ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১ শ্রাবণ ১৪২৭, ১৬ জুলাই ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

জুলিও কুরি পদকে ‘বঙ্গবন্ধু’ হয়েছিলেন ‘বিশ্ববন্ধু’

খায়রুল আলম : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০৫-২৩ ১:১৮:০৪ পিএম     ||     আপডেট: ২০২০-০৫-২৩ ৪:৩৪:৫২ পিএম

মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক, বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১ সালে ফ্যাসিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেন। শোষিত ও নিপীড়িত জনগণের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে তথা বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় তাঁর অসাধারণ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ১০ অক্টোবর, ১৯৭২ ফিনল্যান্ডের হেলসিংকিতে বিশ্ব শান্তি পরিষদ এক ইশতেহারে বঙ্গবন্ধুকে ‘জুলিও কুরি’ পুরস্কারে ভূষিত করার ঘোষণা দেয়। পরবর্তীকালে ১৯৭৩ সালের আজকের এই দিনে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে জুলিও কুরি শান্তি পদক তুলে দেওয়া হয়। বিশ্ব শান্তি পরিষদের উদ্যোগে ঢাকায় অনুষ্ঠিত এশীয় শান্তি সম্মেলনে বঙ্গবন্ধুকে সেদিন পদক প্রদান করেন বিশ্ব শান্তি পরিষদের সেক্রেটারি জেনারেল রমেশ চন্দ্র।

‘সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো সঙ্গে বৈরিতা নয় এবং সকল বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধান’ এই ছিলো বঙ্গবন্ধুর পররাষ্ট্রনীতির মূলমন্ত্র। বিশ্ব শান্তি পরিষদের শান্তি পদক  জাতির পিতার কর্মের স্বীকৃতিস্বরূপ। তাঁর অবদানের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। আর এই পদক ছিলো বাংলাদেশের জন্য প্রথম কোনো আন্তর্জাতিক সম্মান। এই মহান অর্জনের ফলে জাতির পিতা পরিণত হয়েছেন বঙ্গবন্ধু থেকে বিশ্ববন্ধুতে। কিন্তু এ প্রাপ্তি বা অর্জন দেশি-বিদেশি অনেকের কাছেই চোখের বালি বা ঈর্ষণীয় বিষয় ছিল। এই ঈর্ষার অন্যতম কারণ বঙ্গবন্ধুর অগ্রযাত্রা। তিনি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটিকে সঠিক নেতৃত্বের মাধ্যমে মাথা তুলে দাঁড়াবার উপায় বের করতে সক্ষম হয়েছিলেন। কিন্তু জাতির এই অগ্রযাত্রার সমাপ্তি ঘটে ১৯৭৫-এ সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্য দিয়ে। এটি ছিল মানব জাতির ইতিহাসে এক নিষ্ঠুর ও নির্মম হত্যাকাণ্ড। এ এক কলঙ্কিত ইতিহাস, পাপ-পঙ্কিল অধ্যায়। সেই বিকৃত ইতিহাস ও অধ্যায়ের বলি হয়েছেন আমাদের মহান নেতা।

দীর্ঘ ৯ মাসের যুদ্ধ শেষে পাকিস্তানি বাহিনী পরাজিত হলে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। কোটি কোটি বাঙালির দাবির পরিপ্রেক্ষিতে এবং আন্তর্জাতিক চাপের মুখে শেখ মুজিবকে মুক্তি দেয়া হয় ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি। ১০ জানুয়ারি স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন জনগণের প্রাণপ্রিয় এই নেতা। সে বছরই তাঁর জুলিও কুরি শান্তি পদক এক বিরল ঘটনা। কারণ বাংলাদেশ যখন স্বাধীন হয় তখন বিশ্ব পরিস্থিতি, শান্তি, প্রগতি, গণতান্ত্রিক শক্তিগুলোর এবং গণতন্ত্র ও জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের অনুকূলে পরিবর্তিত হয়েছিল। এ সময় উপমহাদেশে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের ভেতর সৎ প্রতিবেশীমূলক সম্পর্ক স্থাপন ও উপমহাদেশে শান্তির সম্ভাবনা উজ্জ্বল হয়। মুক্তিযুদ্ধের কালপর্বে ভারত-সোভিয়েত শান্তি, মৈত্রী ও সহযোগিতা চুক্তি-১৯৭১ এবং বাংলাদেশ-ভারত শান্তি, মৈত্রী ও সহযোগিতা চুক্তি- ১৯৭২, বাংলাদেশের মৈত্রী সম্পর্কে এই উপমহাদেশে উত্তেজনা প্রশমন ও শান্তি স্থাপনের ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করেছিল। পাকিস্তানের প্রতিক্রিয়াশীল নীতির বিপরীতে বঙ্গবন্ধু সরকার কর্তৃক জোট নিরপেক্ষ নীতি অনুসরণ এবং শান্তি ও ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান গ্রহণের নীতির ফলে বাংলাদেশ বিশ্ব সভায় একটি ন্যায়ানুগ দেশের মর্যাদা লাভ করে।

সবার প্রতি বন্ধুত্বের ভিত্তিতে বৈদেশিক নীতি ঘোষণা করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, ‘পৃথিবীর বৃহত্তম শক্তি যে অর্থ ব্যয় করে মানুষ মারার অস্ত্র তৈরি করছে, সেই অর্থ গরিব দেশগুলোকে সাহায্য দিলে পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠা হতে পারে।’ সেই পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৭২ সালের ১০ অক্টোবর চিলির রাজধানী সান্তিয়াগোতে বিশ্ব শান্তি পরিষদের প্রেসিডেন্সিয়াল কমিটির সভায় বঙ্গবন্ধুকে  জুলিও কুরি শান্তি পদক প্রদানের জন্য পরিষদের মহাসচিব রমেশ চন্দ্র প্রস্তাব উপস্থাপন করেন। পৃথিবীর ১৪০টি দেশের ২০০ প্রতিনিধির উপস্থিতিতে পদক প্রদানের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

বঙ্গবন্ধু ছিলেন বিশ্বের মুক্তিকামী, নিপীড়িত, মেহনতি মানুষের অবিসংবাদিত নেতা। শান্তি, সাম্য, স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি আজীবন সংগ্রাম করেছেন। জেল, জুলুম, অত্যাচার, নির্যাতন সহ্য করেছেন। তাঁর অতুলনীয় সাংগঠনিক ক্ষমতা, রাষ্ট্রনায়কোচিত প্রজ্ঞা, মানবিক মূল্যবোধ, ঐন্দ্রজালিক ব্যক্তিত্ব বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতা সংগ্রামের লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধ করে। তাঁর নির্দেশে বাঙালি জাতি মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে, অভ্যুদয় ঘটে স্বাধীন বাংলাদেশের।

এ সম্মান পাওয়ার পর বঙ্গবন্ধু নিজেই বলেছিলেন, ‘এ সম্মান কোনো ব্যক্তি বিশেষের জন্য নয়। এ সম্মান বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে আত্মদানকারী শহিদদের, স্বাধীনতা সংগ্রামের বীর সেনানীদের। জুলিও কুরি শান্তিপদক সমগ্র বাঙালি জাতির।’

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও জাতীয়তাবাদকে রাষ্ট্রের মূলনীতি হিসেবে ঘোষণা করেন। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংঘাতময় পরিস্থিতি উত্তরণে তিনি শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। তিনি যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ পুনর্গঠন করেন। তাঁর এই উদ্যোগগুলো পুরস্কার প্রদানের পেছনে ভূমিকা রেখেছে।


ঢাকা/তারা