ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭, ২৮ মে ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

করোনা ছাড়াই কোয়ারেন্টাইনে ৭ বছর

খালেদ সাইফুল্লাহ : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০৪-০৮ ২:৩৭:১৫ এএম     ||     আপডেট: ২০২০-০৪-০৮ ৮:৫০:৫২ এএম

করোনার ফলে বেশ কিছু শব্দের সঙ্গে আমাদের নতুন করে পরিচয় ঘটছে। এর মধ্যে ‘কোয়ারেন্টাইন’ একটি বহুল ব্যবহৃত শব্দ। বিশ্বব্যাপী শব্দটির ব্যবহার এখন মুখে মুখে। সাধারণত করোনার উপসর্গ দেখা যায়নি এমন ব্যক্তিকে অন্যদের থেকে আলাদা থাকা বোঝাতে শব্দটি ব্যবহৃত হয়।

এই সময়ে মানুষকে ঘরে থাকতে বলা হচ্ছে। মহামারি ঠেকাতে এটিই একমাত্র পন্থা। কেউ কেউ সেলফ কোয়ারেন্টাইনেও দিন কাটাচ্ছেন। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে করোনা ছাড়াও একজনকে দীর্ঘদিন বাইরের আলো-বাতাস থেকে দূরে থাকতে হয়েছে, এমন উদাহরণ রয়েছে। জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জকে মনে পড়ে? উইকিলিকস-এর প্রতিষ্ঠাতা। গ্রেফতার এড়াতে জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ একটানা সাতবছর এক বিল্ডিং-এ থেকেছেন। সেখান থেকে তিনি বের হননি।

জন্মসূত্রে অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক অ্যাসাঞ্জ পেশায় কম্পিউটার প্রোগ্রামার। কিশোর বয়স থেকে হ্যাকিং-এর নেশায় মত্ত অ্যাসাঞ্জ ২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠা করেন উইকিলিকস নামের ওয়েবসাইট। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রীয় গোপনীয় নথি সেখানে প্রকাশ করে বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করেন অ্যাসাঞ্জ। উইকিলিকস বিভিন্ন গোপনীয় তারবার্তা হ্যাক করার মাধ্যমে সেগুলো জন সাধারণের সামনে নিয়ে আসে। বাগদাদে আমেরিকার বিমান হামলায় ইরাকি নাগরিক হত্যার ভিডিও প্রকাশ, কিউবায় আমেরিকার গুয়াতেনামো বে কারাগারে অপারেশনের পরিকল্পনাসহ বিভিন্ন দেশের দুর্নীতির গুরুত্বপূর্ণ সব তথ্য প্রকাশ করতে থাকে উইকিলিকস। ২০১০ সালে আড়াই লাখ মার্কিন ক‚টনৈতিকের তারবার্তা এবং ৫ লাখ সামরিক গোপন নথি ফাঁস করে হইচই ফেলে দেয় উইকিলিকস। ফলে দ্রুতই আমেরিকার রোষানলে পড়ে জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ।

২০১০ সালে সুইডেনের দুই নারী তার বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও যৌন হেনস্তার অভিযোগ আনে। তখন যুক্তরাজ্য তাকে সুইডেনের কাছে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নিলে তিনি রাজনৈতিক আশ্রয় খুঁজতে থাকেন। অ্যাসাঞ্জ আশঙ্কা করেন সুইডেন তাকে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তুলে দিতে পারে। ইকুয়েডরের তৎকালীন বামপন্থী রাষ্ট্রপতি রাফায়েল করেয়া তার প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন করে।

অ্যাসাঞ্জকে লন্ডনের ইকুয়েডর দূতাবাসে আশ্রয় দেওয়া হয়। দূতাবাস ভবনের এক কোণার একটি কক্ষ তার শোবার ঘর এবং একইসাথে কাজের জায়গা হিসেবে প্রদান করা হয়। শুরুতে মেঝেতে ম্যাট্রেস বিছিয়ে তার শোবার ব্যবস্থা করা হয়। ঘর লাগোয়া একটি কিচেন এবং বাথরুম ব্যবহারের জন্য দেওয়া হয়। অ্যাসাঞ্জ ওই ভবন থেকে ৭ বছর বের হননি। কারণ বাইরে সব সময় পুলিশ তার প্রতি নজর রাখত। বের হলেই গ্রেফতারের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকত তারা। ভবনের বাইরের ব্যালকনিতে দাঁড়িয়েই অ্যাসাঞ্জ সংবাদ সম্মেলন করতেন।

দূতাবাসে থাকাকালীন তিনি উইকিলিকস-এর কার্যক্রম চালু রাখেন এবং তখনও নানা ধরনের গোপন তথ্য ফাঁস অব্যাহত থাকে। এমনকি ২০১৬ সালের নির্বাচনে হিলারী ক্লিনটনের বিরুদ্ধে উইকিলিকসে গুরুত্বপূর্র্ণ তারবার্তা ফাঁস হয়। ওই নির্বাচনের সময় অ্যাসাঞ্জ যেন কোনো প্রকার হস্তক্ষেপ না করতে পারে এ কারণে তার ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন রাখা হয়। ২০১৯ সালে অ্যাসাঞ্জকে গ্রেফতারের পর তার এক বন্ধু জানায়, এরকম ছোট একটি জায়গায় তার বসবাস করা ছিলো খুবই কষ্টকর। সেখানে প্রচুর প্রাকৃতিক আলো-বাতাস ছিলো না। তার জন্য সবচেয়ে কষ্টকর দিন ছিলো সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলো। এমন দিন তাকে একদম নিঃসঙ্গ কাটাতে হতো। সে সামান্য হাঁটাহাটির জন্যও বাইরে বেরোতে পারত না।

২০১৭ সালে ইকুয়েডরের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেন লেনিন মরেনো। তিনি আসার পর জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ভালো থাকেনি। ফলশ্রুতিতে ২০১৯ সালে তার রাজনৈতিক আশ্রয় বাতিল করা হয় এবং ওই বছর ১১ এপ্রিল তাকে লন্ডন পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়। জেলখানায় না থেকেও একজন মানুষ একই বিল্ডিং-এর চৌহদ্দি পেরোতে পারেননি টানা ৭ বছর। এটিকে সেসময় আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আইসোলেশন হিসেবে উল্লেখ করে। বর্তমান পরিপ্রেক্ষিতে আমরা ঘটনাটিকে কোয়ারেন্টাইন বলতে পারি। যদি আপনি মাত্র কয়েকদিন ঘরবন্দি জীবনে হাঁপিয়ে ওঠেন, তবে অ্যাসাঞ্জের ৭ বছরের ঘরবন্দি জীবনের কথা ভাবুন। তাহলেই আর কষ্টটাকে কষ্ট মনে হবে না।


ঢাকা/তারা/নাসিম