RisingBD Online Bangla News Portal

ঢাকা     বৃহস্পতিবার   ০৩ ডিসেম্বর ২০২০ ||  অগ্রাহায়ণ ১৯ ১৪২৭ ||  ১৬ রবিউস সানি ১৪৪২

এখনো তার চোখ মাকেই খুঁজে বেড়াচ্ছে

শাহ মতিন টিপু || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ০৮:১৪, ১৩ নভেম্বর ২০১৯   আপডেট: ০৫:২২, ৩১ আগস্ট ২০২০
এখনো তার চোখ মাকেই খুঁজে বেড়াচ্ছে

সোমবার ভোররাতে কেয়ামত নেমে আসে দুই বছরের শিশু মাহিমার জীবনে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবায় মন্দবাগ রেলওয়ে স্টেশনে দুই ট্রেনে সংঘর্ষের পর সৃষ্ট করুণ দৃশ্য ছিল অসহনীয়।

গগণবিদারি চিৎকার, কান্না, শোরগোল, হতাহতদের নিয়ে ছোটাছুটি- এমন করুণ পরিস্থিতির মধ্যে আবিষ্কার হয় শিশু মাহিমা।

তূর্ণা নিশীথা ও উদয়ন এক্সপ্রেসের সংঘর্ষে ১৬ জন নিহত হন। এরমধ্যে একজন কাকলী বেগম। এ সময় মাথায় আঘাত পায় শিশু মাহিমাও।

শিশু মাহিমা বারবার কেঁদে কেঁদে বলছিল আম্মা আম্মা। এই শিশুটি জানে না তার মা কোথায়। ট্রেন দুর্ঘটনার পর স্থানীয়রা শিশুটিকে উদ্ধার করে অ্যাম্বুলেন্সে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর হাসপাতালে পাঠায়।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা সদর হাসপাতাল সূত্র জানায়, শুরুতে মাহিমার স্বজনদের পাওয়া যাচ্ছিল না। ওই সময় হাসপাতালে অচেনা মানুষজন দেখে হাউমাউ করে কাঁদছিল শিশুটি। আহত শিশুটিকে সকাল ৮টার দিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর হাসপাতালে আনার পর তার মাথায় দুটি সেলাই করে ডাক্তাররা। এর পর নার্সরা কোলে কোলে রাখে।

এ সময় শিশুটির কান্না থামছিল না। নার্সরা শিশুটিকে চকলেট ও চিপস দিয়ে কান্না থামান। এরপরও বারবার তার মাকে খুঁজছিল শিশু মাহিমা।

মঙ্গলবার দুপুর ২টার দিকে শাহ আলম নামের এক যুবক হাসপাতালে এসে দাবি করে শিশু মাহিমা তার ভাতিজি। এ সময় শিশুটির ফুফু আয়েশা বেগমও সঙ্গে আসেন। তারা চাঁদপুর থেকে খবর পেয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া হাসপাতালে ছুটে আসেন। সারা হাসপাতাল খুঁজে নার্সের কোলে শিশুটিকে পান। তারা জানান মাহিমার বাবার নাম মাইনুদ্দিন এবং মায়ের নাম কাকলী বেগম।

শিশুটি চাচাকে দেখেই তার কোলে চলে যায়। হাসপাতালের রেজিস্ট্রার খুঁজেও মা কাকলির খোঁজ মেলেনি বলে জানান চাচা।

শিশুটির আম্মা আম্মা চিৎকারে এ সময় হাসপাতালের নার্সসহ উপস্থিত অনেকেই চোখের পানি রাখতে পারেননি। দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত শিশুটির মায়ের খোঁজ মেলেনি। বিকাল ৩টার পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ শিশুটিকে তার চাচা ও ফুফুর হাতে বুঝিয়ে দেন।

রাতের ট্রেন দুর্ঘটনায় তছনছ হয়ে গেছে মাইনুদ্দিনের জীবন। ঢাকার একটি হোটেলে কাজ করা মাইনুদ্দিন আজ মঙ্গলবার দুর্ঘটনার খবর পেয়ে কসবায় যান। স্ত্রী কাকলিকে (২৮) খুঁজে পান কসবার বায়েক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে খোলা অস্থায়ী তথ্যকেন্দ্রের লাশের সারিতে। আর সন্তান মাহিমাকেও জীবিত খুঁজে পান।

মাইনুদ্দিন বলেন, রোববার সিলেটের হজরত শাহজালাল (রা.) ও হজরত শাহপরানের (রা.) মাজার জিয়ারত করতে যান তার স্ত্রী কাকলি, মেয়ে মাহিমা, মামা জাহাঙ্গীর মাল, মামি আমানত বেগম ও মামাতো বোন মরিয়ম। সোমবার সিলেট থেকে উদয়ন এক্সপ্রেস ট্রেনে করে চাঁদপুরের উদ্দেশে রওনা হন । চাঁদপুর থেকে ট্রলারে করে তাদের শরীয়তপুরের বাড়ি ফেরার কথা ছিল। কিন্তু দুর্ঘটনায় তার স্ত্রী, মামি ও মামাতো বোন মারা গেছে।

মাহিমাকে যখন ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়, তখন তার সঙ্গে কেউ ছিল না। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক শওকত হোসেন বলেন, সকালে আহত রাহিমা আক্তার নামের এক বৃদ্ধা ওই শিশুকে নিয়ে হাসপাতালে আসেন। রাহিমা চাঁদপুরের সাতিরাশির বাসিন্দা। তখন তিনি এই শিশুর নাম মাহিমা বলে জানান। রেজিস্টার্ড বইয়ে সেটিই উল্লেখ করা হয়। শিশুটির কপালের বাঁ পাশ থেকে মাথার পেছন অংশ পর্যন্ত ব্যান্ডেজ করা হয়েছে। কপালে সেলাই দেওয়া হয়েছে।

শিশু মাহিমা একে একে সবাইকে ফিরে পেলেও মাকে এখনো খুঁজে পায়নি। মা যে তার চিরদিনের জন্য হারিয়ে গেছে বুঝতে পারছে না সে। সবাইকে দিয়েও কি এক মায়ের অভাব পূরণ হবে তার! তার চোখ এখনো মাকেই খুঁজে বেড়াচ্ছে।

সূত্র: মন্দভাগ ট্রেন দুর্ঘটনার বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদন


ঢাকা/টিপু

রাইজিংবিডি.কম

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়