RisingBD Online Bangla News Portal

ঢাকা     বুধবার   ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০ ||  আশ্বিন ১৫ ১৪২৭ ||  ১২ সফর ১৪৪২

‘হগলরে তাঁবু দেয়া হইছে। অনেকে বিক্রি কইরা দিছে।’

খালেদ সাইফুল্লাহ || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ০৭:২৯, ১১ জানুয়ারি ২০২০   আপডেট: ০৫:২২, ৩১ আগস্ট ২০২০
‘হগলরে তাঁবু দেয়া হইছে। অনেকে বিক্রি কইরা দিছে।’

প্রচণ্ড শীতের রাত। চারদিকে ঘন কুয়াশা। কুয়াশা ভেদ করে মধ্যরাত পর্যন্ত গাড়ির আনাগোনা চলে ঢাকা শহরের ব্যস্ত সড়কে। ছেলেবুড়ো সকলেরই ঘরে ফেরার তাড়া। ঘরেও শীতের দাপট। কিন্তু যাদের ঘর নেই! ফুটপাতের এককোণে জায়গা করে নেয় তারা। কখনো পা দিয়ে মাড়িয়ে চলে যায় পথচারী, আবার কখনো দ্রুতগতির ইঞ্জিনের বিকট শব্দে ঘুম ভেঙে যায়। কিন্তু হাড় কাঁপানো শীত তার চেয়েও শক্তিশালী। শীত উপেক্ষা করেই গুটিসুটি হয়ে ফুটপাতে শুয়ে থাকেন তারা।

রাজধানীর কারওয়ান বাজার, মগবাজার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, সুপ্রিম কোর্ট লাগোয়া রাস্তার ফুটপাতে রাতের নিত্যকার চিত্র এটি। এদের মধ্যে যারা রিকশাচালক রিকশাতেই তাদের রাত কেটে যায়। কেউ বা তরকারীর ঝুড়িতে, আবার কেউ ভ্যানগাড়ির ওপর ঘুমিয়ে রাত কাটায়। এদের কারো পেশা ভিক্ষাবৃত্তি, কারো দেহব্যবসা আবার কেউ টোকাই। ঘরহারা মানুষগুলো শীত উপেক্ষা করে প্রতিনিয়ত করে বেঁচে থাকার সংগ্রাম। দারিদ্র্যের তাড়না ঘরছাড়া করেছে তাদের। শীত তাড়ানোর জন্য তাদের কাছে প্রায় কিছুই নেই।

নিন্মবিত্তের এই কষ্টে এগিয়ে আসে উচ্চবিত্ত। কখনো একটি কম্বল কিংবা গরম কাপড় দিয়ে পাশে দাঁড়ায়। বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন কিংবা ব্যক্তির এই দাক্ষিণ্যই তাদের ভরসা। তাইতো শীতের কাপড় বিতরণের নাম শুনলেই উর্দ্ধশ্বাসে ছুটে যায় তারা। দেরী হলেই ফসকে যাওয়ার আশঙ্কা প্রবল। তবে এসব দান-দক্ষিণা থেকে তারা অধিকাংশই পেয়ে থাকেন কম্বল। কম্বল দিয়ে শরীর ঢাকলেও খোলা আকাশই তাদের আশ্রয়স্থল। তাই এইসব শীতার্তদের পাশে ব্যতিক্রমী সাহায্যের হাত বাড়িয়েছে মোটরবাইক রাইডারদের ফেইসবুক গ্রুপ ইয়ামাহা রাইডার ক্লাব। ঢাকার বেশ কয়েকটি স্থানে তারা শীতার্তদের মাঝে কম্বল ছাড়াও বিতরণ করেছে পানিরোধী তাঁবু। তাঁবু পানিরোধী হওয়ায় ভেদ করে বাতাস ঢোকার সুযোগ নেই। ফলে এগুলো যেমন শীত থেকে সুরক্ষা দেবে অসহায় মানুষকে, তেমনি বৃষ্টির হাত থেকেও রক্ষা করবে।

ইয়ামাহা রাইডার ক্লাবের তাঁবু ও কম্বল বিতরণ কর্মসূচী শুরু হয়েছে বৃহস্পতিবার রাতে। শুক্রবার মধ্যরাতের কর্মসূচীতে অংশ নিয়েছেন ইয়ামাহা মোটরবাইকের অ্যাম্বাসেডর বাংলাদেশের টেস্ট ও টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট দলের অধিনায়ক সাকিব আল হাসান। এছাড়াও এসিআই মোটরস-এর এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর সুব্রত রঞ্জন দাসসহ টিম ইয়ামাহার সদস্যরা।

দোয়েল চত্বরের পাশেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠসংলগ্ন রাস্তার ফুটপাতে বাস্তুহারা একদল মানুষ রাত্রিযাপন করেন। বৃহস্পতিবার রাতে রাইডার ক্লাবের দেয়া তাঁবু পেয়েছে তারাও। তবে দিন যেতে না-যেতেই বদলে গেছে সেখানকার দৃশ্য। শুক্রবার রাত অবধি সেখানকার অধিকাংশ মানুষকে আবার দেখা গেল খোলা আকাশের নিচে। সেখানে তাঁবু রয়েছে মাত্র দুটি। একই পরিবারের পাঁচজন সদস্যের জন্য তাঁবু দুটি পেয়েছেন রুমা বেগমের পরিবার। তিনি জানান, পরিবারসহ তারা থাকতেন টঙ্গীতে। স্বামী নেশাগ্রস্ত হওয়ায় বাড়ি ভাড়ার টাকা দিতে পারেন না। ফলে বর্তমানে তারা অবস্থান করছেন দোয়েল চত্বরের পাশে। কোম্পানির লোকজন তাদের তাঁবুগুলো দিয়ে যায়। তিনি বলেন, ‘এহানে যারা আছে হগলরে তাঁবু দেয়া হইছে। অনেকে বিক্রি কইরা দিছে।’

রুমা বেগমের পরিবারের পাশেই থাকেন জয়তুন বিবি। বয়স ষাটের ঘরে। নদীভাঙ্গনের কবলে পড়ে ঝালকাঠি থেকে ঢাকা এসেছেন। থাকেন রমনা পার্কের পাশেই ওভারব্রিজের নিচে বস্তিতে। রাত কাটান দোয়েল চত্বরের পাশে। তিনিও পেয়েছেন বাইকারদের দেয়া তাঁবু। তবে তাকে দেখা গেল খোলা আকাশের নিচে বসে থাকতে। তিনি জানালেন, তাঁবুটি তিনি ঘরে রেখে এসেছেন। রাতে ঘরে না থেকে খোলা আকাশের নিচে থাকার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এহানে রাইতে কম্বল দিতে আইসে মানুষ। রাস্তায় না থাকলে পাওয়া যায় না।’ এবছর এখন পর্যন্ত তিনটি কম্বল পেয়েছেন তিনি। নিজের প্রয়োজন না থাকায় সেগুলো বিক্রি করে দিয়েছেন তিনি। 

রোকসানা বেগমও দীর্ঘদিন রাত্রিযাপন করছেন এখানেই। স্বামীর সঙ্গে যোগাযোগ নেই। জীবিকা নির্বাহের জন্য তিনি মেসে রান্নার কাজ করেন। ইয়ামাহার তাঁবু পাওয়ার কথা তিনি প্রথমে স্বীকার না করলেও জেরার মুখে পরে জানালেন তিনিও পেয়েছেন। তবে তারও দিনের আবাসস্থল সেখানে নয়। তিনি থাকেন হাইকোর্টের পাশে। এখানে রাত কাটান কম্বল পাওয়ার আশায়।

ফারুক সরকার নামে এক ব্যক্তি রাত্রিযাপন করেন সেখানে। রাস্তার বোতল কুড়িয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন। তিনি জানান, আগের রাতে তিনি গ্রামের বাড়িতে যাওয়ায় তাঁবু পাননি। তবে এবছর তার কম্বলের সংখ্যা অর্ধশত ছাড়িয়েছে। বকশিবাজার এলাকা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা থেকে তিনি পেয়েছেন সর্বমোট ৬৩টি কম্বল। এসব কম্বল তিনি বিক্রি না করে আত্মীয়-স্বজনকে দিয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেন, প্রচণ্ড শীতে খোলা জায়গায় যে শীত লাগে তা থেকে রক্ষার জন্য অন্তত তিনটি কম্বল দরকার হয়। তাই এখানে যারা কম্বল পায় তারা সেগুলো বিক্রি করতে পারে না। তবে যারা নেশা করে তাদের কিছু দিলে সেগুলো বিক্রি করে দেয়।



ঢাকা/তারা

রাইজিংবিডি.কম

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়