RisingBD Online Bangla News Portal

ঢাকা     বুধবার   ২০ জানুয়ারি ২০২১ ||  মাঘ ৬ ১৪২৭ ||  ০৪ জমাদিউস সানি ১৪৪২

কাউকে অনুকরণ করে উদ্যোক্তা নয় ফারাহ্ দিবা

মিফতাউল জান্নাতি সিনথিয়া || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৬:২২, ৩০ নভেম্বর ২০২০   আপডেট: ০১:২৪, ১ ডিসেম্বর ২০২০
কাউকে অনুকরণ করে উদ্যোক্তা নয় ফারাহ্ দিবা

ফারাহ্ দিবা। জন্মগতভাবে যশোরের মেয়ে তিনি। ব্যবসায়ী বাবা ও শিক্ষিকা মায়ের প্রথম সন্তান তিনি। মাস্টার্স প্রিলিমিনারি শেষ করার পর শিক্ষা জীবনের সমাপ্তি ঘটে তার। জীবনের দীর্ঘ সংগ্রামের পথ পাড়ি দিয়ে সেই ঘাটতিকে কিছুটা হলেও পূরণ করতে পেরেছেন উদ্যোক্তা হয়ে। বর্তমানে অনলাইন ফ্যাশন হাউজ ‘নিথান’-এর প্রতিষ্ঠাতা দিবা।

পুরোদস্তুর গৃহিণী থেকে পরিবারের সবার বিপরীতে এসে কাজ শুরু করেন একটা মিউজিক ম্যাগাজিনে রিপোর্টার হিসেবে। চার বছর চাকরির পর ম্যানেজিং এডিটর হয়ে চাকরি ছেড়ে দেন তিনি। ২০০৯ সালে চাকরির পাশাপাশি শুধু সংসার চালানোর চিন্তায় যশোরের বিখ্যাত হাতের কাজের পোশাকের ব্যবসা শুরু করেন দিবা। পরবর্তী সময়ে বাড়িতে ডাকাতি হওয়ায় পুঁজি হারান তিনি। ফলে ব্যবসা বন্ধ হয়ে যায় তার।

২০১০ এর ফেব্রুয়ারি মাসে জাতীয় একটি দৈনিক পত্রিকায় চাকরি শুরু করেন তিনি। ফিচার বিভাগে যোগ দেন একজন সাধারণ সহযোগী হিসেবে। একাধারে ‘বিনোদন, লাইফস্টাইল ও জয়িতা’ বিভাগে ফিচার রাইটারও ছিলেন দিবা। বছরের শেষে তার সহকর্মী ও বন্ধুদের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে শুরু করেন অ্যাড ফার্ম ‘স্কেচ কমিউনিকেশন্স’। সমস্ত মনোযোগ ব্যবসায় দেওয়ার কারণে চাকরিটি ছাড়তে হয়েছে তাকে।

দিবা বলেন, “অত্যন্ত বৈচিত্র্যময় কর্মজীবন আমার। রাতারাতি কোনো মহান ভাবনা নিয়ে আমি উদ্যোক্তা জীবন শুরু করিনি। জীবন ও জীবিকার তাগিদে, সন্তান পালনের তীব্র উৎকণ্ঠা থেকে আমার কর্মজীবন শুরু হয়। 

জীবনে কিছু সময় আসে যখন খুব শক্ত সিদ্ধান্ত নিতে হয়। সেই সিদ্ধান্ত আমি নিয়েছিলাম ‘নিথান’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। অনেক বাঁধা পার করে নিথানকে আলোর মুখ দেখতে হয়েছে। আবারও রিসেলিং দিয়েই শুরু করি। কিন্তু পণ্য মজুদ করেই বুঝতে পারি যে, এই কাজটা আমার জন্য নয়। অন্যের করা কাজ আমাকে সন্তুষ্ট করতে পারছিল না। মজুদকৃত পণ্য  ওভাবেই ঘরে পড়ে থাকে। 

দু’তিন মাস আমি শুধু ভেবেছি আমার কী করা উচিত। ধীরে ধীরে আমার ব্যবসার পরিকল্পনাকে আমি শক্ত পোক্ত করেছি। ডিজাইন করেছি, ফেব্রিক নির্বাচন করেছি, সোর্সিং করেছি, ফাইন্যান্স রেডি করেছি তারপর প্রোডাকশনে গিয়েছি। শুরু হলো নিজের সৃষ্টিশীলতার সঙ্গে উদ্যোক্তা হিসেবে আমার পথচলা।

যশোরের হাতের কাজ বলতে প্রধানত পোশাক আর নকশী কাঁথাকেই বোঝায়। আমিও এই দুইটা দিয়েই আমার ব্যবসা শুরু করি। প্রায় এক বছর পর বর্তমানে নিথানের উৎপাদিত পণ্যে যুক্ত হয়েছে বেশকিছু নতুন পণ্য। যেমন, ডিজাইন করা মাস্ক, পার্টি ক্লাচ (মেয়েদের ব্যাগ), ফিমেল ফুট ওয়্যার (মেয়েদের জুতো) ও আরও নানারকম ফ্যাশনের জিনিসপত্র। অবশ্যই সব পণ্যতে থাকছে হাতের কাজের ছোঁয়া। নিথান এখন শুধু পোশাকের ব্র্যান্ড নয় বরং একটা সম্পূর্ণ লাইফস্টাইল ব্র্যান্ড হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে যাচ্ছে।’’

নিজেস্ব ডিজাইনের পণ্য নিয়ে বলতে গিয়ে দিবা বলেন, “দুটো জিনিসের কম্বিনেশন ছিল আমার উদ্যোগ শুরুর ভাবনা। প্রথমটা ছিল, আমাকে কিছু করতে হবে। দ্বিতীয়ত, অন্যের কাজ, অন্যের ভাবনা, অন্যের সৃষ্টিশীলতার উপর ভর করে চলা আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না। একাজে কোনো আত্মতৃপ্তি পেতাম না আমি। যেহেতু সুই-সুতা আমাকে খুব টানে, কাজটা আমি বুঝি, তাই এটাকেই আমার উদ্যোগ হিসেবে গ্রহণ করেছি। 

যশোরের হাতের কাজের পোশাক বলতে বোঝায় কিছু কমন ডিজাইনের ঢালাও কাজের আনস্টিচড কামিজের কাপড়। আমি এই প্রথাকে ভাঙতে চেয়েছি। যশোরের কাজকে নতুন আঙ্গিকে দেশের মানুষকে চেনাতে চেয়েছি। হাতের কাজের ইউনিক ও ফ্যাশনেবল কুর্তি, টপস বা কামিজের প্রাপ্তি স্থান বলতে মানুষ কেবল আড়ং বা এমনই কিছু প্রতিষ্ঠিত পোশাকের ব্র্যান্ডকেই বুঝতো। আমি এই চিত্রকেও বদলাতে চেয়েছি। সঠিক মূল্যে খুব সহজে ক্রেতার কাছে সম্পূর্ণ রেডি ফ্যাশনেবল হাতের কাজের পোশাক ও সব ধরনের পণ্য পৌঁছে দিতে চাই।

শুরু থেকেই শতভাগ অনলাইন কেন্দ্রিক আমার ব্যবসা। যখন আমার প্রতিষ্ঠান শুরু করি, উৎপাদন পুরোদমে চলছে, ঠিক তখনই পুরো পৃথিবী কোভিড আক্রান্ত হয়ে থমকে যায়। হুমকির মুখে পড়ে আমার উদ্যোগ। ভীষণ হতাশায় ডুবে যাচ্ছিলাম। সেই সময় দেখা পাই (উইমেন অ্যান্ড ই-কমার্স) ফোরাম উই-এর। আমি ছিলাম সম্পূর্ণ গতানুগতিক একটা মানুষ। উই আমাকে এই নতুন জগতের সঙ্গে পরিচয় ঘটায়। 

সারা পৃথিবীতে যখন সব ধরনের ব্যবসা বন্ধ হওয়ার পথে, সেই সময় আমরা মেয়েরা উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেদের পরিচিতি তৈরি করছি। ব্যবসার ভিত শক্ত করছি। নানা রকম সরকারি, বেসরকারি, আন্তর্জাতিক ট্রেইনিংয়ের মাধ্যমে আমরা নিজেদের দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পেয়েছি। আর এগুলো সব হয়েছে উইর হাত ধরে। প্রাপ্তির ঝুলি দিন দিন পরিপূর্ণ হয়ে উঠছে।’’

দিবা আরও বলেন, ‘‘বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কোনো মেয়ে যদি ক্যারিয়ার তৈরির চেষ্টা করে, সে কোনো বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পরবে না এটা আশা করা ভুল। এখনও টেইলরিংয়ে, ফেব্রিক সোর্সিংয়ের ক্ষেত্রে বর্ণবাদের শিকার হতে হয়। যদিও দেশ বদলাচ্ছে। আশা করা যায় আমাদের দেশ খুব অল্প দিনেই নারী উদ্যোক্তাবান্ধব হয়ে উঠবে। উদ্যোক্তা হওয়ার তিনটা মূল মন্ত্র- ধৈর্য্য, পরিশ্রম, সৃষ্টিশীলতা। যে কাজের প্রতি সত্যিকার ভালোবাসা রয়েছে, কেবল সেই কাজকেই উদ্যোগ হিসেবে গ্রহণ করা উচিৎ। সেই পথ যদি সর্বোচ্চ কঠিনও হয়, তবুও। প্রয়োজনে ধীরে আগাতে হবে। কিন্তু অন্যকে অনুকরণ করে শুরু করা উদ্যোগ সফল হয় না। ব্যতিক্রম থাকতেই পারে।

অনলাইন কেনাকাটায় এখনও একটা বড় অংশ ক্রেতার অনাস্থা রয়েছে। অথচ বর্তমান পরিস্থিতি বলছে চাকরি থেকে শুরু করে কেনাকাটা সব হবে অনলাইন নির্ভর। দেশের এই অনলাইন বাজারের আস্থা অর্জন করতে চায় ‘নিথান’। দেশের বাজার জয় করে উন্মুক্ত বিশ্ব বাজারেও স্থান করে নিতে চায় নিথান। স্থানীয় ব্যবসায়ী থেকে এক্সপোর্টার হওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে আমার প্রতিষ্ঠান।’’

আট মাসের ব্যবসায় কোভিডের প্রকোপে কাজ বন্ধ ছিল প্রায় তিন মাস। তবু উইর সহযোগিতায় লাখ টাকা বিক্রি করেছেন তিনি। বর্তমানে ই-কমার্স শেখানোর জন্য রাজিব আহমেদের নিরলস পরিশ্রম উদ্যোক্তাদের পথচলা অনেক সহজ করে দিয়েছে। উইর প্রেসিডেন্ট নাসিমা আক্তার নিশা ও অ্যাডভাইজর রাজিব আহমেদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন দিবা। 

ঢাকা/মাহি

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়