ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১ শ্রাবণ ১৪২৭, ১৬ জুলাই ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

করোনাকালে বন্দি দুরন্ত শৈশব

রফিকুল ইসলাম মন্টু : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০৪-২৬ ১০:২৯:২৬ এএম     ||     আপডেট: ২০২০-০৪-২৬ ১:২৮:৫৬ পিএম

এ এক ক্রান্তিকাল এসেছে আজ। করোনাসৃষ্ট দুর্যোগে ভালো নেই কেউ। প্রকৃতির নিয়ম সবই ঠিক আছে- সূর্য উঠছে, ডুবছে। নদীতে বইছে স্রোতধারা। জোয়ারের জল গড়াচ্ছে তীব্রস্রোতে। নিয়ম ভেঙেছে শুধু জনজীবনের ধারাবাহিকতায়। এর প্রভাব পড়েছে শিশুদের জীবনেও। গৃহবন্দি আজ দুরন্ত শৈশব। নিষেধের বেড়াজালে এসেছে দুঃসময়। পাল্টে গেছে শিশুর দৈনন্দিন জীবন। প্রভাব পড়ছে শিক্ষায়, চাপ বেড়েছে মননে। এই করোনাকালে কেমন আছে প্রান্তিকের শিশুরা? এ নিয়ে তিন পর্বের ধারাবাহিকের আজ প্রথম পর্ব

নীরবতা; অকল্পনীয় দৃশ্যপট! সবখানে বারণ। এটা করা যাবে না, ওটা করা যাবে না, ওখানে যাওয়া যাবে না- দিনভর বড়দের মুখে শুনতে হয় হাজারটা নিষেধ-বাক্য। বিকেলের খেলার মাঠে বন্ধুদের ভিড় নেই। চায়ের দোকানে সিনেমা দেখার আড্ডা নেই। গোধূলি বেলায় ছোটাছুটি নেই। খেলাধুলা সব ঘরে; কিংবা ঘরের আশপাশে। তাই সান্ধ্যকালীন মায়ের গলায় ডাকও নেই। পরের দিনে ক্লাসের জন্য হোমওয়ার্কের ব্যস্ততা নেই। কেমন যেন গুমোট ভাব। চারদিকে আতঙ্ক! ঘরের বাইরে খুব একটা যাওয়ার সুযোগ নেই, প্রয়োজনও নেই। ক্ষুদে জীবনে এমন নিষেধাজ্ঞায় তারা কখনো পড়েনি। শৈশবের দুরন্তপনায় হঠাৎই যেন ছেদ পড়েছে। কেউ কখনো ভাবেনি শিশুদের এভাবে ঘরবন্দি থাকতে হবে। ওরা ভাবতেই পারছে না, ক্লাসের ফাঁকে সহপাঠীদের সঙ্গে আড্ডায় মেতে ওঠার সময়টা কোথায় হারিয়ে গেল? শহর ছাড়িয়ে বন্দিদশার এই ঢেউ এসে পৌঁছেছে প্রান্তিকে। উপকূলের বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে পাওয়া গেল অন্যরকম এক চেহারা।

পঞ্চম শ্রেণী পড়–য়া হাসনাইনের দুরন্তপনায় ছেদ পড়েছে। রোজ তিনটি খাল পেরিয়ে, বর্ষা হলে কাদাপানি মাড়িয়ে, সে স্কুলে যায় বটে; কিন্তু তার মাঝেও যে কত আনন্দ; কাউকে বোঝাতে পারে না হাসনাইন। বাবার সঙ্গে আলাপের সময় ওর খবর নিয়ে জানতে পারি, তার দৈনন্দিন রুটিন। হাসনাইন ভালো নেই। তার পড়ায় মন নেই। শৈশবে সে এক অবরুদ্ধ জীবন পার করছে; যা কখনো সে কল্পনাই করেনি। হাসনাইন জানাল, স্কুল, খেলার মাঠ, নদীর তীরের কথা খুব মনে পড়ে। সহপাঠী বন্ধুদের সঙ্গে দেখা নেই অনেকদিন। ওদের কথা মনে পড়ে।  

হাসনাইনের বাড়ি দ্বীপ জেলা ভোলার ছোট্ট দ্বীপ মদনপুর। মেঘনার ঢেউয়ের সঙ্গে মিলেমিশে বেড়ে ওঠে এখানকার শিশুরা। শুধু কী স্কুল! ক্লাসের ফাঁকে ওদের জীবনে কত গল্প রয়েছে। বন্ধুর সঙ্গে গলাগলি করে হাটে যাওয়া, মাঠে ঘুরে বেড়ানো, খেলাধুলা। জোয়ারের পানিতে ঘোলা জলে ডুবসাঁতারের আনন্দ ওদের জীবনকে আরো রাঙিয়ে দেয়। স্কুলে না যাওয়া শিশুও হাজারটা রঙিন স্বপ্নে বিভোর থাকে। একজন হয়তো স্কুল ছুটি হলে ঘুড়ি উড়াতে ছুটে যায় মাঠের পানে; আরেকজন জালনৌকা গুছিয়ে চা-দোকানে ছোট্ট টিভি পর্দায় অপলক চোখে তাকিয়ে থাকে। প্রান্তিকের এই শিশুরা অন্যরকম এক জগতে বেড়ে ওঠে। এখানে আছে জীবনের সঙ্গে লড়াই, সংগ্রাম। আছে প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ। কাদামাটিতে পথ চলা, খেলাধুলা, জোয়ারের জলে ভিজে এ-পাড়া থেকে ও-পাড়ায় যাওয়া এখানকার নিত্যছবি। এসবের মাঝেও উপকূলের প্রান্তিকের শিশুরা বেড়ে ওঠে নির্মল দূষণমুক্ত পরিবেশে। চা-দোকানে রঙিন সিনেমার গল্পের সঙ্গে ওদের জীবনের কোনো অংশেরই হয়তো মিল নেই। তা সত্ত্বেও সাময়িক ওরা স্বপ্নে বিভোর হয়ে থাকে। রঙিন প্রজাপতির ওড়াউড়ি, দোয়েল পাখির গান, বাতাসে টকটকে রাঙা জবা ফুলের দোল খাওয়া, আর সবুজ খোলা মাঠে রাখালের গরু চড়ানো দেখতে দেখতেই বেড়ে ওঠে এই জনপদের শিশুরা। কিন্তু এখন থমকে যাওয়া জীবন! করোনা সবকিছু বদলে দিয়েছে।

এই দ্বীপের কিশোরী রুবিনা আক্তারকে চিনি, পঞ্চম পেরিয়ে ষষ্ঠতে উঠেছে। ওর বাবা মোশাররফ হোসেনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, করোনার কারণে রুবিনার স্কুল বন্ধ, ঘরের বাইরেও খুব একটা যেতে পারে না। করোনার ভীতি আছে পরিবারে। রুবিনার সহপাঠীদেরও একই অবস্থা। ঘর থেকে নিষেধাজ্ঞা বেড়েছে। বাবা-মায়েরা আগের চেয়ে কড়াকড়ি বাড়িয়ে দিয়েছে। এভাবেই করোনা বদলে দিয়েছে উপকূলীয় জেলা লক্ষ্মীপুরের চর আবদুল্লাহ’র তেলির চরের জাহের মাঝি, আলাউদ্দিন মাস্টার, চম্পা বেগম, জান্নাত বেগম, শাহীনূর বেগমের ছেলেমেয়েদের জীবন। যে শিশুরা বাইরে কাজ করতো; তাদেরও চলাফেরা বন্ধ। রোজ বিকালে এই দ্বীপের শিশু-কিশোরদের এখন আর বাজারের আড্ডায় যাওয়া হয় না। চেয়ারম্যান বাজার, কামাল বাজার, জনতা বাজার সবই সীমিত আকারে চলছে। এলাকার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠে এখন আর শিশুদের পা পড়ে না। মেঠো পথে ডাংগুলি খেলা, মার্বেল খেলা, বৌচি খেলায় মেতে ওঠে না শিশুরা। এখন আর সাইকেলের পুরনো টায়ার নিয়ে দীর্ঘ পথে দৌড়ানো হয় না ওদের। রঙিন শৈশবটা এখন শুধুই সাদাকালো। 

দ্বীপ জেলা ভোলার দ্বীপ ইউনিয়ন ঢালচরের প্রবীণ বাসিন্দা সাইফুল হক হাজী বলেন, উপকূলীয় জনপদ হিসেবে দ্বীপের শিশুরা নানা রকম দুর্যোগের মুখোমুখি হয়। জোয়ারের পানি, জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড়ের তা-ব এই দ্বীপের শিশুরা দেখেছে। এমনকী নদী ভাঙনের মতো বিধ্বংসী দুর্যোগের সঙ্গেও ওরা পরিচিত। কিন্তু বিশ^জুড়ে করোনাভাইরাসের যে ছোবল বাংলাদেশে পড়েছে; তার প্রভাব অন্যান্য স্থানের মতো এই দ্বীপের শিশুদের ওপরও প্রচ-ভাবে পড়েছে। সঠিক বার্তা ওদের কাছে যাচ্ছে না বলে ওরা যেন একটু বেশিই ভীত। এই দ্বীপের দুই বন্ধু রাজীব-সজিবের গল্প লিখেছিলাম। দুজনই কর্মজীবী। কর্মজীবী হলেও ওদেরও মুক্ত জীবনটা হঠাৎ থমকে গেছে।  

ভোলার দ্বীপ ইউনিয়ন মদনপুরের চেয়ারম্যান নাছির উদ্দিন নান্নু বলেন, করোনার নিষেধাজ্ঞার কারণে সবকিছুই তো অচল হয়ে গেছে। এ অবস্থায় ছোটদের ওপর প্রভাব পড়া খুবই স্বাভাবিক। শহরের মতো অতটা আবদ্ধ হয়তো নয় ওরা; কিন্তু একটা আতঙ্ক তো রয়েছেই। আমরা সকলকে যতটা সম্ভব সতর্ক থাকতে বলেছি। একই দ্বীপের বাসিন্দা শফিক মাল জানালেন, তার দুই ছেলেমেয়ে স্কুলে পড়ে। তিনি অবস্থার ব্যাখ্যা দিলেন এভাবে, ‘অবাধে উড়ে বেড়ানো পাখিকে হঠাৎ খাঁচায় বন্দি করলে যে দশা হয়; শিশুদের অবস্থা এখন অনেকটা সেরকম। এটা তো ওদের পরিবেশ নয়।’

রঙিন স্বপ্নের ডানায় ভর করে বেড়ে ওঠা প্রান্তিকের শিশুদের পায়ে যেন হঠাৎই শেকল পড়েছে। বদ্ধ ঘরে বসে কারো মনে পড়ে বটতলার সেই বড় শেকড় দুটোর কথা! কারও-বা মনে পড়ে কাচারি বাড়ির সান বাঁধানো পুকুর ঘাটের কথা! কবে স্কুল খুলবে? কবে বন্ধুদের সঙ্গে আবার আড্ডা হবে? কবে দুঃসময় কাটবে? তবেই না মুক্তি পাবে শৈশব। প্রান্তিকের শিশুদের মনে এই প্রশ্নগুলোই ঘুরপাক খাচ্ছে।


ঢাকা/তারা