RisingBD Online Bangla News Portal

ঢাকা     বুধবার   ২৮ অক্টোবর ২০২০ ||  কার্তিক ১৩ ১৪২৭ ||  ১১ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

আম্ফান আতঙ্ক পশ্চিম উপকূলে

রফিকুল ইসলাম মন্টু || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ০৬:৫৬, ১৮ মে ২০২০   আপডেট: ১০:৩৯, ২৫ আগস্ট ২০২০
আম্ফান আতঙ্ক পশ্চিম উপকূলে

এমন নাজুক বেড়িবাঁধে বেড়েছে আতঙ্ক

এগারো বছর আগে ঘূর্ণিঝড় আইলার প্রলয়ের পর উঠে দাঁড়াতে পারেনি দেশের পশ্চিম উপকূল। সেই ক্ষতে বারবার আঘাত হেনেছে ঘূর্ণিঝড়। মাত্র ছ’মাস আগে বুলবুল, এক বছর আগে ফণীর গতি ছিলো এদিকেই। প্রাকৃতিক দেয়াল সুন্দরবন বুক পেতে সয়েছে সব বাধা। একই পথে ঘূর্ণিঝড় আম্ফান আসার খবরে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে এ অঞ্চলে। নাজুক পূর্বপ্রস্তুতি এই আতঙ্ক আরও বাড়িয়ে তুলেছে।

সুন্দরবন লাগোয়া তিনটি উপকূলীয় জেলা খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা জেলার প্রান্তিকের বহু জনপদ দুর্যোগের আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত। একবার দুর্যোগ এলে উঠে দাঁড়াতে সময় লাগে যুগের পর যুগ। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অবস্থা স্বাভাবিক হওয়ার সুযোগ থাকে না। প্রাকৃতিক দুর্যোগে লবণ পানি যেসব এলাকা ভাসিয়েছে; সেখানে আর ফসল হচ্ছে না। সবুজ শূন্য হয়েছে অনেক জনপদ। পেশা বদলে গেছে সেই জনপদের বাসিন্দাদের। সুপেয় খাবার পানির সংকট তীব্র হয়েছে। ওদিকে সিডর যেখানে আঘাত করেছিল; সেই শরণখোলার গাবতলা, বগী এলাকার মানুষের মাঝেও আতঙ্ক রয়েছে। সেখানে নির্মাণাধীন বাঁধ ধসে পড়ছে বারবার।

পূর্ব প্রস্তুতির এই নড়বড়ে চিত্র সামনে রেখে ঘূর্ণিঝড় আম্ফান এগিয়ে আসছে পশ্চিম উপকূলের দিকে। যদিও সতর্কতা জারি হয়েছে সমগ্র উপকূলে। কিন্তু মধ্য-উপকূল কিংবা পূর্ব-উপকূল থেকে পশ্চিম উপকূলের বেড়িবাঁধের ধরন আলাদা। এ এলাকার বাঁধগুলো নিচু এবং সরু। ফলে ছোটখাট ধাক্কাতেই ধসে যায়। 

কয়রার বাসিন্দা আখতারুল আলম সৌরভ মুঠোফোনে জানাচ্ছিলেন, উপজেলার দশালিয়া, উত্তর মদিনাবাদ, গোবরা, ঘাটাখালী, হরিণখোলা, কাঠকাটা, বেতবুনিয়া, ঘড়িলাল, গোলাখালী, আংটিহারা, চরামুখা এলাকার বেড়িবাঁধের অবস্থা খুবই নাজুক। বেশ কয়েকদিন আগে পূর্ণিমার জোয়ারে বেড়িবাঁধ ধসে লোকালয় ডুবে যাওয়ার উপক্রম হলে স্থানীয় বাসিন্দারা স্বেচ্ছাশ্রমে বাঁধ মেরামত করেছে। বর্ষাকালে এই এলাকার মানুষ চরম ঝুঁকিতে থাকে। বাঁধ মেরামতের বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের আশ্বাস পাওয়া গেলেও কোনো কাজ হয়নি। এভাবে চলে যায় বছরের পর বছর।

কথা হচ্ছিল ইউনিয়ন চেয়ারম্যান শামসুর রহমানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ইউনিয়নের সাড়ে ২৭ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ রয়েছে। এর মধ্যে ১৫ কিলোমিটার অত্যন্ত নাজুক। বেড়িবাঁধ এভাবে নাজুক অবস্থায় রেখে দুর্যোগের ঝুঁকি মোকাবিলা কীভাবে সম্ভব? সূত্র বলছে, কয়রা উপজেলা সদর থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে সুন্দরবন লাগোয়া দক্ষিণ বেদকাশী ইউনিয়ন। সেখানকার বেড়িবাঁধের অবস্থা খুবই নাজুক। জোয়ারের পানিতেই বাঁধ ছুইছুই পানি ওঠে। ঘূর্ণিঝড় ফণী, বুলবুলের আঘাতে এলাকার মানুষ চরম আতঙ্কে ছিলো। বুলবুলে এলাকায় ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছিল। মাছের ঘেরে ঢুকে পড়েছিল নোনা পানি।

শ্যামনগরের দ্বীপ ইউনিয়ন গাবুরার অবস্থা শোচনীয় সেই ২০০৯ সালে আইলার পর থেকে। কপোতাক্ষ ও খোলপেটুয়া নদীর তীর ঘেরা বাঁধগুলো এতটাই নাজুক যে কোনো কোনো এলাকা ধসে যেতে পারে জোয়ারের পানির ধাক্কাতেই। এসব এলাকায় ঘূর্ণিঝড়ের খবর আতঙ্ক কয়েকগুন বাড়িয়ে তুলেছে। গাবুরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জি এম মাসুদুল আলম বলছিলেন, আমরা বহু আশ্বাস শুনেছি। ফণী ও বুলবুলের পর দু’-দু’বার মন্ত্রী এসেছেন, সচিব এসেছেন। অনেক পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন; কিন্তু এখন পর্যন্ত সেসবের কিছুই বাস্তবায়ন হয়নি। যেটুকু হয়েছে মেরামত বা জোড়াতালি।

একই সুরে কথা বলছিলেন সাতক্ষীরার আরেক ইউনিয়ন বুড়িগোয়ালিনীর চেয়ারম্যান ভবতোষ কুমার মন্ডল। তিনি বলেন, ঘূর্ণিঝড় আসার খবরেই আমরা নড়েচড়ে বসি। আসার আগে তড়িঘড়ি করে সব কাজ করার চেষ্টা করি। কিন্তু ঘূর্ণিঝড় চলে গেলে আর কিছু মনে থাকে না। উপর মহল আমাদের কাছে জরুরি আদেশ পাঠিয়েই খালাস। বাজেট বরাদ্দ আসবে কিনা খবর থাকে না। অথচ কাজগুলো আমাদের করে যেতে হয়।

বাগেরহাটের শরণখোলায় প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় সিডর আঘাত হেনেছিল ২০০৭ সালে। বেশ কয়েক বছর পরে উপজেলার চারদিকে শক্ত-উঁচু বেড়িবাঁধ নির্মিত হলেও সংকট রয়েই গেছে। বগী ও গাবতলা এলাকায় বাঁধ নির্মাণ সম্পন্ন করা যাচ্ছে না। বারবার ধসে যাচ্ছে। আর সেই সঙ্গে প্লাবিত হচ্ছে গ্রামের পর গ্রাম। আম্ফানের খবর এলাকার মানুষকে আতঙ্কিত করে তুলছে।

এখন পর্যন্ত যতদূর জানা যাচ্ছে, আম্ফানের আঘাত লাগতে পারে পশ্চিমবঙ্গে উপকূলীয় তটে। একটু বাঁক নিয়ে বাংলাদেশমূখী হলে ক্ষতির পরিমাণ বাড়বে। তবে বাংলাদেশ কিংবা ভারত যেখানেই আঘাত লাগুক না কেন, সুন্দরবন এবং এর সংলগ্ন এলাকাগুলোতে প্রভাব পড়ার আশঙ্কা এড়ানো যায় না। আইলা, ফণী, বুলবুল একই পথে এসেছে। ঘূর্ণিঝড়গুলোর এই একই গতিরেখার কারণ কী? প্রশ্নের জবাবে দুর্যোগ বিশেষজ্ঞ নঈম গওহার ওয়ারা বলেন, এর কোনো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা নেই। তবে সাধারণত দেখা যাচ্ছে ঘূর্ণিঝড়গুলো এক এক দশকে এক এক দিকে আঘাত করে। তিনি বলেন, আম্ফান এখন শক্তিশালী হলেও তীরে আসা অবধি কতটা শক্তি বজায় থাকে তা দেখার বিষয়।

আম্ফানের আঘাত লাগুক বা না-লাগুক, এই অঞ্চল দিয়ে ঘূর্ণিঝড় এলেই এই প্রশ্নগুলো ঘুরপাক খায়- বছরের পর বছর কেন পশ্চিম উপকূলের মানুষগুলো ঝুঁকির মধ্যে আছে? কেন পূরণ হচ্ছে না সরকারের উপর মহলের আশ্বাস? কেন সংশ্লিষ্টদের ওয়াদা বারবার ভঙ্গ হচ্ছে?    


ঢাকা/তারা

রাইজিংবিডি.কম

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়