ঢাকা, মঙ্গলবার, ৮ আশ্বিন ১৪২৬, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:
ইলিশকাল- তৃতীয় পর্ব

ইলিশের বাড়ি থেকে ইলিশ পার্ক

রফিকুল ইসলাম মন্টু : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-০৯-১১ ৮:০৯:১৯ এএম     ||     আপডেট: ২০১৯-০৯-১১ ১:০৬:০২ পিএম
ইলিশের বাড়ি থেকে ইলিশ পার্ক

রফিকুল ইসলাম মন্টু : ‘... সে যে ডাকাতিয়া বাঁশি।’ না, এটা ডাকাতিয়া বাঁশি নয়, ডাকাতিয়া নদীর গল্প। ঠিক ডাকাতিয়া নদীর গল্পও নয়, এ নদীপাড়ের ইলিশ বাজারের গল্প। লঞ্চঘাট থেকে ভেসে আসছে লঞ্চের হুইসেল। ঘাটে মানুষের ছুটাছুটি। আর বড় স্টেশনের ইলিশ বাজারের ঘাটে সারি সারি ছইবিহীন ট্রলার; কোনোটি বড়, কোনোটি মাঝারি, কোনোটি ছোট। অসংখ্য ইলিশের ঝুড়ি। ইলিশ বোঝাই এ ট্রলারগুলো এসেছে মেঘনা-তেঁতুলিয়ার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে। ঘাটেই হাত বদল। এরপর ইলিশ উঠবে বাজারে। দর উঠবে। আবার হাত বদল হবে। এভাবেই হাত বদল হতে হতে নদী-সমুদ্রের ইলিশ পৌঁছায় ক্রেতার কাছে এবং অবশেষে রান্নাঘর পর্যন্ত।

‘ইলিশের বাড়ি’র নামটি এখন প্রায় সকলেরই জানা। এই বাড়ি মেঘনা ও ডাকাতিয়ার মোহনায় জেগে থাকা চাঁদপুরে। এই শহরকেই বলা হয় ইলিশের বাড়ি। সমুদ্র এবং মেঘনা, তেঁতুলিয়াসহ আরও সব ছোট ছোট নদীতে জেলেদের জালে ধরা পড়া প্রায় সব ইলিশ চলে আসে নিজ বাড়ি- এই চাঁদপুর। জেলা ব্র্যান্ডেও চাঁদপুরকে ইলিশের বাড়ি বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। মেঘনা-তেঁতুলিয়া ঘুরে সমুদ্র সৈকত কুয়াকাটা গেলে দেখা মিলবে ইলিশ পার্কের। সেখানে আছে ইয়া বড় রূপালি ইলিশ, ৭২ ফুট লম্বা। ভেতরে ক্যাফে। ইলিশকে ঘিরে অন্য রকম এক আইডিয়া। ইলিশকালে ইলিশের বাড়ি যেমন জমজমাট, ঠিক তেমনি ইলিশ পার্ক ইলশে আমেজে জমজমাট।

ইলিশের বাড়ি যেন ইলিশেরই বাড়ি। রাত নেই, দিন নেই শুধু ইলিশ আর ইলিশ। কোনোটায় বরফ পড়ছে, কোনোটার দর হাঁকা হচ্ছে, আবার কোনোটা ট্রাকে উঠছে। ইলিশ ভর্তি ঝুড়িগুলো এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিচ্ছেন কঠোর পরিশ্রমী কিছু শ্রমিক। শুধু ক্রেতাদের ইলিশ কেনার সুযোগ নয়, শ্রমিকদেরও যেন একটু বাড়তি কাজ এই মৌসুমে। অত্যাধিক পরিশ্রম হলেও বাড়তি রোজগারে স্বস্তি খোঁজেন তারা। ব্যবসায়ীদের মত তাদেরও হয়তো এই মৌসুমে বাড়তি স্বপ্ন থাকে। আবার বাজার ঘুরলে আপনার চোখে পড়বে নারী-পুরুষ এবং শিশু টোকাই। হাতে থলে। ইলিশ ঝুড়ির কাছে করুণ আর্তি- একটা মাছ চাই। কারও করুণা হয়- থলেতে তুলে দেয় একটা ছোট সাইজের ইলিশ। দূর-দূরান্ত থেকে আসা ক্রেতারা যেমন বড় স্টেশন ইলিশ হাটে যান, তেমনি স্থানীয় ক্রেতারাও। আছে পাইকারি ক্রেতা, আবার খুচরো ক্রেতা। এখান থেকেই ইলিশ যায় দেশের বিভিন্ন স্থানে। ইলিশ মৌসুম চাঁদপুরের এই বাজারকে অন্য এক রূপ এনে দেয়। সকলের ব্যস্ততা। এখানে কারও সঙ্গে কথা বলার সুযোগ নেই। বাজারে যেমন কাঁচা ইলিশের গন্ধ, তেমনি আবার বাজার থেকে বের হলেই ভাজা ইলিশের গন্ধ বের হবে হোটেল থেকে। 

দেশের যেকোন স্থান থেকে আপনি চাঁদপুর ঘাটে আসতে পারেন। ঢাকা থেকে লঞ্চে যাওয়া যায় খুব সহজেই। অন্যান্য স্থান থেকে লঞ্চ-বাসে আসা যায়। দোতলা লঞ্চঘাট থেকে কাছে; আর একতলা ছোট লঞ্চঘাট থেকে আরও কাছে বড় স্টেশন ইলিশ বাজার। বাজারে প্রবেশের আগে সামনে পড়বে চাঁদপুর মৎস্য প্যাকিং সেন্টার। খানিক ভেতরে এগিয়ে গেলে চোখে পড়বে ঝুড়িতে কিংবা মেঝেতে সাজানো রুপালি ইলিশ। কোনোটিতে হালকা বরফের আস্তরণ, আবার কোনোটি বরফ ছাড়াই। বড়, মাঝারি, ছোট সাইজের ইলিশগুলো চোখ মেলে তাকিয়ে আছে। এটাই ইলিশ বাজার। ইলিশের বড় ব্যবসায়ীরা এই বাজারের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এরা উপকূলের বিভিন্ন স্থানের ছোট ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ইলিশ আনেন এই বাজারে। এদের সঙ্গে আবার রয়েছে বিভিন্ন শহরের যোগাযোগ। ট্রাকে-লঞ্চে ইলিশ পাঠানো হয় সেসব স্থানে। ইলিশকে আমরা যদি ফসলের সঙ্গে তুলনা করি; ঠিক ফসলের মতই মধ্যস্বত্ত্বভোগীরাই বেশি লাভবান হন। কৃষক যেমন ফসলের দাম তেমন পান না; এখানেই যে জেলে নদীতে কঠোর পরিশ্রম করে ইলিশ আহরণ করেন তার হিসাব টানাটানির মধ্যেই থাকে।

চাঁদপুরের পাইকারী ইলিশ ব্যবসায়ী আনোয়ার জানালেন, শুধু ইলিশ নয়, এখানকার ব্যবসায়ীরা অন্যান্য মাছেরও ব্যবসা করে। তবে ইলিশ মৌসুমে চাপ একটু বেশি থাকে। বিভিন্ন এলাকা থেকে এখানে মাছ আসে। সব বছর যে ভালো সময় যায় ব্যবসায়ীদের, তা নয়। অনেক সময় লোকসানও হয়। বিপুল অঙ্কের দাদন দিতে হয় জেলে এবং ছোট আড়তে; দাদনের টাকা তুলে ব্যবসা করতে হয়। টাকা বিনিয়োগের পর প্রয়োজন অনুযায়ী ইলিশ না এলে লোকসান হয়। তবে কয়েক বছর ইলিশের উৎপাদন বেশ ভালো। ইলিশ সংরক্ষণে সরকারের সিদ্ধান্ত, নিষেধাজ্ঞা আমরা মেনে চলি।

 

 

ইলিশ মৌসুমে বিভিন্ন এলাকা থেকে এখানে এসে ইলিশ জড়ো হয় বলেই কি চাঁদপুরকে ইলিশের বাড়ি বলা হয়? না, এর চমৎকার ব্যাখ্যা রয়েছে জেলা প্রশাসন প্রকাশিত জেলা ব্র্যান্ডিং প্রকাশনায়। এতে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘ইলিশ এক অনন্য রূপোলি সম্পদ, অনন্য জলজ সম্ভার, অতুলনীয় সমৃদ্ধি আর অফুরান গৌরবের আধার। বিশ্বজয়ী সুস্বাদু মাছ ইলিশ গভীর সমুদ্রের মাছ হলেও তার জীবনকালের বেশকিছু সময় সে কাটায় চাঁদপুরের মেঘনার জলে। অনেকটা সন্তানবতী মেয়ে যেমন বাপের বাড়ি আসে; তেমনি ডিম ছাড়ার সময় ইলিশ চলে আসে মেঘনায়, চলে আসে চাঁদপুর। ডিম ছাড়ে মেঘনার মিঠা পানিতে। বাচ্চারা বড় হয় এখানে। তাই ইলিশের বাড়িই যেন চাঁদপুর। চাঁদপুরকে পর্যটন শিল্পের আলোক-সম্পাতে আনতে ‘ইলিশের বাড়ি চাঁদপুর’-ই হয়েছে এখন অদ্বিতীয় স্লোগান।’

এই কথার সঙ্গে চাঁদপুরের কলেজ পড়ুয়া তরুণ রাকিব উদ্দিন যোগ করেন, ‘আসলেই ইলিশের জন্য চাঁদপুর অনন্য এক স্থান। চাঁদপুরকে ঘিরেই যেন ইলিশের জীবনচক্র। দেশবাসী ইলিশের বাড়ি হিসাবে চাঁদপুরকেই চিনে। ইলিশ মৌসুমে বহু মানুষের লক্ষ্যস্থল হয়ে ওঠে এখানকার ইলিশ বাজার। দূর-দূরান্ত থেকে এখানে অনেকেই আসেন ইলিশ নিতে, ইলিশ খেতে। অবসরে অনেকে দলবল নিয়ে বেড়াতে আসেন এখানে। চাঁদপুরে জন্ম নিয়ে আমি গর্বিত।’ রাকিবের অভিমতে একমত পোষণ করেন পাশে থাকা আরেক যুবক মো. মনিরুজ্জমান। তিনি বলেন, ‘ইলিশকেন্দ্রিক সকল কার্যক্রম এই চাঁদপুরকে ঘিরে। এখানে রয়েছে ইলিশ গবেষণা ইনস্টিটিউট। গত কয়েক বছর ইলিশের উৎপাদন ভালো হওয়ায় এর সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বেশ ভালোই আছেন। জেলেরাও আগের চেয়ে লাভবান।’ মাথার ওপর উচ্চ পাওয়ারের বৈদ্যুতিক বাতি। আলোর রশ্মি পড়ে চকচক করছে ঝুড়িতে সাজানো রূপালি ইলিশ। হাটে বাড়ছে থলে হাতে ক্রেতার সংখ্যা। বেলা বাড়ে, এগোই সামনে।

রাজধানী ঢাকার ফার্মগেটে যেমন ইলিশের ভাস্কর্য আছে, তেমনি ইলিশের ভাস্কর্য আছে উপকূলের বিভিন্ন জেলায়। চাঁদপুরে তো ইলিশ ভাস্কর্যের সঙ্গে রয়েছে ইলিশ চত্বর। সয়াবিন উৎপাদনের জন্য লক্ষ্মীপুরের ব্র্যান্ড স্লোগান ‘সয়াল্যান্ড’ হলেও সেখানেও রয়েছে ইলিশ ভাস্কর্য। দ্বীপ জেলা ভোলায় তো ইলিশ ভাস্কর্যের ছড়াছড়ি। উপকূলীয় জেলাগুলো ছাড়াও সারাদেশে ইলিশ ভাস্কর্যের তালিকা অনেক দীর্ঘ হবে। তবে দেশে একমাত্র ইলিশ ক্যাফে রয়েছে কুয়াকাটার ইলিশ পার্কে। ইলিশ মৌসুম এলে সেখানেও ইলিশ নিয়ে চলে নানান আয়োজন। যেহেতু ইলিশ ক্যাফে, বলা যায় সেখানে ইলিশ উৎসব চলে সারা মৌসুম। প্রতিদিন বিভিন্ন স্থান থেকে মানুষজন আসেন। ৭২ ফুট অবিকল ইলিশ। রূপালি রঙ। চোখ টলটল। ছোট লেকের ভেতরে যেন জ্যান্ত ইলিশ। ভেতরে খাওয়া দাওয়া। সেমিনার কিংবা নানান অনুষ্ঠানাদিও হয় এখানে। ইলিশের সব উৎসবগুলো পালিত হয় এখানে।

বড়ো ইলিশের আইডিয়াটা এলো কীভাবে? জানতে চাইলে ইলিশ পার্কের কর্ণধার সাংবাদিক ও সংগঠক রুমান ইমতিয়াজ তুষার বলেন, ‘চাঁদপুরে ইলিশের বাড়ি আছে। সেটা মেঘনার পাড়ে। মেঘনা-তেঁতুলিয়ার বড় অংশ ইলিশ অভয়ারণ্য। সমুদ্রেও প্রচুর পরিমাণে ইলিশ পাওয়া যায়। কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতে পর্যটকদের দেখানোর মতো কোন প্রতীক নেই। সেই চিন্তা থেকেই আসলে ইলিশ পার্কের ধারণা আসে। ইলিশের ভাস্কর্য দেশের বিভিন্ন স্থানে থাকলেও ইলিশ ক্যাফে নেই কোথাও। ইলিশ ক্যাফে থেকেই পার্কের নাম দেওয়া হয়েছে ইলিশ পার্ক।’

সমুদ্র পাড়ের এই ইলিশ পার্ক ইলিশের ঐতিহ্য রক্ষা করে চলেছে। ইলিশ মৌসুম আসে, মাঝি-জেলের ঝুড়ি ভরে ইলিশে। বেচাকেনা, কারও ভালো থাকা, কারও মন্দ থাকা। ভোজন রসিকদের ইলিশের স্বাদ গ্রহণ আর ভ্রমণ পিসাসুদের খানিকটা ইলিশ পাড়ে বেড়িয়ে আসা। এরই মধ্যে কেটে যায় ইলিশ মৌসুম। কিন্তু এই যে ইলিশের বাড়ি, ইলিশ পার্ক, ইলিশ ভাস্কর্য- এগুলোই যেন ইলিশকে আমাদের মাঝে বাঁচিয়ে রাখে সারা মৌসুম।



রাইজিংবিডি/ঢাকা/১১ সেপ্টেম্বর ২০১৯/তারা

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন