনা। সত্যি বলতে, এই অবস্থায় কারো মন ভালো থাকার কথা নয়। স্বেচ্ছা গৃহবন্দি। আমার কাছে মনে হয়েছে, অনেক কিছুই আমরা খামাখা দৌড়ানোর জন্য করি। করোনা শিখিয়েছে অফিসে না গিয়েও অফিসের কাজ করা যায়। অনেক ছোট ছোট চাহিদা এড়িয়ে চলা যায়। স্বল্প আয়ে জীবনযাপনের প্রবণতা আমাদের বাবা-মা’র জেনারেশনের মধ্যে ছিল। কিন্তু আমরা সেটা পারি না। প্রযুক্তি এবং পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থার কারণে এটা হয়েছে। আগে এগুলোকে  জীবনের অংশ ভেবেছি। কিন্তু সেটা ভুল। 

বেঁচে থাকার জন্য খুব বেশি কিছু প্রয়োজন নেই। আমার মনে হয়, মানুষের সঙ্গে মানুষের যে বিশ্বাসের সম্পর্ক সেটা খুব প্রয়োজন। বিশ্বাস, ভালোবাসা মানুষের আত্মা সতেজ রাখে।

মাঝে মাঝে মনে হয়, ঘুম থেকে উঠে যদি শুনতাম—করোনামুক্ত বিশ্ব, তাহলে এক ছুটে বান্দরবান চলে যেতাম। পাহাড়-অরণ্যের একেবারে ভেতরে যেখানে পায়ে হেঁটে যেতে হয়, যেসব জায়গায় আগে যাওয়া হয়নি, সেখানে চলে যেতাম।

অনুলিখন: আমিনুল ইসলাম শান্ত

ঢাকা/তারা

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়