RisingBD Online Bangla News Portal

ঢাকা     রোববার   ০১ নভেম্বর ২০২০ ||  কার্তিক ১৭ ১৪২৭ ||  ১৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

কে রাখে নিখোঁজ জেলেদের খোঁজ

রফিকুল ইসলাম মন্টু || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৩:১৫, ১৬ অক্টোবর ২০২০   আপডেট: ১৩:২৭, ১৬ অক্টোবর ২০২০
কে রাখে নিখোঁজ জেলেদের খোঁজ

নিখোঁজ জেলে বাবুল হোসেনের ছবি দেখছেন তার স্ত্রী মমতাজ বেগম

ইলিশ বেড়েছে নাকি কমেছে?- সে হিসাব আছে অনেকের কাছেই। সরকারের খাতায় ইলিশ আহরণের হিসাব উর্ধ্বমূখী। জেলে-আড়তদারদের কেউ লাভে, কেউ লোকসানে, এভাবেই চলছে বছরের পর বছর। আয়-ব্যয়ের এই হিসাব সবার কাছে থাকলেও ইলিশ ধরতে গিয়ে নিখোঁজ কিংবা প্রাণ হারানো জেলেদের খবর রাখেন ক’জন?

গভীর সমুদ্রে ইলিশ ধরতে গিয়ে প্রতিবছর অনেক জেলে নিখোঁজ হন। এদের কারো লাশ ফিরে আসে পরিবারের কাছে, অনেকের পরিবার জানতেই পারে না নিখোঁজ জেলে বেঁচে আছেন নাকি দুনিয়া থেকে চির বিদায় নিয়েছেন। বহু বছর পরে কালেভদ্রে দু’একজন ফিরে আসে বলে হতভাগ্য পরিবারের সদস্যরা আশায় বুক বাঁধেন- হয়তো একদিন ফিরবে তার স্বজন। কিন্তু অপেক্ষার প্রহর তাদের শেষ হয় না।

তিন মাসের শিশু কোলে নিখোঁজ জেলে আলী আজগরের স্ত্রী মোসা. শিলা

সমুদ্র উপকূলবর্তী চর মনোহর গ্রামে কান পেতে শুনি কান্নার শব্দ। বুক ফাটা আহাজারি। এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়ি যাই, একই দৃশ্য- শোকের ছায়া গ্রামজুড়ে। এই গ্রামটি দ্বীপ জেলা ভোলার চরফ্যাসন উপজেলার দ্বীপ ইউনিয়ন মুজিবনগরে। চলতি বছরের আগস্ট মাসে এই গ্রামের ৭ জন জেলে নিখোঁজ হয়েছেন। সকলেই প্রতিবেশী এবং আত্মীয়-স্বজন। ফলে গ্রামে নিখোঁজ মানুষগুলোর খোঁজ নিতে গেলে সবার আহাজারিতে বাতাস ভারী হয়ে ওঠে

সমুদ্রগামী বড় ট্রলারে জেলে ছিলেন ১৭ জন। সেদিন ১০ জন জীবিত ফিরে আসতে পেরেছিলেন, বাকিরা ফেরেননি। আলমগীর হোসেন (৩৭), জাকির হোসেন (৩৫), সামসুদ্দিন (৪৮), আবু কালাম ফরাজী (৪২), বাবুল হোসেন (৪০), আবু কালাম ফরাজী (৪৫) এবং আলী আজগর (২৫)- প্রত্যেকের ঘরে গিয়ে দেখি কান্নার রোল। এখনও কেউ স্বাভাবিক হতে পারেননি। ‘কী খবর নিয়া আইছো রে? আমরা তিনটা মাইয়া এতিম করে দিয়া চইলা গেছে। আমারে থুইয়া গেছে। তোমরা কোন খবর পাইছ তার?’ নিখোঁজ জেলে জাকির হোসেনের বাড়িতে পা রাখতেই ঘরের ভেতর থেকে এই বিলাপ কানে আসে। ঘরে ঢুকে দেখি মুখ চেপে কাঁদছেন অনেকেই। জাকিরের রেখে যাওয়া তিন লাখ টাকা ঋণ কীভাবে শোধ করবেন হাসিনা জানেন না। তিন তিনটি কন্যা সন্তান। বড় মেয়ে কমলা বিয়ের যোগ্য। অন্য দু’জনের মধ্যে লামিয়া পঞ্চম শ্রেণীতে পড়ে; ছোট মেয়ে সিনথিয়ার বয়স মাত্র ৪ বছর। হাসিনা বেগমের এলোমেলো নড়বড়ে দুই কক্ষের ঘর। এরই মধ্যে গাদাগাদি করে থাকেন সবাই। ‘বাবা কী বলেছিল যাওয়া সময়?’ লামিয়াকে প্রশ্ন করতেই কান্নায় ভেঙে পড়ে। কান্নার তোড়ে স্পষ্ট শোনা যায় না তার জবাব।

ঘরে টাঙানো ছেলে জিহাদের এনআইডি কার্ডের ছবি দেখে কাঁদছেন মা শাহেনুর বেগম

নজির আহম্মেদের বাড়ি ‘মাঝি বাড়ি’ বললে চেনে সবাই। এই মাঝির আট ছেলের মধ্যে সবার পেশা মাছ ধরা। সুন্দর সাজানো বাড়ি! বাড়ির প্রবেশ পথেই নিখোঁজ জেলে আলমগীর হোসেনের ঘর। বাড়িতে ঢুকতেই আলমগীরের ছয় বছরের ছেলে তামিম এবং এগারো বছরের মেয়ে লিজা আমার মুখের দিকে তাকায়। ছোট্ট চোখে-মুখে স্পষ্ট কৌতূহল। হয়তো শুনেছে ওর বাবার খবর নিয়ে এসেছে কেউ। ঘরের ভেতর থেকে আলমগীরের স্ত্রী রিফা বেগমের আহাজারি কানে আসে। আলমগীরের ঋণ প্রায় ৬০ হাজার টাকা। সে ছাড়া এই পরিবারের আর কেউ কর্মক্ষম নয়।

নিখোঁজ জেলে সামসুদ্দিনের বাড়ি চর মনোহর গ্রামে বেড়িবাঁধের ঢালে। নিজের জমি বলতে কিছুই নেই। সরকারি জমিতে বসবাস করছেন বহু বছর। একমাত্র জীবিকা ছিল মাছ ধরা। সেই মাছ ধরাই তার কাল হলো। সমুদ্র থেকে আর ফেরেননি। তিন সন্তান নিয়ে স্ত্রী সুরমা বেগম এখন চরম বিপাকে। খানিক দূরে বেড়িবাঁধের পাশের ছোট্ট একটি ঘরে থাকতেন আরেকজন নিখোঁজ জেলে আবু কালাম ফরাজী। ঘরে ঢুকতেই বাড়ি ভরে গেল লোকজনে। বহুজনের অনেক কথার ভিড়ে ঘরের ভেতর থেকে কালামের স্ত্রী রোকেয়া বেগমের আহাজারি- ‘কোন সাগরে ভাসাইয়া নিলো... কোন সাগরে ভাসাইয়া নিলো আমার ভাইরে...!’

নিখোঁজ জেলে ওয়ালিউল্লাহ মিয়ার ছবি দেখিয়ে কাঁদছেন স্ত্রী জাহানারা বেগম

নিখোঁজ জেলেদের মধ্যে আছেন আরও একজন আবু কালাম ফরাজী। তিনি রেখে গেছেন সাত ছেলেমেয়ে। বেশ বড় সংসার। সবচেয়ে ছোট সন্তানটির নাম সুমাইয়া। বয়স মাত্র ৪ বছর। সে অপেক্ষায় থাকে বাবা একদিন ফিরবে। বাবা তার জন্য অনেক মজা নিয়েই ফিরবে। কালাম ফরাজীর স্ত্রী মুক্তা বেগম কোনো কথাই বলতে পারলেন না। কালামের বড় ভাই শহীদ কথা বলতে গিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকেন। বললেন, ‘ভাইকে বলেছিলাম যাইস না। ভাই শোনে নাই।’ একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি স্বামীকে হারিয়ে বিপাকে মুক্তা বেগম। একই বাড়ির প্রবেশ দ্বারে নিখোঁজ জেলে বাবুল হোসেনের ঘর। ঘরে ঢুকতে হয়নি। বাইরেই দাঁড়িয়েছিলেন বাবুলের স্ত্রী মমতাজ বেগম আর তার তিন মেয়ে। ওরাও নির্বাক। খানিক দূরে চর মনোহর ক্লোজারসংলগ্ন সরকারি আশ্রয়ণ প্রকল্পের একটি ঘরে বাস করতেন নিখোঁজ জেলে আলী আজগর। মাত্র তিন মাসের বাচ্চা জান্নাতকে ঘুম পাড়াচ্ছিলেন আজগরের স্ত্রী শিলা বেগম। তার কান্নার শব্দে জেগে ওঠে শিশুটি। বিছানায় শুয়ে মায়ের সঙ্গে হাত-পা ছুঁড়ে সেও কাঁদে। ফলে কথা আর এগোয় না। আজগরের বাবা মহিউদ্দিন জানালেন, ছেলের শোকে দু’সপ্তাহ ইলিশ ধরা বন্ধ রেখেছিলেন। কিন্তু পেট তো মানে না! ফলে তাকেও ফিরে যেতে হয়েছে ইলিশের নৌকায়। এখন আর তিনি সমুদ্রের নোনা জলে মাছ খোঁজেন না, ছেলেকে খোঁজেন- যদি একবার পাওয়া যায়!

সাত জেলে নিখোঁজের ঘটনায় স্তব্ধ চর মনোহর গ্রাম। কিন্তু সাধারণের কী-ই বা করার আছে! সবাই খেটে খাওয়া মানুষ। ইলিশ ধরতে গিয়ে সেদিন কীভাবে ট্রলার ডুবে গিয়েছিল সেই গল্প শুনছিলাম গ্রামের আবদুল মোতালেব ফরাজীর কাছে। তিনি প্রবল ঝড়ের মুখে তুফানের সঙ্গে যুদ্ধ করে ডুবে যাওয়া ট্রলার থেকে জীবিত ফিরেছেন। ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে তিনি বললেন, সমুদ্রের অবস্থা খারাপ দেখে আমরা কিনারের দিকে ফিরছিলাম। হঠাৎ পাশ থেকে আসা প্রবল ঢেউয়ে ট্রলার উল্টে যায়। ট্রলার ধরে কয়েকজন বাঁচার চেষ্টা করেছে, কিন্তু ট্রলার থেকে যারা ছিটকে গিয়েছে তারা আর ফেরেনি। 

একসঙ্গে কয়েকজন জেলে নিহত হওয়ায় স্তম্ভিত উত্তর মাদ্রাজ গ্রামের মানুষ

গত বছর চরফ্যাসনের জিন্নাগড় ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের উত্তর মাদ্রাজ গ্রামে এমন আরেকটি ঘটনা ঘটেছিল। নিখোঁজ এবং লাশ পেয়েছেন, এমন কয়েকটি পরিবারের সঙ্গে আমার দেখা হয় এ বছর। গত বছর ইলিশ মৌসুমে উত্তর মাদ্রাজ গ্রামে যে শোক নেমে এসেছিল তা এখনও মুছে যায়নি। নিখোঁজ হওয়া পরিবারগুলোর সঙ্গে কথা বললেই বোঝা যায়, এরা কতটা অসহায়! স্বাভাবিক অর্থে ট্রলার নিখোঁজ, জেলে নিখোঁজ সংবাদমাধ্যমের জন্য ছোট একটি খবর। কিন্তু ওই ছোট খবরের আড়ালে পরিবারের অসহায়ত্বের বড় খবরগুলো অন্তরালেই থেকে যায়। এদের খোঁজ কেউ নেয় না। নিখোঁজ জেলেদের পরিবারগুলো বেশি বিপাকে পড়ে। মৃত ব্যক্তির লাশ পাওয়া গেলে সে হয়তো কোথাও থেকে সহযোগিতা পেতে পারে। কিন্তু লাশ পাওয়া না গেলে ওই ব্যক্তি যে প্রাণ হারিয়েছেন তার কোনো প্রমাণ পরিবার দেখাতে পারে না। তখন সব ধরনের  সাহায্য থেকে বঞ্চিত হয় পরিবার।

জীবনের নিরাপত্তা নেই। ট্রলারের মালিক পক্ষ কিংবা সরকারের তরফে নেই কোনো জীবন বীমার ব্যবস্থা। সারা জীবন হাড়ভাঙা খাটুনি দিয়েও এরা পারে না সামান্য অর্থ সঞ্চয় করতে। তবুও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সমুদ্রে মাছ ধরতে যেতে হয়। কারণ জীবিকা নির্বাহের এটাই একমাত্র পথ। বাংলাদেশের উপকূলে পাঁচ লাখের বেশি জেলে আছেন। এদের অধিকাংশই ছোটবেলা থেকেই এ পেশায় যুক্ত। ফলে মাছ ধরা ছাড়া অন্য কোনো পেশায় যাওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব হয় না। এদিকে নদী, সমুদ্রে যেতে আগের চেয়ে ঝুঁকি বেড়েছে। নানান ধরনের পরিবর্তন লক্ষ্য করছেন জেলেরা। আবহাওয়ার ওলটপালট খেলায় জেলেজীবনও আজ বিপর্যস্ত। ঝুঁকির এই পেশা যেন ক্রমেই অনিশ্চিত এক পেশায় পরিণত হচ্ছে।

ঢাকা/তারা

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়