ঢাকা, শুক্রবার, ২৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

ঘরের বারান্দায় আসাদের পাঠাগার

জুনাইদ আল হাবিব : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-১১-৩০ ৮:২৩:১০ এএম     ||     আপডেট: ২০১৯-১১-৩০ ৪:২৮:৪৬ পিএম

বিখ্যাত বিজ্ঞানী। দুনিয়াজোড়া নাম। স্যার আইজ্যাক নিউটন। ছেলেবেলায় এতটাই চুপচাপ স্বভাবের ছিলেন যে, মায়ের ধারণা হলো, এই ছেলেকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না! তিনি নিউটনকে স্কুল থেকে ছাড়িয়ে এনে চাষাবাদের কাজে লাগিয়ে দিলেন।

নিউটনকে প্রতি শনিবার চাকরদের সঙ্গে হাটে যেতে হতো। কিন্তু নিউটনের মনে তখন অন্য খেয়াল। তিনি প্রায় দিনই হাট থেকে পালিয়ে পার্শ্ববর্তী এক পরিচিতজনের বাড়ি চলে যেতেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেল নিউটন সেই বাড়িতে যেতেন বই পড়তে। সেখানে চমৎকার একটি লাইব্রেরি ছিল। আর লাইব্রেরিতে একবার ঢুকলে নিউটন বইয়ের মধ্যে এতটাই ডুবে যেতেন যে, বাড়ি ফেরার কথা মনে থাকত না।

ঘটনা শুনে মা মুচকি হাসলেন। তার ভুল ভাঙল। তিনি নিউটনকে পুনরায় স্কুলে ভর্তি করে দিলেন।

নিউটনের মতোই ছেলেবেলা থেকেই বইয়ের মধ্যে একবার ডুব দিতে পারলে তার আর কিচ্ছু চাই না। এ কারণে বন্ধুরা বলেন ‘বই পোকা’। পরিচিতরা বলেন ‘বই পাগলা’। ঘনিষ্ঠজনেরা বলেন ‘পড়ুয়া’। আতিফ আসাদকে যে নামেই ডাকা হোক না কেন বই পড়ার নেশা তার ছাড়ে না! এই নেশার শুরু ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে। শুরুর দিকে একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার পাঠাগার থেকে বই ধার নিয়ে পড়তেন। মাধ্যমিকে স্কুলের লাইব্রেরির বই পড়েই দিন পাড় হতো। কিন্তু এরপরই বই আর আসাদের মধ্যে তৈরি হয় যোজন যোজন দূরত্ব। পড়ুয়া আসাদ বইয়ের শূন্যতা অনুভব করতে থাকেন। কী করা যায় ভাবতে ভাবতেই সিদ্ধান্ত নেন- গ্রামে তিনি নিজেই একটি পাঠাগার গড়ে তুলবেন।

বিষয়টি সমবয়সীদের সঙ্গে আলোচনা করলে তারা আসাদকে নিয়ে ঠাট্টায় মেতে উঠল। কিন্তু হাল ছাড়েননি তিনি। উপহাস থেকেই সাহস সঞ্চয় করলেন। বন্ধুরা বলত- আরে! এখন ইন্টারনেটে অনেক বই পড়া যায়। পাঠাগার দিয়ে কী হবে? যুক্তিটা ফেলে দেয়ার নয়। তাই বলে সেই কারণে হাত গুটিয়ে বসে থাকারও অর্থ হয় না। আসাদও বসে থাকেননি। এবার তিনি বিষয়টি নিয়ে বড়দের সঙ্গে কথা বলেন। বিশেষ করে বড় ভাই রবিউল ইসলাম মিলন আসাদের কথা শুনে পরামর্শ দিলেন- ঘরের বারান্দায় পাঠাগার করলে কেমন হয়?

তাই তো! আসাদের স্বপ্নের সুতোয় হঠাৎ আগুন জ্বলে উঠল। দুই ভাই মিলেই গড়ে তুললেন পাঠাগার। 

২০১৮ সালের ২৭ জুলাই আসাদের জীবনের সেই স্বপ্নপূরণের দিন। মাত্র ২০টি বই নিয়ে সরিষাবাড়ী উপজেলার ডোয়াইল ইউনিয়নের মাজালিয়ার প্রত্যন্ত গ্রাম হাসড়ায় আসাদের ঘরের বারান্দায় শুরু হয় পাঠাগারের পথচলা। গ্রামের মানুষের মধ্যে বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হলেও পাঠাগার প্রয়োজন। কেননা গ্রামাঞ্চলের মানুষ বই পড়তে চাইলেও টাকার অভাবে বই কিনে পড়তে পারেন না। বইপ্রেমী মানুষের মনের এই বেদনা একজন পাঠকই ভালো বুঝবেন। আসাদও বুঝেছিলেন। তার এই উদ্যোগের পেছনে এটাও ছিল কারণ। গ্রামের মানুষ এখন বিনা মূল্যে বই পড়তে পারছেন। পাঠকের বেশির ভাগই স্কুলপড়ুয়া ছেলেমেয়ে। পাঠাগার থেকে ধার নিয়ে বই পড়ার সুযোগও তিনি রেখেছেন।   

কিন্তু এরই মধ্যে আসাদের জীবনে নেমে আসে বড় দুর্যোগ। মেঘশূন্য দিনে হঠাৎ বজ্রপাত! জমি সংক্রান্ত বিরোধের জেরে খুন হলেন বড় ভাই মিলন। জীবনের এই সংকটে আসাদ পাঠাগারের সঙ্গে আরো নীবিড় হলেন। ভাইয়ের স্মৃতি এই পাঠাগারের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে! যে ভাই পাঠাগারের শুরু থেকেই সঙ্গে ছিলেন, সবসময় অনুপ্রেরণা দিতেন, উৎসাহ যোগাতেন তাঁকে কীভাবে ভুলে যাবেন তিনি? আসাদ পাঠাগারের সাইনবোর্ড থেকে মুছে ফেললেন নিজের নাম। নাম বদলে রাখলেন- শহীদ মিলন স্মৃতি পাঠাগার।

 

 

কিন্তু জীবন? তাকে চট করে বদলে ফেলার মন্ত্র আসাদের জানা নেই। উপরন্তু বড় ভাই মারা যাওয়ায় নিজের পড়াশোনার ভার নিজেকেই নিতে হলো। ঘরে বৃদ্ধ বাবা-মা। সাত ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছোট। চার বোনের আগেই বিয়ে হয়ে গেছে। চারজনের সংসারে নেমে এলো দারিদ্র্যের আঁধার। একটু আলোর সন্ধানে কখনো রাজমিস্ত্রী, কখনো-বা দিনমজুরের কাজ শুরু করলেন আসাদ। পাশাপাশি চলল পড়াশোনা। পরিবারের ভার নিতে আরেক ভাই আল আমিন নিলেন পেট্রল পাম্পে চাকরি। এভাবেই জীবনের সঙ্গে যুদ্ধ করে আসাদ এখন স্নাতক প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী। পড়ছেন জামালপুর সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজে উদ্ভিদ বিজ্ঞান নিয়ে। 

পাঠাগার গড়ার শুরু থেকেই গ্রামে গ্রামে সাইকেল চালিয়ে আসাদ পড়ুয়াদের কাছে বই পৌঁছে দিতেন। পড়া শেষ হলে নিজেই গিয়ে বই নিয়ে আসতেন। ফলে আশপাশের গ্রামে বই পড়ার আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ছে, অনেকে বই পড়তে চাইছেন, পড়ছেনও। আসাদের পাঠাগারে এখন বইয়ের সংখ্যা প্রায় পাঁচশ। আছে কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ, উপন্যাসের  পাশাপাশি রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতিসংশ্লিষ্ট বই।

সবুজ প্রামাণিক আসাদের খুব কাছের বন্ধু। একসঙ্গে লেখাপড়া করেন। আসাদ যখন কাজে ব্যস্ত থাকেন, বই নিয়ে এদিক-ওদিক যান; তখন পাঠাগারের দায়িত্বে থাকেন সবুজ। বই গুছিয়ে রাখা থেকে শুরু করে পাঠক এলে নামের তালিকা দেখে বই ধার দেয়া, ফেরত বইগুলো বুঝে নেয়া ইত্যাদি কাজ সামলে রাখেন। আসাদ জানান,  পাঠাগারে বসে পড়ার মতো তেমন ভালো পরিবেশ নেই। একটি ঘর পাওয়া গেলে ভালো হতো। কিন্তু আমার পক্ষে তা সম্ভব নয়। বইয়ের তাকগুলো বাড়ির গাছের কাঠ কেটে বানিয়েছি। বারান্দায় পাটকাঠির বেড়া দিয়ে ঘর বানিয়েছি। এখন একটি স্টিলের বুক সেলফ আছে। বানিয়ে দিয়েছেন গ্যাসটন ব্যাটারিজ লিমিটেডের নির্বাহী পরিচালক। ফেসবুকে পরিচয়। তিনি গত জুলাই মাসে একশটি বইও উপহার দিয়েছেন। তার মতো অনেকেই সাহায্য করছেন। ভিয়েতনামে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত সামিনা নাজ দিয়েছেন পাঁচ হাজার টাকা।

পাঠাগার তো হলো, এরপর কী? আসাদ জানালেন, যত কষ্টই হোক, লেখাপড়া চালিয়ে যাবেন। ভাত না খেয়ে থাকতে পারবেন, পড়াশোনা বাদ দিবেন না। পাশাপাশি তিনি চান, প্রত্যেক গ্রামে একটি করে পাঠাগার গড়ে উঠুক। বই পড়ার আন্দোলন বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়ুক। জাগরণ সৃষ্টি হোক। এখন এটাই আসাদের একমাত্র স্বপ্ন- একদিন চৌষট্টি হাজার পাঠাগারের দেশ হবে বাংলাদেশ। লাখ লাখ ছেলেমেয়ে বসে বসে শুধু বই পড়বে।

আসাদ বলেন, ‘একাডেমিক বইগুলো শুধু যোগ্যতার জন্য। পৃথিবীকে জানতে হলে, চারদিকের সব তথ্য জানত হলে, ভালো মানুষ হতে হলেও বই পড়ার বিকল্প নেই। তাই সবার উদ্দেশ্যে একটিই কথা- বই পড়ুন, পড়ুন এবং পড়ুন।’ মহামতী এরিস্টটল ঠিক এই কথাই বলেছিলেন- জীবনে তিনটি জিনিসের প্রয়োজন- বই বই এবং বই।



ঢাকা/তারা

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন