RisingBD Online Bangla News Portal

ঢাকা     বৃহস্পতিবার   ২২ অক্টোবর ২০২০ ||  কার্তিক ৭ ১৪২৭ ||  ০৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

ইলিশ ঘাটে জেলের মলিন মুখ

রফিকুল ইসলাম মন্টু || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ০৯:০৮, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২০   আপডেট: ০৯:২৯, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২০
ইলিশ ঘাটে জেলের মলিন মুখ

‘মৌসুম তো প্রায় শেষ। হিসাবের খাতায় এখনও লোকসান! এই ঘাটতি কবে পূরণ হবে জানি না। মৌসুমের প্রথম দিকে জালে ধরা পড়েনি ইলিশ। মৌসুমের শেষ দিকে এসে দু’দিন ইলিশ ধরা পড়েছে তো পাঁচদিন জাল শূন্য। গত বছরের চেয়ে এবারের অবস্থা খারাপ! অবস্থা এমন থাকলে এ বছর লাভের মুখ দেখার কোনো সুযোগ নাই।’

কথাগুলো সমুদ্র মোহনার দ্বীপ ঢালচরের মৎস্যজীবী তৈয়ব মাঝির। মৌসুমের শেষে এসেও তার খাতায় লাভের অংশ যোগ হয়নি। ভাগীদের কী দেবেন, নিজে কী নেবেন- হিসাবে মেলাতে পারছেন না। মৎস্যজীবী নুরুদ্দিন মাঝি, জসিম মাঝি, মোতালেব হোসেন, দেলোয়ার হোসেনসহ আরও অনেকে সুর মেলালেন তৈয়ব মাঝির সঙ্গে।  

ভরা মৌসুমেও মেঘনা-তেঁতুলিয়া-বলেশ্বরসহ আশপাশের নদীতে কাঙ্ক্ষিত ইলিশ মিলছে না। এমনকি লোকালয় থেকে সমুদ্রের ৪০ কিলোমিটার গভীরে জাল ফেলেও জেলেরা ইলিশ পাচ্ছে না। ঢালচরের জেলে, আড়তদারসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গভীর সমুদ্রে বড় ট্রলারগুলো কিছু ইলিশ পাচ্ছে। সে সংখ্যাও খুব কম। বড় এই ট্রলারগুলোকে বলে ‘ফিশিং’। অনেকে ‘ক্যান্টার’ও বলে। জেলেদের মধ্যে খুব কম সংখ্যকই গভীর সমুদ্রে যায়। অধিকাংশই জাল ফেলে সমুদ্রের মোহনায় এবং নদীতে। এই জেলেদের জালে ইলিশ ধরা পড়ছে না।  

‘এ বছর নদী-সমুদ্রে ইলিশ কেমন ধরা পড়ছে?’ প্রশ্নের উত্তরে ঢালচরের মৎস্যজীবী, ইলিশের আড়তদার-চালানি সবার মুখেই এককথা। অথচ ইলিশ ধরতে প্রতিদিন ট্রলারগুলোতে খরচ হচ্ছে অনেক টাকা। ঢালচর হাওলাদার ঘাট মৎস্য ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আলহাজ্জ মো. মোস্তফা বলেন, ‘আমরা ২০০০ সাল থেকে এই ঘাটে ইলিশের ব্যবসা করছি। এ বছর জেলেরা খুব কম ইলিশ পাচ্ছে। গভীর সাগরে যেসব জেলেরা যাচ্ছে, তাদের মধ্যে ৪-৫টি ট্রলার ইলিশ পাচ্ছে। বাকিগুলো খালি আসে। যারা ১২ হাত জাল ফেলে, তারাও বিগত বছর যে ইলিশ পেয়েছে, তার তুলনায় এ বছর পাচ্ছে না বললেই হয়। এভাবে চলতে থাকলে এবার কেউ ব্যবসা করে ঘাটে থেকে যেতে পারবে না।’

বঙ্গোপসাগরের মোহনার দ্বীপ ঢালচরের অবস্থান ভোলার চরফ্যাসন উপজেলায়। ঢালচরে বহু বছর আগে গড়ে উঠেছে ইলিশ আহরণ কেন্দ্র। ইলিশের মৌসুম শুরু হওয়ার আগেই বিভিন্ন স্থান থেকে এখানে এসে জড়ো হয় কয়েক হাজার ট্রলার। এসব ট্রলার সমুদ্র এবং নিকটবর্তী নদীতে ইলিশ আহরণ করতে যায় এবং ঢালচরের ইলিশ ঘাটে এসে নোঙর করে। ইলিশ আহরণকে ঘিরে ঢালচরে জমে ওঠে সব ধরনের ব্যবসাবাণিজ্য। কিন্তু এবছর ইলিশের পরিমাণ অনেক কম হওয়ায় ঘাটের ব্যবসায়ীরা হতাশ। ইলিশ ব্যবসায়ী ইউসুফ ফরাজী বলেন, ‘ঢালচরের ৯৯ শতাংশ মানুষ এই নদী ও মাছের সঙ্গে জড়িত। এমনিতেই মাছ নেই। তারপরও যা পাই; করোনার কারণে প্রকৃত মূল্য পাই না।’

ইলিশ কেমন পড়ছে- বাস্তবে দেখার জন্য ২৪ ঘণ্টা একটি ইলিশ ট্রলারে অবস্থান করে দেখা গেছে, ইলিশ পাওয়া গেছে মাত্র ১২টি। এই ট্রলারগুলো লোকালয় থেকে প্রায় ৩৫-৪০ কিলোমিটার সমুদ্রের গভীরে যায়। সমুদ্রে জাল ফেলতে গিয়ে ট্রলারে একবার খরচ হয় ৫ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা। মৎস্যজীবী আলী হোসেন বলেন, ‘আমরা ইলিশ ধরার প্রস্তুতি নিয়েছি মৌসুম আসার প্রায় তিন মাস আগে থেকে। কিন্তু নদীতে আমরা তেমন ইলিশ পাচ্ছি না। ভাগীদের কয়েকজন চলে গেছে। দুই মাস হলো আমাদের ট্রলার ঘাটে বাঁধা। এ বছর সবাই লোকসানে আছি।’

একই কথা বললেন ঢালচরে ইলিশের আড়তের ম্যানেজার মো. ফারুক হোসেন। তিনি এ বছর অমাবশ্যার ত্রয়োদশীতে ইলিশ ধরার নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার দাবি করে বলেন, ‘প্রজনন মৌসুমের নিষেধাজ্ঞার তারিখ পিছিয়ে দিলে জেলে এবং আড়তদারেরা লাভবান হবে। প্রজনন নিষেধাজ্ঞার তারিখের ওপর লাভ-লোকসানের বিষয়টি নির্ভরশীল। গত বছর প্রজননকালীন নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছিল পূর্ণিমার একাদশীতে। ওই বছর জেলেরা তেমন লাভবান হয়নি। কিন্তু ২০১৮ সালে প্রজননকালীন নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছিল অমাবশ্যার ত্রয়োদশীতে। সে বছর জেলেরা লাভবান হয়েছিল।’

ঢালচর ছাড়াও এই প্রতিবেদন লেখার প্রয়োজনে কথা হয় ভোলার চরফ্যাসনের কুকরি মুকরি ইলিশ ঘাট, আট কপাট ইলিশ ঘাট, পাঁচ কপাট ইলিশ ঘাট, বকশি, সামরাজ, পটুয়াখালীর চরমোন্তাজ, লক্ষ্মীপুরের মতিরহাট, লুধুয়াসহ আরও কয়েকটি ঘাটের জেলেদের সঙ্গে। সব স্থান থেকেই পাওয়া যায় হতাশার খবর ।  

সমুদ্রের নিকটবর্তী ঘাটগুলোতে দাম কম থাকায় জেলেরা ইলিশের প্রকৃত মূল্য পাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন অনেকেই। তবে কিছুটা উপরের দিকে এসে ইলিশের মূল্য বেশ চড়া। ঢালচরে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সেখানে ইলিশের মূল্য গত বছরের তূলনায় অনেক কম। ১০৫০ গ্রাম থেকে ১৩০০ গ্রাম ওজনের এক হালি ইলিশের মূল্য ঢালচরে ৩০০০ টাকা। একই ইলিশ ঢাকায় বিক্রি হচ্ছে প্রতি হালি ৪০০০ টাকা কিংবা তারও ওপরে। গত বছর ঢালচরে এই ইলিশ বিক্রি হয়েছে ৩৫০০-৩৬০০ টাকায়। ৬০০ গ্রাম থেকে ১০০০ গ্রামের ইলিশ ঢালচরের এখনকার বাজারে বিক্রি হচ্ছে ১৪০০ টাকায়। একই ইলিশ ঢাকায় বিক্রি হচ্ছে ১৫০০-১৬০০ টাকায়। গত বছর ঢালচরে এই ইলিশের মূল্য ছিল ১৬০০ টাকা।  

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনুকূল পরিবেশ না পেলে ইলিশ নদীতে আসে না। নদীতে অনেক স্থানে ডুবোচর আছে। পদ্মার কাছাকাছি এলাকায় রয়েছে দূষণ। এ কারণে ইলিশের চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তবে এখনও প্রায় একমাস সময় আছে। নদীতে ইলিশ আসার সময় ফুরিয়ে যায়নি।

ঢাকা/তারা

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়