Risingbd Online Bangla News Portal

ঢাকা     মঙ্গলবার   ২২ জুন ২০২১ ||  আষাঢ় ১০ ১৪২৮ ||  ১০ জিলক্বদ ১৪৪২

সরকারি চাকরি করেও উদ্যোক্তা রীপা

শিরীন সুলতানা অরুণা || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৬:৩৮, ৫ মে ২০২১  
সরকারি চাকরি করেও উদ্যোক্তা রীপা

রীপা চাকমা।  জন্ম ও বেড়ে ওঠা রাঙামাটি জেলার কাউখালি থানার ঘাগড়া গ্রামে। পড়াশোনা করেছেন চট্টগ্রামের রাউজানে।  স্বামীর চাকরির সুবাদে বর্তমানে নোয়াখালীর সোনাপুরেই তার বসবাস।

স্বামী-সংসার সামলিয়ে সরকারি চাকরির পাশাপাশি তিনি একজন ই-কমার্স উদ্যোক্তা। নিজেকে উদ্যোক্তা হিসেবে পরিচয় দিতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন রীপা। কারণ চাকরি করলেও উদ্যোগের কাজগুলো আনন্দের সঙ্গে উপভোগ করেন তিনি। তার ফেসবুক পেজের নাম ‘হবি ধবি ফ্যাশন অ্যান্ড জুয়েলারি’। হাতে তৈরি বিভিন্ন ধরনের মেটালের গয়না ও পার্বত্য অঞ্চলের পিনন শাড়ির মত পণ্য নিয়েই তার ব্যবসার শুরু।  রাইজিংবিডিতে রীপা জানিয়েছেন তার উদ্যোগের গল্প।  আর সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন রাইজিংবিডির কন্ট্রিবিউটর লেখক শিরীন সুলতানা অরুণা।

রাইজিংবিডি : ব্যবসার শুরুর দিকের গল্পটা যদি বলতেন।
রীপা চাকমা :
গতবছর করোনা মহামারী যখন প্রকট আকার ধারণ করে তখন সবকিছু বন্ধ হয়ে যায়। স্থবিরতা দেখা দেয় দেশের প্রতিটি খাতে। বাসায় বসে বসে অলস সময় কাটাতাম। টিভিতে রোজ মৃত্যুর মিছিল দেখতে দেখতে হাঁপিয়ে উঠেছিলাম। এই অলস সময়টাকে কাজে লাগিয়ে, কিছু একটা করার চিন্তাভাবনা সবসময়ই মাথায় ঘুরছিল। ঐ সময় আমার এক বান্ধবীর মাধ্যমে ব্যবসা কেন্দ্রিক গড়ে ওঠা ফেসবুক গ্রুপ উইর (উইমেন অ্যান্ড ই-কমার্স ফোরাম ) সন্ধান পাই। গ্রুপে যুক্ত হওয়ার পর যেন নিজেকে আবার নতুন করে আবিষ্কার করতে পারি। এখানে হাজারো হার না মানা মানুষের লেখা পড়ে অনুপ্রাণিত হই। অনেক আগের ফ্যাশন ডিজাইনার হওয়ার স্বপ্নটা আবার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। এরপর যুক্ত হই ব্যবসা ও আইটি নিয়ে পড়াশোনার গ্রুপ ডিএসবিতে (ডিজিটাল স্কিল ফর বাংলাদেশ)। সেখান থেকে টানা ১২০ দিন অ্যাক্টিভ থেকে পড়াশোনা করি। সেই সঙ্গে বিভিন্ন পোস্টে গঠনমূলক কমেন্ট করে নিজের পরিচিতি বাড়াই। এখান থেকেই বিজনেস ও আইটি বিষয়ে অনেক কিছু শিখে নিই, যা আমার পরবর্তীতে উদ্যোক্তা হওয়ার পথ সহজ করেছে। এরপর ধীরে ধীরে নিজের ব্যবসার কাজ শুরু করি। মহামারির পরিস্থিতিতেও আমি বিভিন্ন মার্কেট ও দোকান ঘুরে কাঁচামাল সংগ্রহ করি।

রাইজিংবিডি : কী কী পণ্য নিয়ে কাজ করছেন?
রীপা চাকমা :
মূলত আমি কাস্টমাইজড হ্যান্ডমেইড ট্রেডিশনাল কড়ি ও কয়েনের মালা নিয়েই কাজ শুরু করি। এর পাশাপাশি মেটালের গয়নাও তৈরি করি। তবে কিছুদিন হলো পাহাড়ি আদিবাসী নারীদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক নিয়েও কাজ করছি। পিনন ডিজাইনের আদলে তৈরি তাঁতের হাফ সিল্ক পিনন শাড়ি যুক্ত করেছি আমার পেজে।

রাইজিংবিডি : এমন পণ্য নিয়ে কাজ করার পরিকল্পনা কেন ছিল?
রীপা চাকমা :
ছোটবেলা থেকেই বিভিন্ন রকম হাতের কাজের প্রতি প্রচণ্ড ঝোঁক ছিল আমার। ফ্যাশন ডিজাইনার হওয়ার শখ ছিল। কিন্তু বিভিন্ন পারিবারিক জটিলতার কারণে তা হয়ে ওঠেনি। শখের বশেই পোশাকের সঙ্গে মিলিয়ে নিজের গয়না নিজেই বানাতাম।  বিভিন্ন পারিবারিক ও সামাজিক অনুষ্ঠানে নিজের বানানো গয়না পরেই যেতাম। সবাই খুব প্রশংসা করতো। হাতে বানানো গয়না বলে একটু আলাদা মনে হতো। তাছাড়া বারো মাসে তেরো পার্বণের দেশ আমাদের বাংলাদেশ। বিভিন্ন পারিবারিক ও সামাজিক অনুষ্ঠানে গয়নার প্রয়োজন হবেই। শুধু তাই নয়, সোনার দাম বেশি হওয়ায় বর্তমানে ফ্যাশন সচেতন প্রায় নারীই আর্টিফিশিয়াল গয়নার প্রতি ঝুঁকেছেন। এতে কম দামে যেমন ফ্যাশনেবল গয়না পাওয়া যায় তেমন চাহিদাও পূরণ হয়। সেই চিন্তাভাবনা থেকেই গয়না বানানোর কাজ শুরু করি।

রাইজিংবিডি : ব্যবসার শুরুটা কী অনলাইন কেন্দ্রিক না কী অন্য কোন উপায়ে?
রীপা চাকমা :
ব্যবসা বলতে, বছর দুয়েক আগে থেকেই আমার ছোটখাট একটা কাপড়ের দোকান আছে গ্রামের মফস্বলে। আমার অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষিকা মা এটা দেখাশোনায় সহযোগিতা করেন। এর সঙ্গে অনলাইনে দ্বিতীয় উদ্যোগ হিসেবে গয়না বানানোর কাজটাই বেছে নিয়েছি । 

রাইজিংবিডি : কাজ করতে গিয়ে কখনো বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন?
রীপা চাকমা :
কাজ করতে গিয়ে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রকম বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছি। আমি পাহাড়ি একজন নারী চট্টগ্রাম শহরে নিজেই পণ্য ডেলিভারি করি।  সরকারি চাকরিজীবী এবং স্বামী সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হওয়া সত্ত্বেও কেন আমি অনলাইনে কাপড়চোপড়, গয়নাগাটি বেচাকেনা করি, আমার টাকার কিসের অভাব, ইত্যাদি কটু কথা সরাসরিই শুনতে হয়।

রাইজিংবিডি :  উদ্যোক্তা জীবনের শুরু কতদিন এবং বিক্রি কেমন?
রীপা চাকমা :
মাত্র ছয় মাসের উদ্যোক্তা জীবন আমার। কাজ শুরুর ছয় মাস হলেও অর্ডার আসা শুরু করে চার মাসেরও বেশি সময় ধরে। তবে আমি খুশি যে খুব ভালো কাস্টমার ফিডব্যাক পেয়েছি কাজের স্বীকৃতি হিসেবে। এ পর্যন্ত যারা আমার কাস্টমার হয়েছেন তারা প্রায় সবাই আমার রিপিট কাস্টমার। অল্প সময়ে অনেকেই হয়তো লাখ টাকা বিক্রির স্বাদ পেয়েছেন। কিন্তু আমি কখনোই বিক্রির চিন্তা করিনি। আমি শুধুই জানার ও শেখার চেষ্টা করেছি। এরইমধ্যে যা বিক্রি হয়েছে তা আমার অতিরিক্ত বোনাস।

রাইজিংবিডি : উদ্যোক্তা জীবনে সফল হতে কাদের ভূমিকা বেশি ছিল?
রীপা চাকমা :
শুরু করেছি খুব বেশি দিন নয়। তাই নিজেকে সফল বলে দাবি করি না। আমার এখনো অনেক কিছু শেখার ও জানার আছে। তবে এটুকু পিচ্ছিল পথ পেরোতে আমার মা এবং স্বামীর ভূমিকা সবচেয়ে বেশি।

রাইজিংবিডি : নতুন উদ্যোক্তারা এই পেশায় আসতে চাইলে, তাদের জন্য কী পরামর্শ দিবেন?
রীপা চাকমা :
নতুন উদ্যোক্তা যারা এ পেশায় আসতে চায় তাদের সবাইকেই স্বাগত জানাবো। তবে কিছু পরামর্শ না দিলেই নয়। যেমন : আগে নিজেকে জানুন, মন কী চায় তা জানুন, কোন কাজটা আপনি করতে ভালোবাসেন সেই সম্পর্কে জানুন। সবকিছু জেনে বুঝে তারপর কাজে নামুন। আমার বান্ধবী অনলাইনে ব্যবসা করে অনেক টাকা আয় করছে, আমিও শুরু করবো, সেই মনমানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসুন। পরিশ্রম না করলে সফল হওয়া যায় না।

রাইজিংবিডি : ব্যবসা নিয়ে আপনার পরিকল্পনা কী?
রীপা চাকমা :
বর্তমান প্রেক্ষাপটে অনলাইন কেনাকাটা বা ব্যবসা অনেক জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে করোনাকালীন সময়ে। আমরা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা ভালো মানের পণ্য সরবরাহের মাধ্যমে যদি বিশ্বস্ততা অর্জন ও ভালো সার্ভিসের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারি, তবে অনেক দূর এগিয়ে যাওয়া সম্ভব। সরকারি চাকরির ধরাবাঁধা নিয়মের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে, মুক্ত বিহঙ্গের মতো ডানা মেলতে চাই আমার ভালোবাসার উদ্যোগ নিয়ে। 

রাইজিংবিডি : ধন্যবাদ আপনাকে।
রীপা চাকমা :
আপনাদেরকেও অসংখ্য ধন্যবাদ এবং কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি আমাকে সুযোগ দেওয়ার জন্য।

রাঙামাটি/সিনথিয়া

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়