Risingbd Online Bangla News Portal

ঢাকা     মঙ্গলবার   ১৮ মে ২০২১ ||  জ্যৈষ্ঠ ৪ ১৪২৮ ||  ০৪ শাওয়াল ১৪৪২

নারীর হাতে পরাজিত করোনা

শাহিদুল ইসলাম || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ০৮:২৮, ১৩ জুন ২০২০   আপডেট: ১০:৩৯, ২৫ আগস্ট ২০২০
নারীর হাতে পরাজিত করোনা

করোনায় বিপর্যস্ত বিশ্ব। প্রতিদিন বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা। বাড়ছে মৃত্যু। স্বাস্থ্য খাত নিয়ে যারা কাজ করছেন তারা দিশেহারা। চিকিৎসা বিজ্ঞানীরাও অনেক প্রশ্নের উত্তর মেলাতে পারছেন না! করোনার ক্রোধ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে দেশের সরকার প্রধানগণ। মহামারি ও আর্থিক মন্দা তাদের কপালে ফেলেছে চিন্তার ভাঁজ। 

তবে এতো খারাপ খবরের ভিড়ে বিশ্বের কয়েকটি দেশ বিশ্ব সম্প্রদায়ের জন্য সুখবর বয়ে এনেছে। মহামারি মোকাবিলায় যে দেশগুলো অনেকটাই সফল হয়েছে সেসব দেশের সরকার প্রধানগণ দেখিয়ে দিয়েছেন ব্যাপক পরীক্ষা-নিরীক্ষা, চিকিৎসা সেবা, পর্যাপ্ত চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহ, সংক্রমিত এলাকা চিহ্নিতকরণ ও ব্যক্তিকে আলাদা করা, গণ জমায়েতের ওপর কড়া বিধিনিষেধ আরোপ করার মাধ্যমে শক্তিশালী এই ভাইরাসকে সহজেই পরাস্ত করা সম্ভব। 

বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা এই দেশগুলোর সমাজ ও সাংস্কৃতিক কাঠামোতে অনেক অমিল থাকলেও একটি বিষয়ে মিল রয়েছে। প্রত্যেকটি দেশের সরকার প্রধান একজন নারী। দেশগুলো হলো তাইওয়ান, জার্মানি, আইসল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড, নরওয়ে এবং ফিনল্যান্ড। এই দেশগুলোতে করোনা ছড়িয়ে পড়লেও তা মারাত্মক রূপ নেয়নি। 

প্রথমেই আসি নিউজিল্যান্ডের কথায়। করোনা মোকাবিলায় দক্ষ নেতৃত্বের কারণে নিজ দেশ এবং বিশ্বে প্রশংসা কুড়িয়েছেন নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা অ্যার্ডান। সংক্রমণের শুরুতে তিনি গোটা দেশ লকডাউন করে দেন। বন্ধ করে দেন জল ও আকাশসীমা। স্থগিত করেন সমস্ত পর্যটন ভিসা। যদিও নিউজিল্যান্ডের রাষ্ট্রীয় আয়ের একটা বড় অংশ আসে পর্যটন থেকে। তারপরও প্রধানমন্ত্রীর কাছে এই আয় জনগণের জীবনের চেয়ে তুচ্ছ মনে হয়েছে।

এছাড়াও জেসিন্ডা অ্যাডার্ন  জনগণকে নিয়মিত টেলিভিশন ব্রিফিংয়ের মাধ্যমে লকডাউন ও করোনাকালীন স্বাস্থ্যবিধি মানার প্রয়োজনীয়তা বোঝাতে থাকেন। নিয়মিত রাষ্ট্র প্রধানের মুখে এমন সতর্কবার্তা শুনে দেশটির জনগণও সব নিয়ম মেনে নেন। ফলাফল দেশটিতে ১,৩৩৬ জন করোনা রোগীর বিপরীতে মারা গেছেন মাত্র ৯ জন। বর্তমানে নিউজিল্যান্ডে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা কমতে থাকলেও দেশটির সীমান্ত চলাচলে কঠোর নজরদারী বজায় থাকবে বলে জানিয়েছেন জেসিন্ডা অ্যাডার্ন।

নিউজিল্যান্ডের মতই দ্বীপ রাষ্ট্র আইসল্যান্ড। দেশটির প্রধানমন্ত্রী ক্যাটরিন ইয়াকোবস্টডিটি। অধিকাংশ দেশ যেখানে নাগরিকদের করোনা উপসর্গ দেখা দেওয়ার পর টেস্ট করিয়েছে সেখানে আইসল্যান্ড নিয়েছে একেবারে ভিন্নধর্মী পন্থা। দেশের সকল নাগরিকদের বিনামূল্যে করোনাভাইরাস পরীক্ষা করিয়েছে দেশটি। এতে তারা প্রকৃত আক্রান্ত এবং করোনার ঝুঁকিতে থাকা লোকেদের আলাদা করতে পেরেছে্।

এছাড়া আক্রান্ত লোকের সংস্পর্শে আসা লোকেদের খুঁজে বের করতে প্রযুক্তির সহায়তা নিয়েছে তারা। ফলে ১৮০৭ জন করোনা আক্রান্ত হলেও আইসল্যান্ডে মারা গিয়েছে মাত্র ১০ জন। বাকি সবাই সুস্থ এবং নতুন করে কেউ সেখানে সংক্রমিত হয়নি। ফলে দেশটি এখন করোনামুক্ত। এই কাজে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ক্যাটরিন ইয়াকোবস্টডিটি। তিনি এখন বিশ্ববাসীর বাহবা পাচ্ছেন। অন্যান্য দেশের মতো আইসল্যান্ড লকডাউন করা হয়নি। বন্ধ করা হয়নি কোনো স্কুল-কলেজ।

স্ক্যান্ডেনেভিয়ান দেশ নরওয়ে। প্রধানমন্ত্রী এর্না সোলবার্গ। নরওয়েকে ‘চির শান্তির দেশ’ বলা হয়। এই চিরশান্তির দেশে ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয়। নড়েচড়ে বসে দেশটির প্রশাসন। প্রধানমন্ত্রী এর্না সোলবার্গের নির্দেশে ব্যাপক প্রস্তুতি নেয় স্বাস্থ্য বিভাগ। সরকারের এই ব্যাপক প্রস্তুতির কারণে দেশটিতে গত ১২ জুন পর্যন্ত ৮৬২০ জনের মধ্যে করোনার সংক্রমণ ঘটেছে। এর মধ্যে ২৪২ জন মারা গিয়েছেন। বাকিরা সুস্থ হওয়ার পথে। 

এছাড়া নরওয়ের প্রধানমন্ত্রীর আরও একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ ছিল শিশুদের জন্য টেলিভিশন সংবাদ সম্মেলন করা। এটি অভিনব একটি আয়োজন ছিল। ঘরবন্দি শিশুদের মানসিকভাবে চাঙ্গা রাখতে তিনি এই উদ্যোগ নেন। সরাসরি সম্প্রচারিত এই সংবাদ সম্মেলনে শিশুদের সকল ধরনের প্রশ্নের উত্তর দিতেন তিনি। 

একই অঞ্চলের আরেক দেশ ফিনল্যান্ড। প্রধানমন্ত্রী সানা মেরিন। সানা মেরিন পৃথিবীর সর্ব কনিষ্ঠ প্রধানমন্ত্রী। তবে বয়সে কম হলেও করোনা মোকাবিলায় তিনি বিশ্বের অনেক ডাকসাইটে সরকার প্রধানকে হার মানিয়েছেন। দেশটিতে সর্বমোট সংক্রমিতের সংখ্যা ৭০৭৭জন। এর মধ্যে মারা গেছেন ৩২৫ জন। বাকিরা সুস্থ হয়ে উঠেছেন। এবং সংক্রমণও আর ছড়িয়ে পড়েনি। এমন সফলতায় বিশ্ব গণমাধ্যমের প্রশংসায় ভেসেছেন সানা মেরিন।

শুরু থেকেই করোনাভাইরাসকে বেশ দক্ষতার সঙ্গেই সামাল দিয়েছে জার্মানি। জার্মান সরকার নাগরিকদের সঙ্গে করোনাভাইরাস নিয়ে লুকোচুরি করেনি। জার্মান চ্যান্সেলর এঙ্গেলা ম্যার্কেল দেশবাসীকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছেন যে ভাইরাসটি ভয়ঙ্কর। সতর্ক না হলে দেশের প্রায় ৭০ ভাগ লোক এতে আক্রান্ত হতে পারে। এছাড়া দেশটির সরকার, স্বাস্থ্য বিভাগ এবং রোগতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্র চমৎকার সমন্বয় করে কাজ করছে। ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি টেস্ট করিয়েছে জার্মানি। এই দারুণ সমন্বয়নীতির জন্য জার্মানিতে আক্রান্তের সংখ্যা ১ লক্ষ ৮৭ হাজারের বেশি হলেও সুস্থ হয়েছেন ১ লক্ষ ৭১ হাজার। বর্তমানে মাত্র ৬৮৭৭ জন করোনা রোগী রেয়েছে দেশটিতে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা পূর্বাভাস দিয়েছে খুব শীঘ্রই করোনা মুক্ত হবে জার্মানি। 

চীনের সীমান্ত ঘেঁষা দেশ তাইওয়ান। যদিও চীন তাইওয়ানকে নিজের অংশ মনে করে। করোনা মোকাবিলায় তাইওয়ান সরকারের উদ্যোগ ছিল চোখে পড়ার মতো। একেবারে জানুয়ারির গোড়ার দিকে সংক্রমণের শুরুতেই তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট সাং ইং ওয়েন ১২৪ ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণের ঘোষণা দেন। তাইওয়ান করোনার বিরুদ্ধে সবচেয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া দেশ। সরকারের দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার ফলে সেখানে মাত্র ৪৪৩ জন করোনা রোগীর প্রায় সবাই সুস্থ হয়ে ঘরে ফিরেছেন। মারা গেছেন মাত্র ৭ জন এবং নতুন করে কোনো সংক্রমণের খবর পাওয়া যায়নি। সিএনএন-এর এক প্রতিবেদনে তাইওয়ানের উদ্যোগকে করোনা মোকাবিলায় বিশ্বে শ্রেষ্ঠ দেশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

এই তালিকায় আরও কয়েকটি অঞ্চলের নাম উল্লেখ করা যেতে পারে। চীনের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল হংকং এবং ভারতের দক্ষিণী অঙ্গরাজ্য কেরেলা। হংকংয়ের নারী প্রশাসক ক্যারি ল্যাম এবং কেরেলার স্বাস্থ্যমন্ত্রী কে কে শাইলিজা করোনা মোকাবিলায় চমকপ্রদ সাফল্য দেখিয়েছেন।

শৌর্য-বীর্যে, অস্ত্রে বিশ্বের ক্ষমতাধর রাষ্ট্রের সরকার প্রধানগণ যখন করোনা নিয়ে মিথ্যাচার, জনগণকে বিভ্রান্ত করা, নাগরিক সু-চিকিৎসার ব্যবস্থা না করে উল্টো তাদের মৌলিক অধিকারে হস্তক্ষেপ, গণমাধ্যমকে দোষারোপ করে ব্যর্থতা ঢাকার চেষ্টাসহ নানা উপায়ে সত্য ধামাচাপা দিতে তৎপর সেখানে এই সব নারী নেত্রীরা শক্ত হাতে করোনার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে জয়ী হয়েছেন।

তথ্যসূত্র: ফোর্বস, সিএনএন, মিড ডে ডটকম

 

ঢাকা/তারা

রাইজিংবিডি.কম

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়