ঢাকা, শুক্রবার, ১ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ১৫ নভেম্বর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

এক অরণ্য মানবের অনন্য দৃষ্টান্ত

শাহিদুল ইসলাম : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-১১-০৯ ১:১৭:৪৬ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-১১-০৯ ১:১৭:৪৬ পিএম

চারদিকে যতদূর চোখ যায় শুষ্ক বালুময় প্রান্তর। সেই ঊষর প্রান্তর কোনো এক জাদুর কাঠির স্পর্শে একদিন পরিণত হলো এক টুকরো সবুজে। কালের আবর্তনে সেই ছোট্ট সবুজ জায়গাটিতে গড়ে উঠল বিশাল বন।

রূপকথার গল্পের মতো শোনালেও এটি বাস্তব ঘটনা। তবে এই রূপকথাকে বাস্তবে রূপান্তর করতে কলকাঠি নেড়েছেন যাদব পায়েঙ নামে অতি সাধারণ একজন। তার একক প্রচেষ্টায় একটি আস্ত বন গড়ে উঠেছে। তিনি পরিচিতি পেয়েছেন ‘অরণ্য মানব’ নামে।

যাদবের জন্ম ১৯৬৩ সালে আসামের জোরহাট জেলার মাজুলি দ্বীপের প্রান্তিক মেইসিং উপজাতি সম্প্রদায়ের এক কৃষক পরিবারে। মাজুলি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় নদীসৃষ্ট দ্বীপ। বাবা ছিলেন মহিষ পালক। একদিন মহিষ চরানো শেষে ব্রহ্মপুত্র নদের চর ধরে গ্রামে ফিরছিলেন যাদব। হঠাৎ খেয়াল করলেন চরে অনেক মৃত সাপ পড়ে আছে। সম্ভবত সাপগুলো বন্যার পানিতে ভেসে নদীর পাড়ে উঠে এসেছে। পানি শুকিয়ে যাওয়ায় বালিতে আটকে মারা গেছে। গাছের ছায়া না থাকায় সূর্যের প্রখর তাপে উত্তপ্ত বালি এই মৃত্যুর কারণ।

যাদব তখন ষোল বছরের কিশোর। এই ঘটনা তার কিশোর মনে গভীর রেখাপাত করে। তিনি প্রতিদিন একটি গাছ লাগানো শুরু করলেন মাজুলি চরে। এরই মধ্যে চরে ভাঙন দেখা দেয়। ভাঙন ঠেকাতে এগিয়ে আসে আসাম বন বিভাগ। তারা ১৯৮০ সালে মাজুলির ভাঙন রোধে ২০০ হেক্টর জমিতে বন সৃজন প্রকল্প গ্রহণ করে। বন বিভাগের এই প্রকল্পে উৎসাহ পায় যাদব। কিন্তু তিন বছরের মাথায় বন বিভাগ এই প্রকল্প থামিয়ে দেয়। তবে বন বিভাগ থেমে গেলেও থেমে যায়নি যাদব। ১৯৭৯ সাল থেকে শুরু করে গত চারদশক ধরে তিনি মাজুলি চরে একের পর এক গাছ লাগিয়েছেন। মাজুলিকে পরিণত করেছেন ৫৫০ হেক্টর সবুজ অরণ্যে। তার একক প্রচেষ্টায় এই অরণ্য গড়ে উঠেছে, যা আজ বিভিন্ন প্রজাতির বন্যপ্রাণীর আশ্রয়স্থল।

আসাম বন বিভাগের হিসাব মতে এই বনে হাতি, রয়েল বেঙ্গল টাইগার, ইন্ডিয়ান গন্ডার, শেয়াল, বিভিন্ন প্রজাতির পাখিসহ অসংখ্য সরীসৃপ রয়েছে। এছাড়া বাঁশ, শিমুল, শিশু, ডিমার, ভেলকো, পাম, গামারি, কৃষ্ণচূড়া, সেগুনসহ নানা জাতের গাছ লাগিয়ে যাদব এই বনে সৃষ্টি করেছেন উদ্ভিদ বৈচিত্র।

সদিচ্ছার পাশাপাশি লক্ষ্যে অবিচল থাকলে একজন সাধারণ মানুষও যে অসাধ্যকে সাধন করতে পারেন, যাদব পায়েঙ তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তবে তার এই মহতী প্রচেষ্টা ২০০৮ সাল পর্যন্ত ভারত সরকারের অগোচরেই ছিল। স্থানীয় পত্র-পত্রিকায় লেখালেখি এবং তাকে নিয়ে জিতু কিলিতার বানানো তথ্যচিত্র প্রচারের পর সরকারের দৃষ্টিগোচর হয়। এরপর একের পর এক পুরস্কারে ভূষিত হতে থাকেন যাদব। ২০১৩ সালে জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয় তাকে ‘ফরেস্ট ম্যান অব ইন্ডিয়া’ বা ‘অরণ্য মানব’ উপাধি দেন। ২০১৪ সালে তাকে নিয়ে বানানো তথ্যচিত্র কান চলচ্চিত্র উৎসবে পুরস্কৃত হয়। ২০১৫ সালে তিনি ভারত সরকার কর্তৃক পদ্মশ্রী পদকে ভূষিত হন। এছাড়া মাজুলি রিজার্ভ ফরেস্টের নাম বদলে যাদবের ডাকনামের সাথে মিলিয়ে ‘মলাই রিজার্ভ ফরেস্ট’ রাখা হয়। 

 

ঢাকা/মারুফ/তারা

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন