ঢাকা, শুক্রবার, ২৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

আত্মহত্যার হাতছানি দিয়ে ডাকে যে বন

শাহিদুল ইসলাম : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-১১-২৮ ৮:০২:৪৯ এএম     ||     আপডেট: ২০১৯-১২-০৭ ৬:১৮:৪৯ পিএম

প্রাণ ও প্রকৃতি ধারণ করা দিগন্তবিস্তৃত এক একটি সবুজ বনভূমি শত-সহস্র বছর মানব সমাজের রসদ জোগায়। যে কারণে পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তে আজ রব উঠেছে- সবুজ বাঁচাও, মানুষ বাঁচবে।

এর উল্টোটাও কিন্তু আছে। হ্যাঁ ঠিকই পড়েছেন! পৃথিবীতে এমন একটি বন আছে যা মানুষকে বাঁচায় না বরং মেরে ফেলে। বিশ্বব্যাপী এটি ‘আত্মহত্যার বন’ হিসেবে পরিচিত।

বনটির অবস্থান জাপানের হনশু দ্বীপের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ ফুজি পর্বতমালার পাদদেশে। আয়তন ৩০ বর্গ কিলোমিটারেরও বেশি। জাপানি ভাষায় বনটির নাম আওকিগাহারা। অর্থ ‘সি অফ ট্রিজ’ বা গাছের সমুদ্র। কেউ কেউ একে ‘শয়তানের বন’ বলেও ডাকেন।

ষাটের দশক থেকে এই বনে আত্মহত্যাকারীর হিসাব রাখা শুরু হয়। এরপর বিশ শতক পর্যন্ত প্রায় সাড়ে পাঁচশ লোকের মৃত দেহ উদ্ধার করা হয়েছে এই বন থেকে। একুশ শতকে এসে বনে আত্মহত্যার সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে। তবে সবচেয়ে বেশি মৃতদেহ পাওয়া যায় ২০০৩ সালে ১০৫টি। 

এরপর থেকে জাপানি পুলিশ আত্মহত্যাকারীর প্রকৃত সংখ্যা জনসম্মুখে প্রকাশ করা বন্ধ করে দেয়। ফলে বর্তমানে ঠিক কতজন এই বনে আত্মহত্যা করেছেন তার সঠিক পরিসংখ্যান জানা যায়নি। তবে সংখ্যা যাই হোক, আত্মহত্যা আগের থেকে বেড়েছে বৈ কমেনি।

কিন্তু কেন? কী কারণে এই বনে মানুষ আত্মহত্যা করতে যায়? এই কেনোর উত্তর খুঁজতে অনেক গবেষক আদা-জল খেয়ে নেমেছেন। বছরের পর বছর গবেষণা করছেন। নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে আজও সন্তোষজনক কোনো ব্যাখ্যা মেলেনি- কিসের তাড়নায়, কার হাতছানিতে এই বনে গিয়ে জীবনের ইতি টানার সাধ জাগে মানুষের। তবে গবেষণায় আত্মহত্যার সম্ভাব্য কিছু কারণ বেরিয়ে এসেছে। তার মধ্যে অন্যতম হলো ‘কুরোয় কাইজু’ নামক একটি উপন্যাস। এটি ১৯৬০ সালে প্রকাশিত হয়। জাপানি লেখক সেইচো মাতসুমোতোর লেখা এই উপন্যাসে এক ব্যর্থ প্রেমিক যুগলের কাহিনী বর্ণনা করা হয়। উপন্যাসের শেষাংশে নায়িকা এই বনে গিয়ে গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করে। উপন্যাসটি সেই সময় জাপানি সংস্কৃতিতে বিশেষ করে ব্যর্থ প্রেমিক-প্রেমিকাদের জীবনে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল। ওই সময় প্রেমে ব্যর্থ একাধিক যুগলের লাশ আওকিগাহারা বন থেকে উদ্ধার করা হয়।

এরপর ১৯৯৩ সালে অপর জাপানি লেখক ওয়াতারু তসুরুমুই ‘দ্য কমপ্লিট সুইসাইড ম্যানুয়াল’ নামে একটি বই লেখেন। প্রকাশের পর বইটি ভীষণ বিতর্কের সৃষ্টি করে। কারণ বইটিতে আত্মহত্যার বিভিন্ন ধরন সম্পর্কে বর্ণনা করা হয়েছে। বইটিতে লেখক আওকিগাহারা বন আত্মহত্যার একটি সঠিক স্থান হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। লেখকের ভাষায় এ যেন এক সহজ পথ। ওই বনে গিয়ে ভয়ঙ্কর সবুজের মধ্যে হারিয়ে যাও। তারপর কোনো গাছে উঠে গলায় ফাঁস লাগিয়ে ঝুলে পড়ো- শেষ করে দাও নিজেকে!

এর বাইরে আরও একটি কিংবদন্তি নেট দুনিয়া এবং জাপানে চায়ের আড্ডায় কান পাতলে শোনা যায়। সেটি হচ্ছে বর্তমানে সম্পদশালী জাপান একসময় এতটা অবস্থাশালী ছিল না। সেমময় জাপানে ঘনঘন দুর্ভিক্ষ হতো।  দুর্ভিক্ষের কারণে অনেক পরিবারে নেমে আসত নিদারুণ দুর্ভোগ। না খেয়ে মারা যেত অনেকে। অনাহারের কষ্ট লাঘবে পরিবারের বয়স্ক সদস্যদের রেখে আসা হতো ওই বনে। এতে পরিবারে খাওয়ার মুখ কমে যেত। আর যাদের বনে রেখে আসা হতো, না খেয়ে ধুঁকে ধুঁকে মারা যেত তারা।

অনেকের মতে, অনাহারে কষ্ট পেয়ে মারা যাওয়া এসব দুর্ভাগা মানুষের অতৃপ্ত আত্মা এখনো ঘুরে বেড়াচ্ছে ওই বনে। তারাই বেড়াতে যাওয়া মানুষকে আত্মহত্যায় প্ররোচিত করে। তবে এই কাহিনী অনেকটা অনুমান নির্ভর এবং প্রচলিত কুসংস্কারাচ্ছন্ন লোকেদের ভাবনা বলেই অনেকে মনে করেন।

এসব জনপ্রিয় কাহিনীর পাশাপাশি গবেষকগণ আরও একটি ব্যাখ্যা দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছেন। তাদের মতে জাপানে দিন দিন বিষণ্নতায় ভোগা মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। মানুষগুলো অধিকাংশ সময় একাকী জীবন যাপন করে। তারা মনে করে বাস্তব জীবনে যেহেতু তারা একা, তাই তারা ওই বনে গিয়ে আত্মহত্যা করলে অন্য মৃত আত্মাদের সঙ্গে মৃত্যুর পর থাকতে পারবে। আত্মহত্যা করতে গিয়ে বেঁচে ফেরা এক ব্যক্তির বক্তব্য গবেষকদের এই দাবির সত্যতা স্বীকার করে।

তবে আত্মহত্যার কারণ যাই হোক, বর্তমানে এই বনটির নাম শুনলে জাপানিদের মনে ভয়ের হিমেল স্রোত বয়ে যায়। কারণ এই বনটি কেড়ে নিয়েছে তাদের অনেক প্রিয়জনকে। বনটিতে আত্মহত্যা ঠেকাতে স্থানীয় প্রশাসন বনে ঢোকার মুখে একটি সতর্কবার্তা লিখে রেখেছে। বাংলা অর্থ করলে দাঁড়ায়: ‘পিতা-মাতার কাছ থেকে পাওয়া মহামূল্যবান উপহার তোমার এই জীবন। শান্তচিত্তে একবার হলেও ভাইবোন, সন্তান ও পরিবারের অন্য সকলের কথা ভাবো।’

প্রযুক্তির এই উৎকর্ষতার যুগে রহস্যময় পৃথিবীতে অনেক কিছুই ঘটে যার ব্যাখ্যা খুঁজে পাওয়া কঠিন। আওকিগাহারায় যা ঘটছে সেটিও ব্যাখ্যাহীন অবিরাম ঘটে চলা ঘটনা। এই ঘটনা স্মরণ করিয়ে দেয় কবি জীবনানন্দ দাশের ‘আট বছর আগে একদিন’ কবিতার কথা। কবি  লিখেছেন:    

‘শোনা গেল লাশকাটা ঘরে

নিয়ে গেছে তারে;

কাল রাতে ফাল্গুনের রাতের আঁধারে

যখন গিয়েছে ডুবে পঞ্চমীর চাঁদ

মরিবার হল তার সাধ।’

কবিতাটি যেন এখনও মূর্ত হয়ে আছে জাপানের সেই অভিশপ্ত বনে।



ঢাকা/তারা

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন