ঢাকা, সোমবার, ৮ আশ্বিন ১৪২৬, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

নিরুপায় বৃত্ত: শব্দশিল্পে ধারণ করা সমকাল

মীম মিজান : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-০৭-১০ ৫:২০:১৮ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-০৭-১০ ৫:২৪:৫৯ পিএম
নিরুপায় বৃত্ত: শব্দশিল্পে ধারণ করা সমকাল

মীম মিজান: কবিতায় মনের আবেগ যতটা নান্দনিক ও মনোহরভাবে উপস্থাপন করা যায়, ততোটা অন্যক্ষেত্রে উপস্থাপিত হয় বলে আমার মনে হয় না। উপমা, উৎপ্রেক্ষা, ঘোমটা টেনে আসল কথা ঘুরিয়ে বলা, বিদ্রোহে ফেটে পড়া, হৃদয়-অবয়ব গলিয়ে প্রেম ঠিকরে পড়া ইত্যাদির এক চমৎকার মাধ্যম কবিতা। আর সেই মাধ্যমে নিজের চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা বিষয়াদির কাব্যিক বর্ণনা দিয়েছেন মিলু শামস।

সমাজে কোনো অত্যাচার-নিপীড়নের ঘটনা ঘটলে, প্রেমের বাতায়নে টান পড়লে, ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটলে, নৈতিকতার অবক্ষয় দেখলে, নিরীহ দুঃস্থের অসহায়তায় মমত্ব জেগে উঠলে তিনি বুঁদ হন কবিতার খেরোখাতায়। কবিতার ছত্রে ছত্রে শব্দ ঝংকার দিয়ে ওঠে, প্রেমাস্পদের জন্য মনের গহীন থেকে উৎসারিত হয় প্রেমের শব্দ বুনন, ইতিহাস ঘেঁটে জাতিকে জানিয়ে দেন বর্তমান সময়ের সঠিক কর্ম।  পাঠক তার বহুমাত্রিকতার কবিতা পাঠ করে নিজেকে কাব্যরসে সমৃদ্ধ করার অবকাশ পায়। এবার একুশে গ্রন্থমেলায় প্রকাশিত হয়েছে মিলু শামস-এর কাব্যগ্রন্থ ‘নিরুপায় বৃত্ত’। গ্রন্থের ‘চেয়ার’ কবিতাটি এই নগন্য পাঠকের মনে অবিস্মরণীয় মনে হয়েছে। প্রতীকী কবিতা এটি। এখানে কবি তাঁর শিশুকালের স্মৃতির কথা উল্লেখ করে চেয়ার তৈরির বিষয়ে কিছু মানুষের নৈপুণ্য উল্লেখ করেছেন। কবিতার অন্তরালে তিনি সমাজের মানুষকে নয়, তার পদকে, তার ক্ষমতাকে চরম সমীহ করেন যারা তাদের ইঙ্গিত দিয়েছেন। যদি সেই মানুষটির পদ বা ক্ষমতা না থাকে, তখন তাকে উচ্ছিষ্ট মনে হয়। রাস্তায় পড়ে থাকা ময়লা বা আবর্জনা ভাবা হয় তাকে। অথচ মাত্র কয়েকদিন আগেও সেই ব্যক্তি ছিলেন কী গ্রহণযোগ্য! মানুষ বড় না চেয়ার বড়? ক্ষমতা বড় না মানবতা বড়? এমন প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় কবির  ‘চেয়ার’ কবিতায়।

মানুষ মানবিকতা ভুলে আজ হয়েছে অমানবিক। নিজের স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য কত কূটকৌশলের আশ্রয় নিচ্ছে। আমরা ইতিহাস থেকে শিক্ষা গ্রহণ করি না। তাই ইতিহাসও আমাদের স্থান দেয় আস্তাকুঁড়ে। ‘ইতিহাসের ফসিল’ নামক কবিতায় ইতিহাসের নির্মম সত্য উপস্থাপন করেছেন। সাবধান করে দিয়েছেন শঠতা ও আত্মবিধ্বংসী কাজ করা থেকে। লন্ডনের টেমস নদীর তীরে বসে লেখা কবিতাটিতে যেমন তিনি স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন:

‘তরবারি ছিল না, অ্যাটমও না

ছলনা ও কূটচালের

একগুচ্ছ নিরাকার মারণাস্ত্র

ছিল শুধু তার

অ্যাটমের চেয়ে ভারী।

সিরাজের বিশ্বাসের অফুরান

ভাণ্ডার লুটে

তা দিয়ে কষেছিল

শুভঙ্করের

অনিঃশেষ ভাগফল

সরল বাংলার বাতাসে।’

(ইতিহাসের ফসিল, নিরুপায় বৃত্ত)

আমাদের বিচরণক্ষেত্র অপার সুন্দর এই প্রকৃতি। প্রকৃতি উদ্বেলিত করে মানস ও মনন। একজন কবির কাছে প্রকৃতি অনেক বড় অনুষঙ্গ ও কাব্যের জমিন। প্রকৃতি তার বৈচিত্রে ভাবাপ্লুত করে কবির হৃদয়ের শব্দ নিপুণতা। গাছের কঁচিপাতা, নানা প্রজাতির পাখির কূজন, সকালের স্নিগ্ধ সমীরণ, গোধূলির ধূমায়িত আচ্ছন্নতা, বর্ষণমুখর কোন বিকেল মূর্ত হয়ে মূর্ছনা ছড়ায় কাব্যিক জমিনে। আবার সেই কাব্যের জমিনও ভরে ওঠে খেটে খাওয়া কোন মানুষের নিষ্পাপ অবয়ব থেকে দরদর করে ঝরে পড়া লবণাক্ত জলে। আশ্বিনের আকাশ মানেই তো শারদ আবহ। উৎসব আনন্দের আড়ালে চাপা পড়ে থাকে খেটে খাওয়া মানুষের দীর্ঘশ্বাস। তারই ইঙ্গিত পাই ‘আশ্বিনের আকাশ’ কবিতায় :

‘সেইসব দীঘল নিঃসঙ্গ দিনে

মল্লিক পাড়ার মাঠে দাঁড়ালে

আশ্বিনের আকাশ হাসত

দু’পাটি সফেদ দাঁত দিগন্তে ছড়িয়ে।

একাকী চিল প্রসারিত পাখায়

স্থির নিশ্চল

যেন নীলাকাশে ল্যান্ড করেছে

বোয়িং ৭০৭’

(আশ্বিনের আকাশ, নিরুপায় বৃত্ত)

উপরওয়ালাকে সন্তুষ্ট রাখার জন্য কী মরিয়া আমরা! অথচ দু’য়েকদিন পরেই থাকে না সেই সোৎসাহে সম্পাদিত কাজটির বর্তমান ও ভবিতব্য হাল হকিকত। তাই ফাঁকা বুলি আওড়াই। হম্বিতম্বি করি। কিন্তু নির্দিষ্ট সময় পর সব উবে যায়। বছরান্তে আবার মহা ধুমধাম করে একই কাজ করা। গত বছর আমরা যা করেছি, চলতি বছর আমরা প্রায় তার দ্বিগুণ কাজ করে দেখাবো। কিন্তু সবই মেকি। সবই আই ওয়াশ। কঠিন এই উদাসীনতা ও মহা আয়োজনের ব্যাপারে প্রতীকী প্রকাশ ঘটিয়েছেন ‘বৃক্ষরোপণ অভিযান’ কবিতায়।

ক্ষণিকের এ ধরায় গতায়াত সবকিছুর। শুধু স্থাণু হয়ে রয় অমর প্রেম। প্রেম মানুষকে সুন্দর করে, বাঁচতে শেখায়, বাঁচাতে শেখায়। প্রেম সাগরে অবগাহন করে শান্তির নিঃশ্বাস ফেলতে দেখি। তবে এ প্রেমের আছে রকমফের। কেউবা জৈবিক চাহিদাকেই প্রাধান্য দেয়। কেউ প্রাধান্য দেয় হৃদয়াবেগ। প্রেমের যে বড় উদাহরণ তা শাহজাহানের (১৬২৮-১৬৫৮) মমতাজ মহল, নেবুচাদ নেজারের (খ্রিস্টপূর্ব ৬০৫-৫৬২) ঝুলন্ত উদ্যান কিংবা হাফেজ সিরাজির (১৩২৫-১৩৮৯) প্রিয়ার ঠোঁটের কালো তিলের বিনিময়ে সামারখান্দ ও বুখারা নগরীকে বিলিয়ে দেয়া। প্রেমের নিখাঁত উপস্থাপন ও রকমফের কবি মিলু শামস তাঁর বেশ কয়েকটি কবিতায় তুলে ধরেছেন। যেমন প্রযুক্তির এ যুগে তিনি দূরে অবস্থানরত তাঁর প্রিয়জনকে ডাক হরকরার পিঠে পোস্টকার্ডে প্রেম পাঠাননি। পাঠালেন ‘অন্তর্জাল ডাকে’। চেয়েছেন আবার সেগুলোর ত্বরিত উত্তর। নইলে তাঁর প্রেমে কাতর হৃদয় মরে যাবে। শুকিয়ে হবে সাহারা মরু। ঝরে পড়বে শুষ্ক পল্লবের মতো:

‘আকাশ পথিক নিমগ্ন গাঢ় রাতে

সানাইয়ের সুরে বেঁধে

একহাজার এক শ’ একান্নটি

চুম্বন পাঠালাম

অন্তর্জাল ডাকে

ফিরতি ডাকে উত্তর চাই প্রতিটির।

 

নইলে হৃদয়ের সুইসাইড নোটে

অক্ষয় কীর্তি হয়ে জ্বলবে

 তোমার নাম, মনে রেখ।’

(হৃদয়ের সুইসাইড নোট, নিরুপায় বৃত্ত)

প্রেমে যাঁর মন আকুলি-বিকুলি করে, সেই তাঁরই মন আবার কোন প্রিয়জন হারানোর ব্যথায় বিষণ্ন হয়ে ওঠে। প্রিয়জন হারানো মানুষকে প্রতিনিধিত্ব করে কবি তাঁর শব্দের বুননে তাদের স্মৃতি হাতড়ান। তাদের মনের উজ্জ্বল আলোয় স্মরণ করতে গিয়ে দু’চোখ থেকে খসে পড়ে টসটসে নোনা উষ্ণজল। বিশ্বসাহিত্যে অনেক শোকগাঁথা আছে। তবে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ শোকগাঁথা আছে ফারসিতে। যাকে বলা হয় মর্সিয়া। ভালোবাসার যে মানুষ আজ অধরা, অস্পর্শ্য তার প্রেমমিশ্রিত আবহ কিন্তু আজো ভেসে ওঠে চারপাশে। তার উপস্থিতি অনুভূত হয় মানসপাটে। সেই উপস্থিতি কাব্যেও:

‘শব্দ নয় বেদনার নুপূর

বাজে সারা বেলা আজ;

দূরের আলোঘরে

সরোদের সুর-

নক্ষত্রের তার বেঁধে দেয় তাল লয়

স্পর্শহীন অথচ বড় বেশি স্পর্শময়।

আলোক বর্ষ দূরের ভালবাসারা

এভাবে বাঙময় হয়।’

(বেদনার নুপূর, নিরুপায় বৃত্ত)

কবির কাব্যজমিন সারল্যে পূর্ণ। আধুনিকতার নানাদিক তাঁর কাব্যে পরিস্ফুট। শব্দ চয়ন ব্যবহার করেছেন পরিমিত। নিরাসক্ত থেকেছেন প্রায় সবখানেই। অতিরিক্ত আবেগের উদ্দাম ব্যবহার পরিলক্ষিত হয় না। কবিতাগুলো মধ্যবয়ব ও স্বল্পায়তনের। হাতে গোনা দু’য়েকটি কবিতায় অন্ত্যমিল দিয়েছেন তিনি। ইংরেজি শব্দের ব্যবহার দেখেছি। ব্যবহার আছে ব্যক্তিজীবনের অন্দরমহলের কিছু পরিভাষা। আড্ডা দেয়ার জায়গা। কফি মগের কথা। সবথেকে যে বিষয়টি বেশি ফুটে উঠেছে তা হচ্ছে, সমকালের নানা অনুষঙ্গ তিনি নিপুণভাবে তুলে এনেছেন কাব্যে। আর এই অনুষঙ্গগুলো কাব্যের জমিনে চাষাবাদ হয়ে এমন ফসলে পরিণত হয়েছে যা কালোত্তীর্ণ। পাঠক মহলে ইতোমধ্যে সমাদৃত হয়েছে ‘নিরুপায় বৃত্ত’। উত্তরোত্তর তা আরও বৃদ্ধি পাবে নিঃসন্দেহে।

বইটির প্রচ্ছদ এঁকেছেন চারু পিন্টু। মূল্য ১২০ টাকা। প্রকাশক এবং মানুষ প্রকাশনী।


রাইজিংবিডি/ঢাকা/১০ জুলাই ২০১৯/তারা

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন