RisingBD Online Bangla News Portal

ঢাকা     বুধবার   ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০ ||  আশ্বিন ১৫ ১৪২৭ ||  ১২ সফর ১৪৪২

সিডরের এক যুগ

সিডর স্মরণে আজও কাঁদে উপকূল

খায়রুল বাশার আশিক || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১১:০৩, ১৪ নভেম্বর ২০১৯   আপডেট: ০৫:২২, ৩১ আগস্ট ২০২০
সিডর স্মরণে আজও কাঁদে উপকূল

‘নাতিডার লাশটাও খুঁইজা পাইলাম না। হেইদিনের কথা মনে মনে হইলে আর চোখ বুজতে পারি না। চোখ বুজলেই দেখি লাশ আর লাশ…।’

ছলছল চোখে দু’ফোটা জল গামছায় মুছতে মুছতে কথাগুলো বলছিলেন মোসলেম মিয়া। উপকূলীয় জেলা বরগুনার ৯নং এম বালিয়াতলি ইউনিয়নের বাসিন্দা তিনি। বয়স ৬০ পেরিয়েছে। সিডরে প্রথম স্ত্রীকে হারিয়ে দ্বিতীয় বিয়ে করতে হয়েছে তাকে। দ্বিতীয় স্ত্রী, ছেলে ও পুত্রবধূকে নিয়ে এখন তার সংসার।

মোসলেম মিয়া বলতে থাকেন, ‘বইন্যাডা (বন্যা) যে এত বড় হইবে বুঝতে পারিনায়, একেবারে নদীকূলে (নদী তীরবর্তী) গ্রাম বইলা এদিকে মাইক নিয়াও কেউ কিছু কয়নায়। পানি যে অপদা (বেড়িবাঁধ) পারাইতে পারব আন্দাজ করতে পারিনায়। পানি বাইড়া শেষমেশ ঘরকূলে (বেড়িবাঁধের ভেতরে) আইলো। আমাগো বাড়িতে ছিল গোটাচারেক ঘর। চারডা ঘর থেইকা ৭ জন মানুষ মইরা গেল। মাইয়া, নাতি, নিজের বউকে হারাইছি সেদিন।’

মোসলেম মিয়ার বাড়ির সামনেই সুবিশাল পায়রা নদী। নদীর ধারে বসে সেই সিডরের রাতে ঘটে যাওয়া কথাগুলো বলছিলেন তিনি। সিডরের পরে নতুন বধূ আর ঘর নিয়ে নতুন করে সুখী হবার চেষ্টা করেলেও সুখ যেন অধরাই থেকে গেল তার। কারণ আপনজন হারানোর ব্যথা তাকে সুখী হতে দেয়নি।

সিডর পেরেয়িছে আজ এক যুগ। মেয়ের ঘরের সেই নাতিকে হারিয়ে এই ১২ বছরে হাজারবার কেঁদেছেন মোসলেম মিয়া। নানা ভাই, নানা ভাই করে কোল জড়িয়ে থাকা সেই নাতিই যেন আজও মোসলেম মিয়াকে ডাকে পায়রা নদীর ঠিক মাঝ থেকে। নদীর দিকে মোসলেম মিয়া তাকায়, শতবার কিংবা হাজারবার তাকিয়েও আজও খুঁজে ফেরে জলে ভেসে যাওয়া সেই চাঁদমুখ। মোসলেম মিয়ার মনে হয়, নাতি বুঝি ডেকে ডেকে তার নানার কাছে আর্জি করছে, নানা ভাই- আমার মায়ের কবরের পাশে আমার কবরটা কি একটু দেয়া যায় না?

একই গ্রামে মোসলেম মিয়ার মতো আরেকজন বাসিন্দা সালেহা বেগম। ভয়াল সিডর নিয়ে তার গল্পটাও হৃদয় বিদারক। গ্রামের মানুষ তাকে সালামের মা বলেই চেনে। দুই কন্যা আর এক ছেলেকে নিয়ে সালেহা বেগমের সংসার। ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর ঘটে যাওয়া সুপার সাইক্লোন সিডরে মারা যায় সালামের বাবা। সিডরের দুদিন পরে ভাসমান লাশ খুঁজে পাওয়া যায় সালামের বাবার। ভাসমান সেই লাশের মাথাটা ছিল থেতলে যাওয়া। এলাকাবাসির ধারণা সেদিন রাতে কোনো গাছের আঘাত লেগেছিল সালামের বাবার মাথায়। সুপার সাইক্লোন সিডরের সেই দিনগুলোকে মনে করে আজও আঁতকে ওঠে সালেহা ও তার পুত্র সালাম।

বদলে যাবার নিয়মে প্রতিদিন বদলে যাচ্ছে দ্বীপ চরের মানুষগুলো। কিন্তু ভুলে যেতে পারেনি তাদের ফেলে আসা দিন। ভুলে যেতে পারে না সেই সিডরের ভয়াল রাত। সে সময়ের কথা মনে করে আজও ডুকরে কেঁদে ওঠে অনেকেই। পরিবার পরিজন হারানো মানুষগুলোর জন্য সিডরের এই দিনটি বছরান্তে ফিরে আসে স্বজনের নতুন একটি মৃত্যুবার্ষিকী হয়ে।

সিডরের আঘাতে, বাগেরহাট, পটুয়াখালী, পিরোজপুর ও বরগুনা জেলা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সরকারি হিসাব বলছে ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর সিডরে নিহত হয় ৩ হাজার ৪০৬ জন লোক, ১ হাজার ৩জন নিখোঁজ হয়, এছাড়া ৫৫ হাজার লোক মারাত্মক আহত হয়। এর মধ্যে শুধু বরগুনা জেলায় সরকারী হিসেব অনুযায়ী ১ হাজার ৩৪৫ জন নিহত হয়েছিল। তবে বে-সরকারী হিসেব অনুযায়ী নিহতের সংখ্যা প্রায় ২ হাজার।

এখানেই শেষ নয়, সিডর উপকূলে যে ছাপ রেখে গেছে তা মুছে ফেলা কষ্টসাধ্য। রাস্তাঘাট, বেড়িবাঁধ, গাছপালা ও জনজীবনে ফেলে গেছে ভয়াবহতার ছাপ। যার ফলে আজও কোনো বন্যা, জলোচ্ছ্বাস কিংবা বিপদ সংকেতের রাতগুলো উপকূলীয় মানুষের কাটে ঘুমহীন।

পূর্বাভাসগুলো আজও যেন তাদের কাছে বিপদের ধ্বনি। বন্যা ও জলোচ্ছ্বাসের খবর কানে এলেই উপকূলবাসীর মনে দেখা দেয় উৎকণ্ঠা। তাদের মনে বাজে বিপদের ঘণ্টা। ভয় হয় নতুন কোনো পারিবারিক সঙ্গীকে হারাবার। চলতে ফিরতে অক্ষম কিংবা বয়সের ভাড়ে কুঁজো হওয়া মানুষটি ভোগে চরম দুশ্চিন্তায়। চুন খেয়ে জিভ পোড়া ব্যক্তিটি যেমন করে দধি দেখলেও ভয় পায়, ঠিক তেমন করে বন্যা কিংবা জলোচ্ছ্বাসের পূর্বাভাসে ভয়ে থাকে উপকূলীয় এসব মানুষগুলো। সেই যে সিডর তাদের ভয় দেখিয়েছিল, কেড়ে নিয়েছিল স্বজন বা প্রতিবেশীদের সেই ভয় তাড়া করে ফিরছে আজও।

পরিবার পরিজন নিয়ে প্রস্তুত হয় আবার বেঁচে থাকার জন্য যুদ্ধ করতে। ঘরের চালা-বেড়ার খর কিংবা টিন যে কতটা নাজুক হয়ে আছে, তা নিয়ে যেমন নতুন চিন্তা শুরু হয়, তেমনি বড় ঝড়ে বেঁচে থাকার পূর্ব-প্রস্তুতি নেওয়াও তখন জরুরি হয়ে ওঠে। 

বিষণ্নতা, চিন্তায় অন্ধকার হয়ে ওঠে তাদের মুখ। নদী পাড়ের এই মানুষগুলো নদীর পানি, বাতাস আর আকাশ-বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে থাকে। অবস্থা দেখেই তারা আঁচ করতে পারে বন্যার অশুভ সংকেত তাদের জন্য কতটা বিপজ্জনক হতে পারে। আশা বেধে থাকা অনেকেই আজও আশা করে চেয়ে আছে এত বছর পরেও হয়তো ফিরে আসবে সিডরের রাতে নিখোঁজ হওয়া স্বজনেরা।


ঢাকা/মারুফ/তারা

রাইজিংবিডি.কম

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়