ঢাকা, সোমবার, ৪ ফাল্গুন ১৪২৬, ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

যমুনার কালাসোনায় হারিয়ে যাওয়া সাংবাদিক

শাহ মতিন টিপু : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০১-১৮ ১০:৩৭:০৫ এএম     ||     আপডেট: ২০২০-০১-১৮ ১০:৩৭:০৫ এএম

সাংবাদিকতায় একটু ব্যতিক্রমী ছিলেন তিনি। গ্রামে-গঞ্জে, পথে পথে ঘুরে খবরের পেছনে থাকা খবর সংগ্রহ করে লিখতেন। যা ছিল দেশের সাংবাদিকতার ইতিহাসে এক নতুন মাত্রা।

চষে বেড়িয়েছেন উত্তরবঙ্গের মাঠের পর মাঠ, গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে। ছুটে গেছেন শেকড়ে থাকা ঘটনা সংশ্লিষ্ট মানুষটির সন্ধানে। কথা বলেছেন, একেবারে শেকড় থেকে তিনি সৃষ্টি করেছেন সংবাদ ভাষ্য, প্রতিবেদন, ফিচার। এই জন্য তিনি সবার কাছে চারণ সাংবাদিক।

এই চারণ সাংবাদিক মোনাজাত উদ্দিন এর ৭২তম জন্মদিন আজ। ১৯৪৯ সালের ১৮ জানুয়ারি রংপুর শহরে তার জন্ম।

যা কেউ দেখেননি, তিনি তা তুলে ধরতেন। বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের জনজীবনের সমস্যা, সম্ভাবনা ও মানবিক অনুভবের নানাদিক তিনি তার লেখনিতে ধারণ করেছেন। বলা হয়, তার প্রতিটি প্রতিবেদনই ছিল গ্রাম বাংলার অকৃত্রিম চিত্র আর মানুষ ও সমাজের বাস্তব মুখচ্ছবি। জীবদ্দশায় তিনি নিজেকে ‘তৃণমূল মানুষের সংবাদকর্মী’হিসাবে দাবি করতেন ।

মূলত তিনি দৈনিক সংবাদে পথ থেকে পথে ধারাবাহিক রিপোর্টের জন্য খ্যাতি লাভ করেন। শুধু সাংবাদিকই নন তিনি নিজেই হয়ে উঠেছিলেন একটি প্রতিষ্ঠান।

মোনাজাত উদ্দিন এর সাংবাদিকতা শুরু ১৯৬৬ সালে তিনি দৈনিক আজাদ পত্রিকা দিয়ে। এরপর নিজের প্রকাশনায় দৈনিক রংপুর প্রকাশিত হয়। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের মার্চে স্বাধীন চিন্তা, বিশ্বাস আর আদর্শের ভিত্তিতে প্রকাশ করেন ‘দৈনিক রংপুর’। শুধুমাত্র স্থানীয় সংবাদের ভিত্তিতে তিনি এই পত্রিকাটি বের করার চিন্তা করেন। ‘দৈনিক রংপুর’ ছিল মিনি সাইজের পত্রিকা, দাম মাত্র পাঁচ পয়সা। পত্রিকাটি প্রকাশের জন্য আর্থিক সহযোগিতা করতেন একজন স্থানীয় ব্যবসায়ী। জানা যায়, বাহ্যিকভাবে সেই ব্যবসায়ীকে সৎ মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে তিনি তা ছিলেন না। যে কারণে তার সঙ্গে মোনাজাত উদ্দিনের সম্পর্কের ইতি ঘটে। অবধারিতভাবেই পত্রিকাটির প্রকাশনা বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু লেখালেখির সাথে তার বিচ্ছেদ ঘটেনি মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত।

১৯৭৬ সালে দৈনিক সংবাদে যোগ দেয়ার পর থেকে তিনি মিলে মিশে একাকার হয়ে গিয়েছিলেন পত্রিকাটির সাথে। বিশ বছর একটানা ‘সংবাদ’ এ কাজ করার পরে ১৯৯৫ সালের ২৪ এপ্রিল দৈনিক জনকণ্ঠে সিনিয়র রিপোর্টার হিসেবে যোগদান করেন ।

তার সম্পর্কে প্রখ্যাত সাংবাদিক ও কলামিস্ট সন্তোষ গুপ্ত’র মন্তব্য- ‘মোনাজাত উদ্দিনের সংবাদ সংগ্রহের স্টাইল ও নিষ্ঠা জড়িয়ে গিয়েছিল; কোথাও ভঙ্গী দিয়ে চোখ ভোলানোর আয়োজন ছিল না। অনুসন্ধানী প্রতিবেদন, ফলোআপ প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি অনন্যতার স্বাক্ষর রেখেছেন। গ্রাম বাংলার জনজীবনের একটা নিখুঁত তথ্য নির্ভর এবং একই সঙ্গে সংবেদনশীল দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা ও চিত্ররূপময় বর্ণনা এবং চিত্র তিনি দেশবাসীকে উপহার দিয়েছেন খবরের মাধ্যমে।’

কাজের নিষ্ঠতার জন্য অনেক সম্মাননাও পেয়েছিলেন তিনি। মোনাজাত উদ্দিন ১৯৮৪ সালে ‘সাংবাদিক জহুর হোসেন চৌধুরী স্মৃতি পদক’, দৈনিক সংবাদে প্রকাশিত ‘মানুষ ও সমাজ’ প্রতিবেদনের জন্য সালে ফিলিপস্ পুরস্কার, বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অফ ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স পুরস্কার, ১৯৯৫ সালে অশোকা ফেলোশিপ লাভ করেন। ১৯৯৭ সালে তিনি রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ পদক একুশে পদক (মরনোত্তর) লাভ করেন।

সাংবাদিকতার পাশাপাশি সমাজসেবামূলক কাজেও অংশগ্রহণ ছিল তার। গ্রামীণ এলাকায় মানুষের কুসংস্কার, অন্ধতা দূর করতে তিনি তরুণদের নিয়ে সংগঠন করেছেন। কখনো তাদের নিয়ে নাটক করিয়েছেন, উৎসাহ দিয়েছেন সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তুলতে। তিনি নিজেও ছিলেন একজন গীতিকার ও নাট্যকার। রংপুর বেতারে নিয়মিত কাজ করতেন। তার একাধিক নাটক মঞ্চস্থ হয়েছে। যদিও চারুশিল্পে তার তেমন কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল না কিন্তু নিজের অধ্যাবসায়ের ফলে তিনি অনেক বই ও ছোট কাগজের প্রচ্ছদ করেছেন। ছিলেন দক্ষ ফটোগ্রাফারও।

রিপোর্টিং ছাড়াও গল্প, কবিতা, ছড়া ও নাটক রচনায় তার দক্ষতা ছিল। মৃত্যুর আগে ৯টি ও পরে ২টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে তার। পাশাপাশি লিখেছেন জীবনের অভিজ্ঞতা সমৃদ্ধ নানা ঘটনা। তার বইগুলোর মধ্যে রয়েছে-‘পথ থেকে পথে’, ‘সংবাদ নেপথ্য’, ‘কানসোনার মুখ’, ‘পায়রাবন্দের শেকড় সংবাদ’,  ‘নিজস্ব রিপোর্ট’,  ‘ছোট ছোট গল্প’,  ‘অনুসন্ধানী রিপোর্ট’: গ্রামীণ পর্যায়’,  ‘চিলমারীর এক যুগ’,  ‘শাহ আলম ও মজিবরের কাহিনী’,  ‘লক্ষীটারী’,  ‘কাগজের মানুষেরা’। এছাড়াও মাসিক মোহাম্মদি, দৈনিক আজাদ, সওগাত ও অন্যান্য পত্র-পত্রিকায় তাঁর বেশ কয়েকটি গল্প প্রকাশিত হয়। নাটকের একমাত্র প্রকাশিত বই ‘রাজা কাহিনী’। তিনি প্রচুর ছড়াও লিখেছেন।

ব্যক্তিগত জীবনে মোনাজাত উদ্দিন নাসিমা আক্তার ইতির সঙ্গে ১৯৭০ সালের ১৪ ডিসেম্বর বিয়ে করেন। এই দম্পতির দুই মেয়ে ও এক ছেলে। বড় কণ্যা মাহফুজা মাহমুদ চৈতি ও ফেরদৌস সিঁথি পেশায় চিকিৎসক। তার ছেলে আবু ওবায়েদ জাফর সাদিক সুবর্ণ বুয়েটের শিক্ষার্থী ছিলেন। সে তৃতীয় বর্ষের ছাত্র থাকাবস্থায় ১৯৯৭ সালে তিনি আত্মহত্যা করেন।

পথে প্রান্তরের অনুসন্ধানে গিয়ে জীবনেরও যবনিকা ঘটে এই বরেণ্য সাংবাদিকের। ১৯৯৫ সালের ২৯ ডিসেম্বর ফুলছড়ি থানাধীন যমুনা নদীতে কালাসোনার ড্রেজিং পয়েন্টে দু’টি নৌকাডুবির তথ্যানুসন্ধান করতে অসুস্থ শরীর নিয়ে যাত্রা শুরু করেন গাইবান্ধায়। যাবার পথে ‘শেরেবাংলা’ নামক ফেরিতেই তিনি দুর্ঘটনার মুখে পতিত হন। ফেরির ছাদ থেকে হঠাৎ করেই পানিতে পড়ে যান। স্থানীয় নৌকার মাঝিরা তাঁর দেহ তাৎক্ষনিকভাবে উদ্ধার করতে পারলেও তাকে বাঁচানো যায়নি। ধারণা করা হয়, পানিতে পড়ার সাথে সাথেই তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। ৩০ ডিসেম্বর রংপুর শহরের মুন্সী পাড়া কবরস্থানে দাফন করা হয়।

তিনি তার কর্মের মাধ্যমেই অমর হয়ে আছেন আমাদের হৃদয়ের মণিকোঠায়।



ঢাকা/টিপু