ঢাকা, রবিবার, ১৪ চৈত্র ১৪২৬, ২৯ মার্চ ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

‘শোষণমুক্ত অসাম্প্রদায়িক দেশের স্বপ্ন দেখি’

কেএমএ হাসনাত : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০২-২৩ ৮:০৭:৩২ এএম     ||     আপডেট: ২০২০-০২-২৩ ১১:৫৫:১২ এএম

একাদশ শ্রেণির একজন ছাত্রী মাতৃভাষা অধিকার আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন প্রতিভা মুৎসুদ্দী। কতটা দেশপ্রেমীক আর সমাজ সচেতন হলে এমন ঝুঁকি নেয়া যায় সেটাই প্রমাণ করেছেন তিনি।

সমাজ যখন অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে তখনই মহান সৃষ্টিকর্তার আশীর্বাদ নিয়ে কিছু কিছু মানুষ এই ধরাধামে অবতীর্ণ হন। এরা ক্ষণজন্মা। পাপ-পঙ্কিলতা থেকে মানুষকে উদ্ধার করে আলোর পথে নিয়ে আসার জন্য নিবেদিত হন এসব মহাপ্রাণ মানুষগুলো।

এমনই একজন হলেন ভাষাসৈনিক অধ্যক্ষা প্রতিভা মুৎসুদ্দী। তিনি মানুষ গড়ার কারিগর এবং মানুষ গড়ার কাজে নিজেকে উৎসর্গ করেছেন। শিক্ষক জীবন থেকে অবসর নিলেও ৮৪ বছর বয়সেও তিনি শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছেন। তার হাতে গড়া হাজার হাজার ছাত্রী আজ দেশ-বিদেশে স্বমহিমায় উদ্ভাসিত, নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে আলো ছড়াচ্ছেন।

প্রতিভা মুৎসুদ্দী ১৯৩৫ সালের ১৬ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম জেলার রাউজান উপজেলার মহামুনী পাহাড়তলী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা কিরণ বিকাশ মুৎসুদ্দী ওই সময়ের একজন প্রতিষ্ঠিত আইনজীবী ছিলেন। মা শৈলবালা মুৎসুদ্দী ছিলেন গৃহিণী।

শৈশবে তার শিক্ষাজীবন শুরু হয় গ্রামের পাঠশালাতে। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, দেশভাগ, ভাষার দাবিতে আন্দোলনের সময়ে বেড়ে উঠেছেন প্রতিভা মুৎসুদ্দী। তার শিক্ষাজীবনের সময়টি ছিল সমাজের অবহেলিত ও নির্যাতিত জনগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষায় সোচ্চারের বেগবান সময়।

১৯৫১ সালে তিনি চট্টগ্রামের ডা. খাস্তগীর স্কুল থেকে প্রথম বিভাগে মেট্রিক পাস করেন। এরপর চট্টগ্রাম কলেজ থেকে প্রথম বিভাগে আইএ পাস করেন। এ সময়   দেশব্যাপী উত্তাল ভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে পড়েন।

১৯৫৪ সলে তিনি চট্টগ্রাম কলেজ থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক (সম্মান) ১ম বর্ষ সম্পন্ন করেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে আসেন এবং এখান থেকে ১৯৫৬ সনে অর্থনীতিতে স্নাতক (সম্মান) ডিগ্রি লাভ করেন।

তার রাজনীতিতে হাতে খড়ি গ্রামের স্কুলে। কলেজ জীবনে ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে ঘনিষ্ঠ হয়েছেন বাম রাজনীতিতে। জড়িয়ে পড়েন বিভিন্ন সেবা ও কল্যাণধর্মী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে।

ভাষা আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় স্বাধীকার আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন তিনি। ১৯৫৫ সালে স্বাধীকার আন্দোলনের এক মিছিল থেকে প্রতিভা মুৎসুদ্দী গ্রেফতার হন। দুই সপ্তাহ কারাভোগের পর মুক্ত হন।

বামপন্থী এই নেত্রী ১৯৫৫-১৯৫৬ শিক্ষাবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রসংসদের (ডাকসু) মহিলা মিলনায়তন সম্পাদিকা নির্বাচিত হন। তিনি ১৯৫৬-১৯৫৭ সালে রোকেয়া হলের (তৎকালীন উইমেন্স হল) প্রথম নির্বাচিত সহ-সভানেত্রীও (ভিপি) ছিলেন।

রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেও ১৯৫৬ সালে অর্থনীতিতে স্নাতক (সম্মান), ১৯৫৯ সালে একই বিষয়ে এমএ ডিগ্রি লাভ করেন। এছাড়া ১৯৬০ সালে ময়মনসিংহ মহিলা টিচার্স ট্রেনিং কলেজ থেকে বিএড ডিগ্রি লাভ করেন। এরপর প্রতিভা মুৎসুদ্দী নারী শিক্ষার প্রসার ও তাদের স্বাবলম্বী করার কাজে নেমে পড়েন।

কর্মজীবনে প্রতিভা মুৎসুদ্দী একজন শিক্ষক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। তিনি ১৯৬০ সালে কক্সবাজার বালিকা বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষিকা পদে যোগ দেন। ১৯৬২ সালে জয়দেবপুর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে (বর্তমানে গাজীপুর সরকারি উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়) প্রধান শিক্ষিকার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এখানে আমলাতান্ত্রিক হস্তক্ষেপ তাকে ক্ষুব্ধ করে। আর্তপীড়িত ও মানবতার সেবায় নিবেদিত দানবীর রণদা প্রসাদ সাহা নারী শিক্ষার পাদপীঠ ভারতেশ্বরী হোমস স্কুলের সঙ্গে কলেজ সংযোজন করেন। এ সময় তিনি ভারতেশ্বরী হোমস থেকে ডাক পান।

প্রথমদিকে তিনি রাজি না হলেও সহস্রাধিক ছাত্রীর আবাসিক প্রতিষ্ঠানটিকে তিনি নারী শিক্ষার আবাস হিসেবে গড়ে তুলতে এখানে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এখানকার ছাত্রীদের মাধ্যমে তিনি দেশের সর্বত্র শিক্ষার আলো জ্বালাতে ১৯৬৩ সালে ভারতেশ্বরী হোমসে অর্থনীতি বিভাগে প্রভাষিকা হিসেবে কাজে যোগ দেন।

প্রতিভা মুৎসুদ্দী এখানেও তার প্রতিভার স্বাক্ষর রাখেন। এই প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা রণদা প্রসাদ সাহার নজরে পড়েন। তারই একান্ত ইচ্ছায় ১৯৬৫ সালে তিনি ভারতেশ্বরী হোমসের অধ্যক্ষার পদ গ্রহণ করেন। দীর্ঘ ৩৩ বছর এই পদে নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের পর ১৯৯৮ সালে তিনি অবসর গ্রহণ করেন।

তার সময়ে ভারতেশ্বরী হোমস ১৯৮৭ সালে স্কুল হিসেবে এবং ১৯৯৫ সালে কলেজ হিসেবে দেশ সেরার মর্যাদা পায়। দেশ বিদেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের হাজার হাজার ছাত্রী দায়িত্ব পালন করছেন। যাদের বেশিরভাগই এই মহীয়ষী নারীর সান্নিধ্যে ধন্য হয়েছেন।

মানবতাবাদী ও শিক্ষার জন্য নিবেদিতপ্রাণ এই নারীকে বহু সংগঠন সম্মাননা দিয়েছে। ১৯৮৭ সালে ‘বেইস’ থেকে ‘আজিজুর রহমান পাটোয়ারী’ পদক, ১৯৯৫ সালে ‘অনন্যা শীর্ষ দশ-১৯৯৫’ পদক, ১৯৯৬ সালে ‘লায়ন নজরুল ইসলাম’ শিক্ষা স্বর্ণপদক, ১৯৯৮ সালে আন্তর্জাতিক রোটারি ফাউন্ডেশনের ‘Paul Harris Fellow’, ১৯৯৯ সালে চারুলতা পরিবার তাকে সম্মাননা প্রদান করে।

২০০০ সালে বাংলাদেশ বৌদ্ধ একাডেমি (চট্টগ্রাম) থেকে ‘বৌদ্ধ একাডেমি পুরস্কার’, ২০০১ সালে লায়ন ক্লাব চট্টগ্রাম থেকে বিশেষ সম্মাননা, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ হিসেবে ২০০২ সালে ২১শে পদক লাভ করেন।

২০০৩ সালে ইন্টারন্যাশনাল ব্রাদারহুড মিশন কর্তৃক ‘ধর্মবীর’ পদকপ্রাপ্ত হন তিনি। ২০০৫ সালে টাঙ্গাইলের ছায়ানীড় কর্তৃক ‘ছায়ানীড় স্বর্ণপদক’ ও ২০০৬ সালে বাংলাদেশ বৌদ্ধ কৃষ্টি প্রচার সংঘ কর্তৃক ‘বিশুদ্ধানন্দ স্বর্ণ পদক’ এ ভূষিত হন।

২০১০ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগ শিক্ষাবিদ হিসেবে সম্মাননা প্রদান করে। ডেমোক্রেসি ওয়াচ আজীবন নারী শিক্ষা ও সেবা কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত এ শিক্ষাবিদকে ২০১১ সালে সম্মাননা প্রদান করে। ওই বছরই বাংলাদেশ উদীচী শিল্পী গোষ্ঠী চট্টগ্রাম জেলা সংসদ তার শিক্ষার প্রসারে আত্মনিবেদিত প্রয়াস ও সুদীর্ঘ কর্মোদ্দীপনাকে শ্রদ্ধা জানিয়ে সম্মাননা জানায়।

২০১৫ সালে স্বদেশ চিন্তা সংঘ ‘ড. আহমদ শরীফ স্মারক পুরস্কার’ ও বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ দ্বাদশ জাতীয় সম্মেলন উপলক্ষে ‘কবি সুফিয়া কামাল সম্মাননা’য় সম্মানিত করে ভাষাসৈনিক প্রতিভা মুৎসুদ্দীকে। এছাড়া সমাজসেবক ও আলোকিত জীবনের আহ্বানকারী এই ভাষা সৈনিক আরো অনেক পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন।

অবসর জীবনেও এখনো প্রতিভা মুৎসুদ্দী দানবীর শহীদ রণদা প্রসাদ সাহা প্রতিষ্ঠিত কুমুদিনী ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট অব বেঙ্গল (বাংলাদেশ) লিমিটেডের একজন পরিচালক হিসেবে কাজ করে যাচ্ছেন। তিনি বর্তমানে এ সংস্থার শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। ভারতেশ্বরী হোমস কুমুদিনী উইমেন্স মেডিক্যাল কলেজ, কুমুদিনী নার্সিং স্কুল ও কলেজের মতো নারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় প্রত্যক্ষ ভূমিকা রেখে চলেছেন। ভারতেশ্বরী হোমসের অধ্যক্ষা থাকাকালীন তিনি ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের সদস্য হিসেবে দেশের শিক্ষা প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।

অধ্যক্ষা প্রতিভা মুৎসুদ্দী অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসাবে ১৯৭২ সাল থেকে কুমুদিনী ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের মির্জাপুর কুমুদিনী কমপ্লেক্সের প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করে আসছেন।

কোমলে কঠোরে প্রতিভা মুৎসুদ্দী একজন অনন্য মানুষ। তার প্রাতিষ্ঠানিক কঠিনতম নির্বাহী আদেশও মানবিক কোমলতায় সিক্ত বৃহত্তর মানবতার কল্যাণে নিবেদিত। তিনি সব সময়ই প্রচার বিমুখ।

প্রতিভা মুৎসুদ্দী মনে করেন, যে চেতনা নিয়ে সেদিন ভাষা আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন, তা আজও পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়ন হয়নি। দেশ স্বাধীন হয়েছে, এটি অনেক বড় পাওয়া। তবে শোষণমুক্ত, ধর্ম নিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তোলার মাধ্যমে সুখী ও সমৃদ্ধ দেশ গড়ে শহীদদের আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তিনি শোষণমুক্ত, অসাম্প্রদায়িক সোনার বাংলা গড়ে তুলতে এখনো তিনি স্বপ্ন দেখেন। আর এটা সম্ভব বলেও তিনি মনে করেন। 

 

ঢাকা/হাসনাত/সাইফ