RisingBD Online Bangla News Portal

ঢাকা     বৃহস্পতিবার   ২৬ নভেম্বর ২০২০ ||  অগ্রাহায়ণ ১২ ১৪২৭ ||  ০৯ রবিউস সানি ১৪৪২

যেভাবে লেখা হলো ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে...’

সুমনকুমার দাশ || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ০২:৩০, ২৫ মে ২০২০   আপডেট: ১০:৩৯, ২৫ আগস্ট ২০২০
যেভাবে লেখা হলো ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে...’

গানটি ঘিরে শৈশবের কত স্মৃতি জড়িয়ে আছে! এখনও তাড়িত হই গানটি শুনে। যত শুনি, তত মুগ্ধ হই। একবার নয়, দুইবার নয়, বারবার শুনি। তবুও যেন তৃষ্ণা মেটে না। অমোঘ এ আকর্ষণ। একদিনের কথা মনে পড়ে, তখন ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ি। শাহজাহান ছিল আমার সহপাঠী। বেদে সম্প্রদায়ের হওয়ায় শাহজাহানদের পরিবার থাকত নদীতে, নৌকায়। তার সঙ্গে আমার গলায়-গলায় ভাব।

তবে, একদিন সে দৃশ্য বদলে যায়। তখন ছিল রমজান মাসের এক সন্ধ্যা। ক’দিন পরেই ঈদ। নৌকায় বসে শাহজাহানের পরিবারের সঙ্গে ওই সন্ধ্যায় ইফতার করি। যখন বাসায় ফেরার প্রস্তুতি নিই, তখনই শাহজাহান গুনগুনিয়ে ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ’ গানটি আওড়াল। কিন্তু দ্বিতীয় পঙ্​ক্তি গাওয়ার সময় সে অনেকটাই হেরফের করে ফেলে। আমি তখন শাহজাহানকে জানাই, পুরো গানটা আমার মুখস্ত।

শাহজাহান আর আমার কথোপকথন শুনে এগিয়ে আসেন মতি চাচা। তিনি শাহজাহানের বাবা। বললেন, ‘তাইলে দুইজনের মইধ্যে একটা প্রতিযোগিতা অই যাক! দেখি জিতে কেডা?’ চাচার এ আহ্বানের পর শুরু হয় গানের প্রতিযোগিতা। চাচা পুরস্কারও ঘোষণা করলেন। যে জিতবে, সে পাবে পাঁচ টাকার চকলেট।

পাঠ্যবইয়ের বাইরে এই প্রথম কোনো প্রতিযোগিতায় আমার অংশ নেওয়া। মুখোমুখি শাহজাহান আর আমি! গান গাইতে পারি না। অনেকটা আবৃত্তির ঢঙেই আমরা নিজেদের মতো করে গানটি পাঠ করলাম। গাইতে (কিংবা পাঠ করতে) গিয়ে শাহজাহান বারবার পদ ভুলে যাচ্ছিল। একটু পরপরই কেবল সে সুরে সুরে গাইছিল ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ’। শাহজাহানের ভুলচুক গাওয়ার পর এলো আমার পালা। আমি চোখ বন্ধ করে গরগর করে এক নিশ্বাসে পাঠ করে ফেললাম পুরো গানটি। মুহূর্তেই আমাকে কোলে তুলে নিলেন মতি চাচা। বলেন, ‘বাবা, তুমি এইডা শিখলা কার কাছ থাকি?’

মতি চাচা চোখ-মুখে হাত বুলিয়ে আমাকে আদর করছিলেন। এগিয়ে আসেন শাহজাহানের মা, আমেনা চাচি। তখন দাড়াইন নদের আকাশ আর চরাচরজুড়ে নেমে আসতে শুরু করেছে রাজ্যের অন্ধকার। সে অন্ধকারেও আমার চোখে পড়ল, নৌকার গলুইয়ের পাশে পাটাতনে দাঁড়িয়ে থাকা সদ্য পরাজিত-একাকি শাহজাহানের চোখ পানিতে চিকচিক করছে। আমার অন্তরটা কেঁপে উঠল! তবে কি শাহজাহানকে প্রতিযোগিতায় হারানোটা আমার ভুল হয়ে গেল? আমারও চোখ দিয়ে গরগর করে পানি ঝরে। মতি চাচা আমাকে কোলে নিয়ে নৌকা থেকে কিছুটা দূরে অবস্থিত আমাদের বাসার পাশে এলেন। দোকান থেকে কিনে দিলেন পাঁচ টাকা দিয়ে ২০টি চকলেট। প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে জেতা আমার জীবনের প্রথম কোনো পুরস্কার! মুঠো ভর্তি চকলেট হাতে নিয়ে আমি ভাবি শাহজাহানের কথা। ওই রাতে আর পড়াশোনায় মনোযোগ বসাতে পারিনি। বারবার চোখে ভাসে পরাজিত ও বিধ্বস্ত শাহজাহানের মুখ, যে কিনা আমার প্রিয় সহপাঠী।

সে ঘটনার পর কেটে গেছে আড়াই দশকেরও বেশি সময়। এখনও যখন প্রতি ঈদুল ফিতরের আগে টিভিতে বেজে উঠে ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ’, তখনই মনে পড়ে শাহজাহানের মুখ।

শৈশবের সে স্মৃতিতাড়িত গানের প্রতি মুগ্ধতা এখনও একবিন্দু কমেনি। সেই শৈশব-কৈশোর-যৌবনে রেডিও-টিভিতে চানরাতে বেজে উঠত গানটি। ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে ভিন্ন সম্প্রদায়ের হলেও কখনও আমার মনে একটিবারের জন্যও উঁকি দেয়নি, এ গান আমার নয়! জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম (২৪ মে ১৮৯৯-২৯ আগস্ট ১৯৭৬) রচিত কার্হাবা তালের এ গানটি তো ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার কাছে সেই একই রকম মুগ্ধতা ছড়িয়ে আসছে ১৯৩২ সালের পর থেকে। বাঙালির রোজার ঈদ আর এ গান যেন একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ; ঐতিহ্য তো বটেই।

দুই

ঢাকার নজরুল ইন্সটিটিউট থেকে রশিদুন্ নবী সম্পাদিত ‘নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ’ (অক্টোবর, ২০১৪)-তে উল্লেখ করা হয়েছে, এইচএমভি গ্রামোফোন কোম্পানি থেকে বাংলা ভাষায় ইসলামি গানের প্রথম রেকর্ড প্রকাশিত হয় ১৯৩২ সালের ফেব্রুয়ারিতে। এই রেকর্ডে কবি-রচিত গান দুটি হলো ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে’ এবং ‘ইসলামের ঐ সওদা লয়ে’। গান দুটির শিল্পী ছিলেন আব্বাসউদ্দীন আহমদ। তবে, কৈশোরে ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে’ গান বলতেই আমরা বুঝতাম সতীনাথ মুখোপাধ্যায় (৭ জুন ১৯২৫-১৩ ডিসেম্বর ১৯৯২)-এর কণ্ঠ। আরও পরে গানটি শুনি ফিরোজা বেগম (২৮ জুলাই ১৯৩০-৯ সেপ্টেম্বর ২০১৪), রুনা লায়লা, সাবিনা ইয়াসমিন, মুস্তাফা জামান আব্বাসী, ফেরদৌসী রহমান প্রমুখ শিল্পীদের কণ্ঠে।

কয়েক প্রজন্ম ধরে যে গান বিপুলভাবে জনপ্রিয়তা পেলো, সেটি রচনা ও প্রথম সম্প্রচারের ইতিহাস আব্বাসউদ্দীন আহমদ রচিত ‘দিনলিপি ও আমার শিল্পীজীবনের কথা’ বইয়ে উল্লেখ রয়েছে। এ প্রসঙ্গে আব্বাসউদ্দীন-পুত্র মুস্তাফা জামান আব্বাসীও তাঁর একাধিক লেখা এবং সাক্ষাৎকারে বিষয়টি জানিয়েছেন। এটি অনেকটা এ-রকম : আব্বাসউদ্দীন আহমদ কাজী নজরুল ইসলামকে উর্দু কাওয়ালি গানের আদলে বাংলায় ইসলামি গান লেখার অনুরোধ জানান। এমন গান রেকর্ড প্রসঙ্গে গ্রামোফোন কোম্পানি এইচএমভি-র কর্মকর্তা ভগবতী ভট্টাচার্যকে আব্বাসউদ্দীন জানালেও প্রথমে তিনি অসম্মতি জানান। কারণ তখন শ্যামা সংগীতের ট্রেন্ড চলছিল। শ্যামা সংগীত গেয়ে অনেকেই বিখ্যাত হয়ে যাচ্ছিলেন। নজরুল নিজেও শ্যামা সংগীত লিখেছেন, সুর দিয়েছেন। স্রোতের বিপরীতে চলতে চাননি ভগবতী ভট্টাচার্য। 

কিন্তু আব্বাসউদ্দীন ছিলেন নাছোড়বান্দা। প্রায় মাসছয়েক পেছনে ঘুরে ভগবতী বাবুর সম্মতি পাওয়া গেল। এরপরই আব্বাসউদ্দীন নজরুলকে গিয়ে ধরলেন। একটি কক্ষে ‘এক ঠোঙা পান আর চা’ দিয়ে নজরুলকে ভেতরে রেখে দরজা বন্ধ করে দিলেন। আধাঘণ্টার মধ্যেই নজরুল লিখে ফেলেন ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে’ গানটি। চার দিন পর হারমোনিয়াম ও তবলা-সহযোগে এ গানের রেকর্ড করা হয়। দু’মাস পর ঈদুল ফিতরের আগে প্রচারিত হয় এ রেকর্ড। তখন আব্বাসউদ্দীন ছিলেন বাড়িতে। ঈদের ছুটির পর কলকাতা ফিরে প্রথমবারের মতো তিনি অফিসে যাচ্ছেন। মনে উত্তেজনা। গানটি শ্রোতাদের মনে কতটা দাগ কাটলো সে কথাই ভাবছিলেন তিনি ট্রামে বসে। হঠাৎ পাশে বসা এক যুবক গুনগুনিয়ে গেয়ে উঠল- ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে...’। চমকে উঠলেন আব্বাসউদ্দীন। তিনি যা বোঝার বুঝে নিলেন। এদিকে গান হিট হওয়ায় ভগবতী বাবুও খুশি। তিনি এমন আরো গান চান! শুরু হলো নজরুলের রচনা ও সুরে আব্বাসউদ্দীনের কণ্ঠে ইসলামি গানের জাগরণ।

তিন

পবিত্র ঈদুল ফিতরের চাঁদরাত মানেই ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে’ গান। চাঁদরাত থেকে শুরু করে টানা কয়েকদিন সবার মুখে মুখে ফেরে এ গান। তবে এ গানের যে মূল বিষয়, সেটা যদি চেতনা-মজ্জায় ধারণ করা সম্ভব হয়, তবেই কাজী নজরুল ইসলামের সৃষ্টি সার্থক হবে। হিংসা-বিদ্বেষ ত্যাগ করে মমতা, সাম্য, ভালোবাসা আর মানবতার অমর বাণীই গানের পরতে পরতে ছড়িয়ে রয়েছে। ‘আপনাকে আজ বিলিয়ে দে/ শোন্ আসমানি তাগিদ’-এর চেয়ে অমর পঙ্​ক্তি আর কী হতে পারে?

[২৪ মে, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ]


ঢাকা/তারা

রাইজিংবিডি.কম

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়