ঢাকা, সোমবার, ১৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭, ০১ জুন ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের জন্য বইমেলাতে বই

জাহিদ সাদেক : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০২-২৮ ১:২৪:২২ পিএম     ||     আপডেট: ২০২০-০২-২৮ ১:৪০:৫৪ পিএম

তারা চর্মচক্ষু দিয়ে দেখেন না ঠিকই কিন্তু অন্তর চক্ষু দিয়ে দেখেন। দেখেন স্পর্শে আর অনুভবে। আমরা বলি দু’ চোখে বিশ্ব দেখো। সবার পক্ষে ঘুরে ঘুরে বিশ্ব দেখা অসম্ভব। তাহলে উপায় কী? উপায় হলো বই পড়া। কিন্তু যাদের চোখ নেই তারা কী তবে বঞ্চিত হবেন বই পড়া থেকে? বিশ্ব দেখা থেকে?

একুশে গ্রন্থমেলা প্রায় শেষ হতে চলল। মেলায় দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের বই পড়ার সুযোগ করে দিতে এগিয়ে এসেছে স্পর্শ ব্রেইল প্রকাশনী। তারা ব্রেইল পদ্ধতিতে বই প্রকাশ করেন। ব্রেইল পদ্ধতিতে পাতাজুড়ে ছয়টি বিন্দুর বিভিন্ন সংকেত থাকে। ঘর আকৃতির সংকেতগুলোয় হাত বুলিয়েই অক্ষরগুলো বোঝা যায়। সেই বিন্দু স্পর্শ করেই দৃষ্টি প্রতিবন্ধীরা পড়ে যান পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা। এই দৃশ্য মুগ্ধ নয়নে দেখছেন মেলায় আসা দর্শনার্থীরা।

মেলাপ্রঙ্গণ ঘুরে দেখা যায়, বাংলা একডেমি অংশে স্পর্শ ব্রেইল প্রকাশনীতে দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের বই পড়ার দৃশ্য। কেউ বই দেখছেন, কেউ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের পড়া শুনছেন, আবার কেউ কৌতূহলী মন নিয়ে ব্রেইল পদ্ধতি সম্পর্ক জানতে চাইছেন। প্রশ্নগুলোর জবাব দিচ্ছেন প্রকাশক ও লেখিকা নাজিয়া জাবীনসহ স্পর্শ ব্রেইল প্রকাশনীর স্টলের সহযোগীরা। কথা বলে জানা গেল বই বিক্রি নয়, দৃষ্টি প্রতিবন্ধীরা যেন পড়তে পারে, সে তথ্য জানাতেই মেলায় স্টল নিয়েছেন স্পর্শ ব্রেইল প্রকাশনী। এখানে যেমন জাতীয় জাদুঘর সম্পর্কে জানা যাবে, তেমনি পাওয়া যাবে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস। এ বছর বইমেলায় ১৪টি বই ব্রেইল আকারে প্রকাশ করা হয়েছে। ২০১১ সাল থেকে এই প্রকাশনা সংস্থাটি ব্রেইল আকারে বই প্রকাশ করে আসছে।

স্টলের দায়িত্বে থাকা মো. শাহরিয়ার কবির তৌফিক বলেন, ‘স্পর্শ ব্রেইল প্রকাশনা দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের ‘দৃষ্টিজয়ী’ বলে। কারণ একমাত্র স্পর্শ ব্রেইল প্রকাশনা তাদের পড়াশোনার জন্য বই প্রকাশ করে। বই প্রকাশ করার পাশাপাশি মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরিতেও আমরা কাজ করি।’

স্টলে দৃষ্টিজয়ী শিক্ষার্থীদের বই দিয়ে সহযোগিতা করতে দেখা যায় লিজা নামের এক শিক্ষার্থীকে। তিনি ইডেন মহিলা কলেজের বাংলা বিভাগের ৩য় বর্ষের শিক্ষার্থী। লিজা বলেন, তারা ৮১টি ব্রেইল পদ্ধতির বই প্রকাশ করেছে। তবে তাদের একার পক্ষে সব কিছু করা সম্ভব নয়। এ প্রকাশনার মতো দেশে যেসব সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা আছে তারা যদি ব্রেইল বই প্রকাশে এগিয়ে আসে তাদের দৃষ্টিজয়ীদের সত্যিকার অর্থে আলোকিত করা সম্ভব। একটি অন্তর্ভূক্তিমূলক সমাজ গঠনে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।

চার বছর বয়সে দৃষ্টিশক্তি হারান সারওয়াত হোসেন বুশরা। বর্তমানে তিনি স্পর্শ ব্রেইল বইয়ের সহযোগিতায় রাজধানীর সিদ্ধেশ্বরী গার্লস কলেজে এইচএসসি প্রথম বর্ষে পড়ালেখা করছেন। বুশরা  বলেন, স্পর্শ ব্রেইল আমাদের বিনামূল্যে বই দেয়। ক্লাসরুমের বাইরে ব্রেইলে প্রকাশিত বইগুলোর মাধ্যমে আমরা দেশ, দেশের মানুষ ও মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে জানতে পারি। ছড়া, কবিতা, গল্প, উপন্যাসসহ অন্যান্য বই পড়ার জন্য অন্যের সহযোগিতা নিতে হতো। কিন্তু ব্রেইল পদ্ধতির বই প্রকাশিত হবার কারণে নিজেই পড়তে পারি। অন্যের সাহায্য লাগে না।

টার্কিশ হোপ স্কুলের শিক্ষিকা সামিরা সাদিক বলেন, মেলায় ব্রেইল পদ্ধতির বইগুলো বিশেষ করে দৃষ্টিজয়ীদের জন্যই তৈরি। তবে এ বইগুলো তৈরিতে খরচ অনেক বেশি হয়। তবুও আমরা নিজ উদ্যোগে এগিয়ে যাচ্ছি বন্ধু-বান্ধবের সহযোগিতা নিয়ে। স্পর্শ ব্রেইলের প্রধান উদ্যোক্তা নাজিয়া জাবীন বলেন, বইমেলায় শুধু ঢাকা নয়, ঢাকার বাইরে থেকেও অনেক দৃষ্টিজয়ীরা আসছেন ব্রেইলে প্রকাশিত বই দেখা ও পড়ার জন্য। এমনকি এ স্টলে চাইলে দৃষ্টিজয়ীরা কাজও করতে পারেন। এখানে ওরা একে অপরের সঙ্গে পরিচিতও হতে পারবে। সব বই বিনামূল্যে দৃষ্টিজয়ীদের দিচ্ছি। ব্রেইল পদ্ধতিতে বই প্রকাশের ক্ষেত্রে প্রতি পৃষ্ঠায় আমাদের খরচ হয় দশ টাকা।

বই প্রকাশের ক্ষেত্রে নানা প্রতিবন্ধকতা তুলে ধরে নাজিয়া আরো বলেন, পৃষ্ঠপোষকতা পেলে স্পর্শ ব্রেইল অনেক দূর এগিয়ে যাবে। এ বছর আমরা ইংরেজিতেও বই প্রকাশ করেছি। আগামীতে আমরা আরও বড় পরিসরে কাজ করতে চাই।

 

ঢাকা/তারা