ঢাকা, মঙ্গলবার, ৭ মাঘ ১৪২৬, ২১ জানুয়ারি ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

স্মৃতিসৌধ নাকি শহীদ মিনার?

খালেদ সাইফুল্লাহ : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-১২-১৩ ১:৫৩:৫৯ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-১২-১৩ ৬:৫০:০২ পিএম

রাজধানীর মিরপুর মাজার রোডে প্রায় তিনবছর রিকশা চালান বজলুর রহমান। রিকশার দিকে দু’কদম এগিয়ে যেতেই জানতে চাইলেন, ‘কই যাইবেন?’ উত্তরে বুদ্ধিজীবী কবরস্থানের কথা বলতেই তিনি পাল্টা প্রশ্ন করলেন, ‘শহীদ মিনার?’

শুধু বজলুর রহমান নন, এলাকার মুদি দোকানদার থেকে শুরু করে শিক্ষিত-অশিক্ষিত সব শ্রেণির মানুষ মিরপুরের ‘শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ’কে ‘শহীদ মিনার’ বলেই জানেন! শহীদ মিনার শব্দটি তারা স্মৃতিসৌধের সমার্থক করে তুলেছেন দৈনন্দিন জীবনে।

১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসে শত্রুদের পরাজয় নিশ্চিত হয়ে যায়। পাকিস্তান সেনাবাহিনী এদেশীয় রাজাকারদের যোগসাজশে পরাজয়ের আগে দেশকে মেধাশূন্য করার নীলনকশা  আঁকে। তারা চেয়েছিল স্বাধীন এই জাতি যেন অস্থিমজ্জাশূন্য হয়ে পড়ে। সে লক্ষ্যেই তারা এদেশের শিক্ষাবিদ, অধ্যাপক, চিকিৎসক, দার্শনিক, লেখক-কবি সাংবাদিককে হত্যা করে। স্বাধীনতার মাত্র দুদিন আগে ১৪ ডিসেম্বর শুধু ঢাকা থেকেই দুইশ জনেরও বেশি বুদ্ধিজীবীকে ধরে আনা হয়। তাদের মিরপুর, মোহাম্মদপুর, রাজারবাগসহ শহরের বিভিন্ন স্থানে জড়ো করে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। বুদ্ধিজীবী হত্যার মূল পরিকল্পনায় ছিলেন মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী। এবং এই ঘৃণ্য কাজে সহায়তা করে আলবদর, আলশামস ও রাজাকার বাহিনীর নেতা ও সদস্যরা।

পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ২৫ মার্চ নির্বিচারে গণহত্যা শুরু করে বাংলাদেশের মাটিতে। সেদিনও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কয়েকজন শীর্ষ অধ্যাপককে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। গবেষক রফিকুল ইসলাম ‘স্বাধীনতা সংগ্রামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন: ‘মিরপুর বধ্যভূমির খোঁজ পেয়েছিলাম স্বাধীনতার অনেক দিন পর। পুলিশের একজন ডিএসপি’র সহায়তায় পূর্ব পাকিস্তান সড়ক পরিবহন সংস্থার যে গাড়িতে বুদ্ধিজীবীদের তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল সেই ড্রাইভারকে টাঙ্গাইলের গ্রামাঞ্চল থেকে ঢাকায় এনে তার সাহায্যে জায়গা সনাক্ত করে লাশগুলি আমরা তুলে নিয়ে আসি।... আমরা রায়ের বাজার বধ্যভূমি ও মিরপুর গোরস্থানসংলগ্ন গণকবর থেকে ঢাকা মেডিকেল মর্গে লাশ এনে সনাক্ত করে তাদের দাফন-কাফন ও সৎকারের ব্যবস্থা করেছি।’

পরের বছর অর্থাৎ ১৯৭২ সালের ১৪ ডিসেম্বর প্রথম শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস পালন করা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের উদ্যোগে। পরবর্তী বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অনুরোধে মিরপুরে শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ নির্মিত হয়, যা উদ্বোধন করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। রফিকুল ইসলাম লিখেছেন: ‘আমাদের শুধু শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস পালন নয়, বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য আত্মাহুতি দেয়া বুদ্ধিজীবীদের স্মৃতি ভাস্বর করে রাখার জন্য প্রতীক চাই!’

 

 

শুধু বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ নয়, মিরপুর-এক-এ রয়েছে বুদ্ধিজীবী কবরস্থান। স্বাধীন বাংলাদেশের বরেণ্য বুদ্ধিজীবীদের এখানে সমাহিত করা হয়েছে সর্বোচ্চ মর্যাদায়। তা সত্ত্বেও স্থানীয়দের মাঝে এটি পরিচিতি পেয়েছে ‘শহীদ মিনার’ হিসেবে। যদিও শহীদ মিনার ও স্মৃতিসৌধের মধ্যে পারিভাষিক পার্থক্য রয়েছে। বাংলাদেশে মূলত ১৯৫২ সালে শহীদদের স্মরণে নির্মিত সৌধকে শহীদ মিনার বলা হয়। অন্যদিকে স্মৃতিসৌধ বলা হয় মুক্তিযুদ্ধের বীরদের স্মরণে নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যপক ড. মোহাম্মদ আজম বলেন, ‘শব্দ দুটির শাব্দিক অর্থ কাছাকাছি হলেও আমাদের কাছে এগুলোর শাব্দিক অর্থের চাইতে ব্যবহারিক অর্থ গুরুত্ববহ হয়ে উঠেছে। তাই এ দুটি পরিভাষার ঐতিহাসিকভাবে ব্যবহারিক অর্থই ধর্তব্য হিসেবে গণ্য হয়। শহীদ মিনার শুধুমাত্র একুশে ফেব্রুয়ারি শহীদদের সম্মানে নির্মিত স্থাপনাকে বোঝায়। অন্যদিকে স্মৃতিসৌধ মূলত স্বাধীনতা যুদ্ধের সাথে জড়িত। আবার যেকোন কিছুর স্মরণে নির্মিত স্থাপনাকেই স্মৃতিসৌধ বলা যায়। তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে শব্দ দুটি টার্মিনোলজিতে পরিণত হয়েছে।’

মিরপুর সরকারি কবরস্থানের অদূরে বুদ্ধিজীবীদের গণহত্যার স্থানটিতে নির্মিত হয়েছে শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ। একসময় এখানে যথেষ্ট নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকায় জায়গাটি ছিল দুষ্কৃতকারীদের দখলে। তবে নিরাপত্তা প্রহরী নিযুক্ত করাসহ জায়গাটি সুজজ্জিত করার পর থেকে স্থানীয়রা এখানে আসেন সময় কাটানোর জন্য। বিশেষ করে বিকেলে জায়গাটি পার্কের রূপ নেয়।মোঃ বাচ্চু মিয়া নামে এক রিকশা চালক বলেন, ‘আমি এখানে রিকশা চালাই প্রায় এক বছর। শুরুতে এ এলাকায় এসে শহীদ মিনার বললে বুদ্ধিজীবী কবরস্থানের গেটেই নামিয়ে দিতে হতো। কিন্তু আমি জানতাম শহীদ মিনার ঢাকা মেডিকেলের পাশে। আবার এখানকার গেটে লেখা দেখি- স্মৃতিসৌধ। তাই তখন একটু সন্দেহ হতো। তবে সবাই এই জায়গাকে শহীদ মিনার বলে। আমিও তাই বলি।’

অনেকে আবার বুদ্ধিজীবী শহীদ মিনারও বলেন। স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর আবু তাহের বলেন, ‘আমরা বুঝতে শেখার পর থেকে শহীদ মিনার বলতে শুনেছি। যদিও নামফলক ও অন্যান্য কাগজপত্রে বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ লেখা রয়েছে। তারপরও সচেতনতার অভাবে এটি শহীদ মিনার হিসেবেই প্রচলিত হয়ে গেছে।’



ঢাকা/তারা