ঢাকা, শুক্রবার, ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭, ২৯ মে ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

কমল দাশগুপ্ত: স্বর্ণযুগের সংগীতস্রষ্টার করুণ অধ্যায়

অনুপম হায়াৎ : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০৫-২৩ ২:১৬:২৫ পিএম     ||     আপডেট: ২০২০-০৫-২৩ ৩:২৪:২৭ পিএম
প্রতিমাসে গড়ে ৪৫টি গান সুর করার কৃতিত্ব ছিল তাঁর

অবিভক্ত উপমহাদেশের সংগীত জগতের উজ্জ্বল নক্ষত্র কমল দাশগুপ্তের প্রতিভার বিকাশ ঘটে কলকাতায় ১৯৩০-১৯৬০ দশকে। তবে অত্যন্ত সৃজনশীল এই সুরকারের মৃত্যু ঘটে ঢাকায় ১৯৭৪ সালে অবর্ণনীয় দুরবস্থায়। তিনি ছিলেন বাংলা ও হিন্দি চলচ্চিত্রের শত শত গানের সুরকার, আধুনিক বাংলা গানের সুরস্রষ্টা, গ্রামোফোন রেকর্ড কোম্পানির সংগীত পরিচালক এবং সর্বাধিক নজরুল গীতির সুরকার। তাঁর সংগীত পরিচালনায় ৮০টি চলচ্চিত্রের মধ্যে ‘যোগাযোগ’, ‘শেষ উত্তর’, ‘চন্দ্রশেখর’ ও ‘শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্য’ শ্রেষ্ঠ পুরস্কারে ভূষিত হয়। প্রায় চারশ নজরুলগীতির সুরকার তিনি। নজরুলের ছত্রছায়ায় একেবারে ভিন্নমাত্রার গান গেয়ে তিনি গগণস্পর্শী কারিশমা দেখিয়ে সংগীত জগতে আবির্ভূত হন। 

কমল দাশগুপ্তের জন্ম ১৯১২ সালের জুলাই মাসে নড়াইলে। বড় ভাই বিমল দাশগুপ্ত হাসির গান গেয়ে সুনাম কুড়িয়েছিলেন। এর বাইরেও যাদুকর হিসেবে তাঁর সুখ্যাতি ছিল। এজন্য ‘প্রফেসর’ উপাধিও পেয়েছিলেন। ছোট ভাই সুবল দাশগুপ্ত সুরকার এবং তবলাবাদক। বোন ইন্দিরা সেন ও সুধীরা সংগীতশিল্পী এবং অন্যান্য গুণের অধিকারী। এই পরিবারের সবাই নজরুল সান্নিধ্যে ধন্য হয়েছেন।

কমল দাশগুপ্ত ছিলেন স্বর্ণযুগের সংগীতস্রষ্টা। ভারতীয় সামরিক বাহিনীর রণসঙ্গীত ‘কদম কদম বাড়ায়ে যা’ তাঁর অনবদ্য সৃষ্টি। প্রতিমাসে গড়ে ৪৫টি গান সুর করার কৃতিত্ব ছিল তাঁর। সিনেমার গানের জন্যে পেয়েছিলেন চারবার পুরস্কার। একটি চলচ্চিত্র প্রযোজনা করে তিনি সর্বশান্ত হয়ে চরম আর্থিক সংকট ও হতাশায় লিপ্ত হন।

১৯৫৫ সালে কমল দাশগুপ্ত নজরুল সংগীতশিল্পী ফিরোজা বেগমকে বিয়ে করে ঘর বাঁধেন পার্ক সার্কাসে। শুরু হয় অর্থনৈতিক টানাপোড়েনের দিন। ১৯৬৭ সালে দুজন ঢাকা চলে আসেন। এরপর বেতার ও চলচ্চিত্রে জড়িত হয়েও তিনি পূর্বদাপট ফিরে পাননি। কমল পুনরায় আর ফোটেনি।

বলা যায় এ ছিল তাঁর নিয়তি। অর্থের প্রয়োজনে কমল দাশপুপ্তকে ঢাকায় মুদি দোকান খুলতেও দেখা গেছে। এভাবেই সুরের আকাশ থেকে ধীরে ধীরে খসে পড়তে থাকে উজ্জ্বল এক ধ্রুবতারা। তাকে নিয়ে ১৯৭২ সালের ১৮ মে সাপ্তাহিক বিচিত্রায় একটি মর্মস্পর্শী প্রতিবেদন ছাপা হয়। শিরোনাম ছিলো ‘তিনি সাক্ষাৎকার দিতে চাননি’। প্রতিবেদনে উঠে এসেছে সেই সময় তাঁর সামাজিক এবং মানসিক অবস্থা। সমাজের প্রতি, রাষ্ট্রের প্রতি তাঁর মনের গহীনে চেপে বসা গাঢ় অভিমানের বহিঃপ্রকাশও সেখানে দেখতে পাওয়া যায়। প্রতিবেদকের নামহীন সেই প্রতিবেদন বানান-রীতি অক্ষুণ্ন রেখে প্রকাশ করা হলো। ভূমিকা ও সংগ্রহ: অনুপম হায়াৎ।
 

জী‌বিকার প্র‌য়োজ‌নে মু‌দি দোকানদার: সেই প্র‌তি‌বেদন

 

‘সেন্ট্রাল রোড ধরে যাবার সময়, লক্ষ্য করলে একটি সুন্দর সাইনবোর্ড চোখে পড়বে। যত্ন করে লেখা একটি শব্দ ‘পথিকার’। অনেকেই হয়তো জানেন না ‘পথিকার’ নামের এই ছোট্ট দোকানটি কার। অনেকেই আবাক হবেন যদি শোনেন এ দোকানটি হচ্ছে কমল দাস গুপ্তের। সেই কমল দাস গুপ্তের কথাই আমি বলছি যিনি নজরুলগীতি ভক্তদের অতি পরিচিত এবং প্রিয় নাম। একদা ছিলেন ভারতীয় চলচ্চিত্রের বিখ্যাত সুরকার। যার স্ত্রী নজরুলগীতির সুন্দরতম গায়িকা ফিরোজা বেগম। অনেকের মতো আমাকে শুনেও বিস্মিত হতে হয়েছিল সুরকার কমল দাস গুপ্ত দোকানে বসে টুকিটাকি জিনিস বিক্রি করছেন। তাকে প্রশ্ন করেছিলাম কেন আপনি দোকানে বসছেন? বিস্মিত ভরা গলায় তিনি জবাব দিলেন, ‘আমাকে তো সংসার চালাতে হবে? খেয়ে বাঁচতে হবে।’

বিস্মিত হলাম— ‘শিল্পী কমল দাস গুপ্ত জীবিকার জন্যে দোকানে বসছেন! এটা সত্যি দুর্ভাগ্যজনক।’ তিনি চুপ করে রইলেন। তার সাক্ষাৎকার নেওয়ার জন্যই গিয়েছিলাম। শুনে তিনি সরাসরি অস্বীকার করলেন, ‘আমি সাক্ষাৎকার দেবো না।’ প্রশ্ন করতে হলো ‘কেন দেবেন না?’ তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, ‘এতোদিন পর সাক্ষাৎকারের জন্যে এসছেন— থাক না। ওসব ঝামেলা করে কি লাভ?’ আরো কিছুক্ষণ নীরব মুহূর্ত কাটলো। তারপর তিনি যেন স্বগতোক্তি করলেন, ‘পাঁচ বছর এদেশে আছি, কই কেউ তো কোনদিন সাক্ষাৎকার নিতে আসেনি। কোনদিন বেতার টেলিভিশন জানতেও চায়নি কেমন আছি? আজ এতোদিন পর কি দরকার ওসবের?’

বলতে বলতে শেষের দিকে তাঁর কণ্ঠস্বর অভিমানে গাঢ় হয়ে উঠলো। কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললাম, ‘তখন সময় অন্যরকম ছিলো। তখন শিল্পী কমল দাস গুপ্তকে ইচ্ছে করেই এড়িয়ে যাওয়া হয়েছিলো। কিন্তু এখনকার অবস্থা তো অন্যরকম।’ ‘কি রকম?’ অত্যন্ত ধারালো গলায় তিনি প্রশ্ন করলেন। বললাম, ‘দেশে এতো বড় একটা বিপ্লব হয়ে গেলো। তিরিশ লক্ষের ওপরে মানুষ রক্ত দিলো। গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় এলেন। এটা কি পরিবর্তন নয়?’ তিনি অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর ধীরে ধীরে বললেন, ‘বিপ্লব মানে তো পরিবর্তন। ব্যাপক পরিবর্তন। বিপ্লবটা হলো কোথায়? সবই তো দেখছি আগের মতো। আগে যা ছিলো এখনো তো তাই দেখছি।’

আমাকে এরপর বলতে হলো, ‘আগে পাকিস্তান ছিলো এখন বাংলাদেশ হয়েছে।’ ‘হয়েছে’, মাথা নেড়ে তিনি সায় জানালেন- ‘কিন্তু মানুষগুলো বদলায়নি। আগে যে আমলারা ছিলো এখনো তারাই আছে।’  আবার বললাম, ‘এখন এদেশে জনগণের নির্বাচিত সরকার হয়েছে।’ তিনি চুপ করে রইলেন। কিছুক্ষণ পর বললাম, ‘আপনি কি আমার কিছু প্রশ্নের জবাব দেবেন?’ তিনি আবার বিস্মিত হলেন, ‘বলেছি তো, আমি সাক্ষাৎকার দিতে পারবো না।’ বললাম, ‘এ প্রশ্ন আমার ব্যক্তিগত নয়। নজরুলগীতির প্রতিটি ভক্ত জানতে চান গায়ক সুরকার কমল দাস গুপ্ত নীরব কেন?’ তিনি আবার উত্তেজিত হলেন, ‘সবাইকে তা হলে প্রশ্ন করুন এদেশের শিল্পীরা এখন নীরব কেন? কেন তাদের বেতার টিভিতে গাইতে দেখা যাচ্ছে না।’
 

ফি‌রোজা বেগম এবং কমল দাশগুপ্ত

 

আমি আবার বিব্রত হলাম, ‘এ নিয়ে অনেক লেখা হয়েছে। অনেক বলা হয়েছে। শিল্পীদের একচেটিয়া নিষিদ্ধকরণের বিরুদ্ধে এখনকার সকল সংবাদপত্রই সোচ্চার। যার ফলে ওরা বাধ্য হয়েছে এ ধরনের অযৌক্তিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে।’ ‘নিয়েছে তো বুঝলাম’, তিনি অসহিঞ্চু গলায় বললেন, ‘নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়ে গেলেই সবকিছু করা হয়ে গেলো? শিল্পীদের প্রতি আর কিছু কি করণীয় নেই?’ ‘হয়তো আছে। এ নিয়ে এখনো হয়তো কর্তৃপক্ষ কিছু ভেবে উঠতে পারেননি? আপনার কোন মতামত আছে?’ ‘আমার মতামতে কি হবে? কেউ কোনদিন এসেছে মতামত জানতে?’  ‘আসবে’, আমি বললাম, ‘আসতে হবে। তিরিশ লক্ষ মানুষের রক্ত বৃথা যাবে না। এতো বড় বিপ্লব বৃথা যেতে পারে না।’ তিনি হাসলেন। অত্যন্ত শাণিত হাসি। বললেন, ‘বিপ্লব কিছুই হয়নি। তিরিশ লক্ষ মানুষ বুক পেতে রক্ত দেয়নি। ওদের হত্যা করা হয়েছে মাত্র। আর কিছুই নয়।’ তাঁর মুখে যন্ত্রণার ছায়া। মনে হলো তাকে এভাবে প্রশ্ন করা উচিত হচ্ছে না। আমি বিব্রত বোধ করলাম।

এতো অভিমান তাঁর বুকে জমা হয়ে আছে জানলে কখনো হয়তো এভাবে সাক্ষাৎকার নিতে আসতাম না। বললাম, ‘আপনাকে বিরক্ত করার জন্যে আমি অত্যন্ত দুঃখিত।’ তিনি কোনো জবাব দিলেন না।’

 

ঢাকা/তারা

 

পড়ুন ঈদ সংখ্যার আরো লেখা: আনন্দ-অশ্রু লেখা যায় না