ঢাকা, রবিবার, ৩১ ভাদ্র ১৪২৬, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

চায়ের ঘ্রাণে পরিচয়

রাকিফা রহমান চৌধুরী : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-০৮-২৪ ৪:৫৬:৫৭ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-০৮-২৪ ৪:৫৬:৫৭ পিএম
চায়ের ঘ্রাণে পরিচয়
Walton E-plaza

রাকিফা রহমান চৌধুরী : প্রায় এক বছর পর চায়ের টং দোকানে ফেরা। ভালোই লাগছে! পুরনো দিনের কথা মনে পড়ল। চায়ের কাপ; সাথে আড্ডা! দারুণ স্মৃতি! মামাকে বললাম, ‘মামা মসলা চা দাও। না থাক, চিনি বেশি দিয়ে দুধ চা দাও। না না থাক, মাল্টা চা দাও। আচ্ছা লেবু চা দাও।’ এক নিঃশ্বাসে বললাম। বলেই জায়গা করে নিলাম দোকানে। বসার বেঞ্চটা পুরনো লোহা দিয়ে বানানো। চারিদিক দেখতে লাগলাম। 
            একটু সামনে শাহজানের চায়ের দোকান; যেখানে সপ্তাহের দু’ অথবা তিনদিন বৈকালীক আড্ডা দিতাম। এর সাথে, তো ওর সাথে। এভাবে মাস্টার্সের জীবনযাপনের ইতি ঘটল। আজ পুরনো সেই জায়গায় ফিরে গিয়ে ভালো লাগছে। মনে পড়ে গেল সেদিন সন্ধ্যা রাতের ঘটনাটি। 
            মানুষের জীবনে পরিচয় ঘটে বিভিন্নভাবে, কারো মাধ্যমে বা কারো সঙ্গে আমরা পরিচয় হই, বা কেউ আমাদের সঙ্গে পরিচয় হয়। আর পরিচয়গুলো বিচিত্র হয়ে থাকে। আমারই গল্পটা ঘটে এখান থেকেই। গল্পে আসা যাক! 
            একবার সন্ধ্যার ক্লাস শেষ করে শাহজাহান মামার চায়ের দোকানে চলে যাই। তখন বোধ হয় রাত সাড়ে ন’টা বাজে। চা পান করতে যাব ঠিক তখনি ক্ষুধা লেগে গেল। ব্যাচেলর আমি। ঢাকায় ভার্সিটির কাছে একটা ফ্ল্যাটে আমরা কয়েকজন ছেলে একসাথে থাকি। প্রতি রুমে আমরা দু'জন করে রুমমেট । বাসায় তো খাবার নেই। ভাবলাম পাশের ‘গুড়ম গুড়ুম ক্যাফে’তে গিয়ে রাতের ভাত খেয়ে ফেলে নেয়া যাক। যে চিন্তা সে কাজ। সোজা চলে গেলাম ক্যাফেতে। 
            ক্যাফের বাহিরটা অসাধারণ। খুব সুন্দর বসার জায়গা। বলতে গেলে বাইরে স্মোকিং জোন। পাশেই একটা জায়গায় কয়েকজন ছেলে আড্ডা দিচ্ছে। ওদের ভাষা শুনে মনে হলো ওরা বোধহয় ঢাকার বাইরের পোলাপান। কথাবার্তায় বোঝা যাচ্ছিল, তারা খুব একটা সুবিধার না। তাকিয়ে তাকিয়ে কাকে যেন দেখে বারবার কটুক্তি করছিল। আর জোরে জোরে কাকে যেন ডাকছিল ‘নতুন পাখি এসেছে। একবার এদিকে তাকাও না’... এই টাইপের কি জানি বলে যাচ্ছিল। কৌতূহলবশত আমিও একটু তাকিয়ে দেখি, দোকানের শেষ কর্ণারে একটা ছোট টেবিলে একটা মেয়ে কি জানি লেখালেখি করছিলো। পড়নে নীল রঙের সালোয়োর কামিজ। চোখে চশমা। হাতে ঘড়ি। একটু পর পর সময়টাকে দেখছে। বোধহয় কারো জন্য অপেক্ষা করছিল। আমিও ওর মত আমার মোবাইলে সময়টা দেখে নিলাম। তখন মনে হয় রাত সাড়ে দশটা বাজে। বলতে গেলে আশেপাশের দোকানগুলো প্রায় গোছানোর পালা ছিল। কিন্তু তখনও চায়ের দোকানগুলোতে চায়ের চুলা জ্বলতে দেখা যাচ্ছিল। 
            মেয়েটা আনমনে লেখায় ব্যস্ত। সে খেয়াল করছিল না যে কতোগুলো ছেলে ওকে দেখে ইতরামি করছিল। ‘মামা! ও শাহজাহান মামা এককাপ চিনিছাড়া লেবু চা দাও। মজা কইরা কিন্তু বানাইয়ো’, মেয়েটি জোরে জোরে বলল। 

ইতিমধ্যে আমার ভাত, ডাল ও ভর্তা চলে আসল। তখন ঠিক পাশের ছেলেগুলোর সাথে আরোও ছেলেপুলে যোগ দিল। আমি ভাত ডাল-ভর্তা মেখে খাচ্ছিলাম। আর একটু পরপর তাদের দেখছিলাম কি করছিল। এবার এসেছে প্রায় পঁচিশ জনের মত তাও আবার দশটা বাইক নিয়ে। দেখালাম মেয়েটা বেঁকে বসল। খুব তাড়াহুড়ো করে কলম, নোটবুক এবং পানির বোতল ব্যাগে ভরে ফেলা শুরু করলো। মেয়েটা বোধহয় ঠিকই টের পাচ্ছিল। ওই সময়ে সবকটা ছেলেগুলো আবার বলা শুরু করল, ‘আহা! মাত্র আসলাম চলে যাচ্ছ। মেয়েটার বেশ কাছে গিয়ে অসভ্যতামি করে গান গাইছিল। দেখে তো মনে হয় ভদ্র পরিবারের ছেলেপুলে। ভালো পোশাক-আশাক। হাতে দামি দামি মোবাইল। মাথায় সানগ্লাস ঝুলিয়ে রেখেছিল। মেয়েটা কিছুই বলছিল না। ওর চোখে মুখে ভয়-ভয় ভাব দেখা যাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল ও বুঝি এখনই কেঁদে না দিবে। আশ্চর্য ! মেয়েটি কাঁদল না। কারো কাছ থেকে সাহায্যও চাইছে না। কিন্তু এখান থেকে বের হয়ে যাওয়ার তাড়না দেখা যাচ্ছিল।

     এবার ছেলেগুলো মেয়েটার পেছন পেছন হাঁটা শুরু করলো। অবরোধ করে রেখেছিল আর বলছিল, ‘কি ব্যাপার এত রাতে কিভাবে যাবেন? বাইক আছে সাথে। ওঠেন আপনে কোথায় যাবেন, চলেন নামিয়ে দেই।’ মেয়েটি তখনও চুপ। ওদেরকে এড়ানোর চেষ্টা করছিল। ওর পিছু পিছু ধাওয়া করছিল। আমি বিপরীত টেবিল থেকে বসে বসে পুরো ঘটনাটি দেখছিলাম। হঠাৎ মেয়েটা অনেক জোরে ধমক দিয়ে বলল, ‘মামা! চা ক্যানসেল।’ বলেই পা বাড়াতেই ছেলেগুলো আবার বলে উঠল, ‘আমরা কথা বলছি, আপনি কথা বলবেন না?’ আরো অসদাচরণ করে গান জোরে জোরে গাইছিল। আমি অপলক দৃষ্টিতে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে দেখি ভয়ে মুখ সাদা হয়ে গেছে। ও চিৎকার করতে চাচ্ছে, কিন্তু পারছে না। কেউ তার সাহায্যের হাত বাড়িয়েছে কিনা দেখার জন্য ফ্যাল ফ্যাল করে আশেপাশে তাকাচ্ছে। কাকে যেন সে খুঁজছে? আবার নিজেই লড়ে যাচ্ছে। 
           

এইবার নিজেকে আটকিয়ে রাখতে পারলাম না। সোজা উঠে দাঁড়ালাম। নিজেকে আড়াল করলাম। আর একদম ছেলেগুলোর পাশ দিয়ে হেঁটে মেয়েটার কাছে দাঁড়ালাম। ওই গ্রুপের দু'একটা ছেলেপুলেকে আমি জানতাম ও চিনতাম। আমাকে ওরা খুব ভালো করে চেনে। তো মেয়েটার পাশে দাঁড়াতেই ওরা চুপ হয়ে যায়। আর আমি সাথে সাথে ওদের ইশারা দেখিয়ে বললাম চলে যেতে। তো ভার্সিটির পরিচিত হওয়ায় সবাই সবাইকে চেনে। পরিচিত মুখ এই আর যা! এরপর ওরা সবাই মেয়েটিকে বিরক্ত করা বন্ধ করে দিল। 
ওরা চলে যাবার পর, তাকিয়ে দেখি মেয়েটা ভয়ে কাঁপছে। আমি মেয়েটাকে স্বাভাবিক আনার জন্য চায়ের অফার করলাম। বলার সাথে সাথে ঘড়ি দেখল আর বলল, ‘রাত অনেক হয়েছে। বাড়িতে যাবো’। ‘ঠিক আছে, আপনি চা খান, তারপর না চলে যেয়ে ‘, আমি বললাম। মেয়েটি কিছু না বলে চুপচাপ চায়ের দোকানে বসে পড়লো। শাহজাহান মামাকে দু'টো চায়ের অর্ডার দিলাম। মামা মেয়েটিকে দেখে বলল, ‘মামা আপনার চা এখনও ক্যানসেল হয় নাই, ওটা দেই।’ আমি দেখি মেয়েটি এবারও চুপ! 
            মেয়েটিকে দেখে আমার কেমন জানি লাগচ্ছিল। তারপরও একটা মানবিকতার জন্য তাকে লক্ষ্য করে যাচ্ছিলাম। চোখ আড়াল করে তাকে দেখছিলাম। দেখি মেয়ে ভয়ে-রাগে কাঁপছে, কাঁদতে চাইছে কিন্তু পারছে না । শুধু নীরবে দু'এক ফোঁটা অশ্রু ঝরালো। ইতিমধ্যেই চা চলে এলো, তার হাতে চা দিতেই দেখি হাতটা ঠকঠক করে কাঁপছে। ‘আপনি চা খান, দরকার হলে আমি কোন কিভাবে আপনাকে সাহায্য করতে পারি,’ বললাম আর অমনি করে পুরো এলাকার কারেন্ট চলে গেল। মেয়েটা ভয়ে আমাকে আঁকড়ে ধরে বলল, ‘রাতে চোখে একটু কম দেখি, যদি পারেন তাহলে আমাকে একটু সামনে এগিয়ে দিবেন,’ বলে সে চায়ের কাপ দোকানে ফেরত দিয়ে দিল। কিছু চিন্তা না করে আমি তাকে সাহায্যের জন্য এগিয়ে যাই। মেয়েটি আমাকে রেখেই হাঁটা শুরু করলো। বোধহয় রাস্তাটা চেনে। সামনে ভাঙ্গা আধো আলো রাস্তার লাইটের নীচে এসে আমাকে চলে যাওয়ার অনুরোধ করল এবং বলল, ‘বাকিটা আমার পথ। যেতে পারব। ধন্যবাদ।’ বলে চলে যাওয়া শুরু করলো। আমি আর কিছুই বলতে বা জিজ্ঞাসা করতে পারি নাই। শুধুই এতটুকু বুঝতে পারলাম, মেয়েটি সারা পথজুড়ে আজ কেঁদে কেঁদে বাসায় হেঁটে যাবে। হয়ত বা গিয়েছিল এইভাবে। আমি তো আর পাশে ছিলাম না। পরিচয় হওয়া আর হলো না। তারপরও মেয়েটিকে কেন জানি আপন মনে হল। মনে হয়েছিল সে বুঝি তার মধ্যে আর নেই। 
            বছরখানেক পর এ পুরো ঘটনা স্মৃতিচারণ হল। চা এবারও পান করতে এসেছি শুধু মেয়েটির পরিচয় পাওয়ার জন্য। কথায় আছে না, পরিচয়টা ঘটে চায়ের মাধ্যমে। আর চা-আড্ডার মাধ্যমে পরিচয়টা গভীর হয়। হোক না শুরুটা চা দিয়ে। হয়ত বা চায়ের ঘ্রাণে মেলবে পরিচয়ের স্বাদ।


রাইজিংবিডি/ঢাকা/২৪ আগস্ট ২০১৯/তারা

Walton AC
ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন
       
Walton AC
Marcel Fridge