RisingBD Online Bangla News Portal

ঢাকা     মঙ্গলবার   ২৭ অক্টোবর ২০২০ ||  কার্তিক ১২ ১৪২৭ ||  ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

স্বল্প পুঁজিতে তিন উদ্যোক্তার পথচলা 

খুরশিদ জামান কাকন || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৬:২৮, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২০   আপডেট: ১৬:৩০, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২০
স্বল্প পুঁজিতে তিন উদ্যোক্তার পথচলা 

তারা সবাই শিক্ষার্থী। কেউ মেডিকেলের, কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ের আর কেউবা এখনও উচ্চমাধ্যমিকের গণ্ডি পেরোয়নি। এই করোনার আগ পর্যন্ত তারা শুধু পড়াশোনাতেই মগ্ন ছিলেন। তবে পড়ার পাশাপাশি দীর্ঘ দিন ধরেই তাদের অন্য কিছু করার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু সময়-সুযোগের অভাবে নিজেদের ইচ্ছা পূরণ করা সম্ভব হয়নি।

দেশের করোনা পরিস্থিতি অস্বাভাবিক হওয়ায় দীর্ঘ দিন ধরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ। সবাই এখন ঘরবন্দি সময় কাটাচ্ছেন। আগের মতো ক্লাস নেই, নেই পরীক্ষার অতিরিক্ত চাপ। হাতে এখন অফুরন্ত সময়। তারা এটাকেই সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে বেছে নিয়েছেন। নিজে কিছু করে স্বাবলম্বী হওয়ার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছেন। এ চ্যালেঞ্জে জয়ী সৈয়দপুরের কিছু অদম্য শিক্ষার্থীর গল্প নিয়ে আজকের এই আয়োজন।

নীলফামারীর সৈয়দপুর উপজেলার শিক্ষার্থীদের মধ্যে সুমি আক্তার লাবনী, আসিফ নেওয়াজ ও খন্দকার আবিদা সুলতানা এখন ভিন্ন ভিন্ন ক্ষেত্রে অনেকটাই সফল ও স্বার্থক উদ্যোক্তা। ধীরে ধীরে তাদের ব্যবসার প্রসার হচ্ছে। এলাকাতেও পরিচিতি বাড়ছে। খণ্ডকালীন সময়ের জন্য ব্যবসা শুরু করা এই উদ্যোক্তরা এখন দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনা সাজাচ্ছেন। পড়াশোনার পাশাপাশি নিজে থেকে উদ্যোমী হয়ে অর্থ উপার্জনের বিকল্প পথ খুঁজে নিচ্ছেন।

সৈয়দপুর সরকারি কারিগরি কলেজের ছাত্রী খন্দকার আবিদা সুলতানা। এখনও উচ্চমাধ্যমিকের গণ্ডি পেরোয়নি। এইচএসসি পরীক্ষার্থী আবিদার অন্য সহপাঠীরা যখন করোনার কারণে পরীক্ষা নিয়ে চরম অনিশ্চিয়তায় দিন কাটাচ্ছে, তখন পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়ার পাশাপাশি ভার্চুয়াল জগতের পরিচিতিকে কাজে লাগিয়ে অনলাইনে বিজনেস চালু করেছে আবিদা। 

প্রথমত পাহাড়ি অঞ্চলের জুম শাড়ি দিয়ে যাত্রা শুরু করা তার ‘শখের বাড়ি’ নামক প্রতিষ্ঠান থেকে এখন থ্রি-পিস ও মেয়েদের বিভিন্ন প্রসাধনী বিক্রি হচ্ছে। অল্প দিনে ব্যাপক সাড়া পাওয়া তার এই বিজনেস সৈয়দপুরের ক্রেতাদের আস্থা অর্জন করেছে। দেশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক ও এইচএসসি পরীক্ষা শেষ হলে আরও বৃহৎ পরিসরে শখের বাড়ির হাল ধরার পরিকল্পনা আছে সৈয়দপুরের খুদে এই নারী উদ্যোক্তার।

দিনাজপুর মেডিকেল কলেজের পঞ্চম বর্ষের মেধাবী ছাত্রী সুমি আক্তার লাবনী। বাড়ি সৈয়দপুরের সাহেবপাড়ায়। পড়াশোনার ব্যস্ত সূচির ফাঁকে টুকটাক টিউশন করাতেন। নিজের হাত খরচ নিজেই যোগাতেন। চলমান এই করোনা দুর্যোগে ঘরবন্দি সময়ে ভিন্নধর্মী কিছু করার প্রত্যয়ে তিনি ‘লিচু বাগান’ নামে একটি প্রজেক্ট গ্রহণ করেন। তার এই প্রজেক্টের আওতায় অনলাইনের মাধ্যমে দিনাজপুরের বিখ্যাত লিচু বিক্রি শুরু করেন। বাগান থেকে লিচু কেনা থেকে ডেলিভারি পর্যন্ত সম্পূর্ণ কাজটি তিনি একাই তদারকি করেন। 

প্রথমে স্বল্প পরিসরে শুরু করলেও পরবর্তী সময়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে গ্রাহকদের লিচুর চাহিদা মেটাতে তার ব্যবসার প্রসার ঘটে। লিচুর মৌসুমে সৈয়দপুরের উদীয়মান এই নারী উদ্দ্যোক্তা একাই প্রায় চারটি বাগানের লিচু বিক্রি করতে সক্ষম হয়েছেন। শুধু এতেই শেষ নয়, লিচুর মৌসুম শেষ হওয়ামাত্রই অনলাইনে তিনি আম বিক্রি শুরু করেন। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে কুরিয়ারের মাধ্যমে ক্রেতাদের কাছে সুস্বাদু আম বিক্রি করতে সক্ষম হন। এতেও তিনি ভালো লাভ করেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে আম-লিচুর আগামী মৌসুমে তার ক্ষুদ্র পুঁজির এই ব্যবসা ধরে রাখতে চান।

শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র আসিফ নেওয়াজ। বিবিএ ইন এগ্রিবিজনেস নিয়ে পড়াশোনা করা আসিফের বাড়ি সৈয়দপুরের নয়াটোলায়। ক্যাম্পাসে থাকাকালীন পড়াশোনার পাশাপাশি বিভিন্ন কোচিংয়ে শিক্ষকতার সঙ্গে জড়ান। কিন্তু করোনার কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হলে বাড়ি চলে আসেন। বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে কিছু করার চিন্তা-ভাবনা করেন। এরই ফলে অনলাইনে ‘অর্গানিক বাজার’ নামে একটি ওয়েবসাইট খুলেন। 

এ বাজারের আওতায়  প্রাকৃতিক উৎস থেকে সংগৃহীত মধু, খাঁটি সরিষার তেল, বাড়িতে বানানো ঘি, নারিকেল তেলসহ বিভিন্ন উপকরণসামগ্রী বিক্রি শুরু করেন। গ্রাহকদের বিনামূল্যে হোম ডেলিভারির সেবা দিতে শুরু করেন। মাত্র পাঁচ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে যাত্রা শুরু করা তার অর্গানিক বাজার এখন আকাশচুম্বী স্বপ্ন দেখাচ্ছে। তাইতো ব্যবসার আরও প্রসারের জন্য সৈয়দপুরের তরুণ এ শিক্ষার্থী এখন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রী উৎপাদনে জোর দিয়েছেন। ফলে পড়াশোনার পাশাপাশি ব্যবসাটাকেও চলমান রাখার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন।

চলমান সময়টাতে ঘরে বসেই সৈয়দপুরের সুমি, আসিফ ও আবিদারা নতুন কিছু করতে চেয়েছিলেন। নিজের পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছিলেন। ফলে তারা আজ খুদে উদ্যোক্তা হিসেবে সৈয়দপুরে অনেকটাই সফল। তবে তাদের এই পথ পাড়ি দিতে অনেক প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হয়েছে। 

এ কাজ করতে গিয়ে অনেকের অনেক কথা শুনতে হয়েছে। বিদ্রুপের শিকার হতে হয়েছে। এরপরও তারা দমে যাননি। ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে থেমে থাকেননি। সবসময় ধৈর্য, সাহস ও মনোবল চাঙ্গা রেখে নিজ লক্ষ্যে এগিয়ে গেছেন। পাছে লোকের কটু কথা ঝেড়ে ফেলে উদ্যোক্তা হিসেবে সাফল্যের দিকে ছুটে চলেছেন।

লেখক: শিক্ষার্থী, সরকারি তিতুমীর কলেজ। 

ঢাকা/মাহি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়