ঢাকা, বুধবার, ৭ মাঘ ১৪২৬, ২২ জানুয়ারি ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

প্রথম প্রেম যেভাবে ভুলেছিলেন সু চি

খালেদ সাইফুল্লাহ : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-১২-১২ ১:৫২:৪০ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-১২-২১ ১২:৫৩:২৭ পিএম
স্বামী মাইকেল অরিসের সঙ্গে সন্তানসহ সু চি (১৯৭৩)

পাকিস্তানের এক তরুণ কূটনীতিক। অক্সফোর্ডে পড়ছেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বৃত্তি নিয়ে তিনি সেখানে গিয়েছেন উচ্চতর ডিগ্রী নেয়ার জন্য। ধর্মে মুসলিম; দেখতে সুদর্শন, সুঠাম ও দীর্ঘদেহী। নাম তারিক হায়দার। অন্যদিকে মিয়ানমারের এক তরুণী অং সান সু চি। তিনিও পড়তে গিয়েছেন অক্সফোর্ডের সেন্ট হিউ কলেজে। তার পাঠ্য বিষয় দর্শন। যদিও তার আগ্রহ ইংরেজি ও ফরেস্ট্রি।  কিন্তু ভাগ্য ততটা সুপ্রসন্ন হয়নি। তাই দর্শন নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে।

হঠাৎ কোনো ভূমিকা ছাড়াই এই দুই তরুণ-তরুণীর কথা কেন বলছি? কারণ, তারাও কোনোরূপ ভূমিকা ছাড়াই জড়িয়েছিলেন প্রেমের সম্পর্কে। দুজনের মধ্যে সাদৃশ্যের জায়গা হলো- উভয়েই পশ্চিমে গিয়েছেন পড়তে। কিন্তু তাদের ধর্ম, বর্ণ, সংস্কৃতি সবকিছুই বিপরীত। তাতে কী? প্রেম তো বাধা মানে না। ফলে এগুলোর কোনোটিই বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি তাদের সম্পর্কের মাঝে।

সময়টা গত শতাব্দীর ষাটের দশকের। সু চি তখন দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। পরিবারের ধরাবাঁধা নিয়মের বাইরে সেই প্রথম। এর আগে দিল্লীতে লেডি শ্রীরাম কলেজে পড়াশোনা করেছেন রাজনীতি বিষয়ে। দিল্লীতে তার মা ছিলেন মিয়ানমারের হাইকমিশনার। মা সবসময় চোখে চোখে রেখেছেন মেয়েকে। সুদূর অক্সফোর্ডে সে উপায় নেই। সেখানে গিয়ে ট্রাডিশনাল পোশাক ছেড়ে সু চি পশ্চিমের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে গায়ে চড়িয়েছেন পশ্চিমা পোশাক। টাইট জিন্স কিংবা স্কার্টে তাকে বেশ মানাত। তবে আড়ালে টিপ্পনি কাটতে ছাড়েনি দেশীয় বন্ধুরা! সু চি এসব ভাবতেন না। উল্টো তার লাবণ্যে মুগ্ধ অসংখ্য তরুণ।

সু চির সেই লাবণ্যময়ী চেহারার আড়ালে যে হৃদয়, সেখানে জায়গা করে নিলেন পাকিস্তানী তরুণ তারিক হায়দার। সু চির মায়ের সঙ্গে তারিকের পেশাগত মিল আছে বলেই হয়ত দুজনের কাছাকাছি আসতে সুবিধে হয়েছিল। কিন্তু শুধু কি কাছাকাছি আসা! তারিকের প্রেমে তখন হাবুডুবু খেতে লাগলেন সু চি। বিখ্যাত লেখক ও সাংবাদিক পিটার পপহ্যাম সু চির জীবনীগ্রন্থ ‘দি লেডি অ্যান্ড দি পিকক: দি লাইফ অব অং সান সু চি অব বার্মা’য় লিখেছেন: ‘এটি সত্যিই বেশ আশ্চর্যজনক যে সংস্কৃতিগতভাবে অনেক পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও কীভাবে সু চি তারেক হায়দারের সঙ্গে আবিষ্ট হয়েছিলেন গভীর প্রেমে।’

সু চি তারিকের প্রেমে এতটাই মজেছিলেন যে, তার যেকোন আবদার তিনি রাখতে প্রস্তুত ছিলেন। এমনকি কারো সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করতে হলে সেটিও! পশ্চিমে যওয়ার আগে সু চি দিল্লীতে পড়ালেখা করেছেন। সেই সুবাদে ভারতীয় সংস্কৃতি ও মানুষের সঙ্গে তার পূর্ব পরিচয় ছিল। অক্সফোর্ডে থাকাকালীন তিনি ভারতীয় বন্ধুদের সঙ্গে মিশতে স্বাচ্ছন্দবোধ করতেন। কিন্তু ১৯৬৫ সালে শুরু হলো ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ। সে যুদ্ধের হাওয়া লাগে সু চি’র প্রেমে। ভারতীয়দের সঙ্গে পাকিস্তানীদের সম্পর্কের এই টানাপোড়েনে প্রেমিক তারিক হায়দারকে খুশি রাখতে সু চি ভারতীয় বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেন। তাদের সঙ্গে ওঠা-বসা থেকে শুরু করে কথা বলাও বন্ধ করে দেন। সু চি’র এহেন কার্যকলাপ থেকেই আন্দাজ করা যায় তার প্রেমের গভীরতা।

তারিকের প্রেমে সু চি’র দশা এমন যে, পড়াশোনায়ও ভাটা পড়েছে ততদিনে। পরীক্ষার ফল অন্তত তা-ই বলে। শেষ পর্যন্ত তৃতীয় বিভাগে পাশ করেন তিনি। দুঃখজনক হলো, পরীক্ষার ফলের ন্যায় সু চি’র প্রেমও যে ভেতরে ভেতরে অন্তঃসারশূন্য হয়ে পড়বে তা কে জানতো! শেক্সপিয়র বলেছিলেন, ‘সত্যিকার প্রেমের পথ কখনও মসৃণ হয় না।’ আমরা লাইলী-মজনু, রোমিও-জুলিয়েট কিংবা শরৎ-এর দেবদাসের প্রেম কাহিনী থেকেই এর প্রমাণ পাই। সু চি’র প্রেমও শেষ পর্যন্ত স্থায়িত্ব পায়নি। অক্সফোর্ডের পাঠ চুকিয়ে তারিক প্রস্তুতি নেন দেশে ফিরে আসার।

উচ্চাভিলাষী তারিক পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের চাকরি আর প্রেমিকাকে দেয়া ওয়াদার মধ্যে হিসেব কষে চাকরিতে যোগ দিতে ফিরে আসেন নিজ দেশে। এক মুহূর্তেই সু চি’র স্বপ্নভঙ্গ হয়। মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন তিনি। কয়েকমাস তার প্রেমিকের শোকে অশ্রু বিসর্জন দিতেই কেটে যায়। সু চির জীবনীকার পপহ্যাম লিখেছেন: ‘সু চি প্রায় বছরখানেক সময় বিরহে কাটিয়েছেন তারিক হায়দারের জন্য, সে সময় তিনি ছিলেন শোকে মুহ্যমান ও বিধ্বস্ত।’

প্রেমে ব্যর্থ হয়ে সু চি যখন ভেঙে পড়েছেন সেই মুহূর্তে তার পারিবারিক বন্ধু স্যার পলগর বুথ ও মিসেস বুথের পুত্র ক্রিস্টোফারের মাধ্যমে পরিচয় হয় তিব্বতের সংস্কৃতি বিশেষজ্ঞ মাইকেল আরিসের সঙ্গে। এসময় সু চি জাতিসংঘে বেশ কিছুদিন কাজ করেন। ১৯৭২ সালে আরিসের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন অং সান সু চি। ভুলে যান প্রথম প্রেমের ব্যথা।

 

ঢাকা/তারা