RisingBD Online Bangla News Portal

ঢাকা     বুধবার   ২৮ অক্টোবর ২০২০ ||  কার্তিক ১৩ ১৪২৭ ||  ১১ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

প্রকৃতির পালাবদলে এখন হেমন্ত

শাহীন আনোয়ার || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ০৯:১০, ১৭ অক্টোবর ২০২০   আপডেট: ১২:৪৮, ১৭ অক্টোবর ২০২০
প্রকৃতির পালাবদলে এখন হেমন্ত

শুয়েছে ভোরের রোদ ধানের উপরে মাথা পেতে/ অলস গেঁয়োর মতো এইখানে কার্তিকের ক্ষেতে;/ মাঠের ঘাসের গন্ধ বুকে তার, চোখে তার শিশিরের ঘ্রাণ,/ তাহার আস্বাদ পেয়েছে অবসাদে পেকে ওঠে ধান।’

কী অসাধারণ লিখেছিলেন রুপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাস।  প্রকৃতির পালাবদলে এখন হেমন্ত।

দিগন্ত জোড়া মাঠে ধানক্ষেত।  কাঁচা পাকা ধানের শীষ বাতাসে দুলছে।  অগ্রহায়ণের মাঠে রচিত হবে ভিন্ন এক দৃশ্য।  চাষি ধান কেটে নেবে।  প্রকৃতি হয়ে উঠবে রুক্ষ।  শুকনো।  ধু ধু মাঠের ওপর সকাল-সন্ধ্যায় ভারী হয়ে জমবে সাদা শুভ্র কুয়াশা।  তারপর শীত এসে এই অবসন্ন প্রকৃতিকে নিষ্পেষিত করবে কনকনে ঠান্ডায়।  এভাবেই হাজার বছর ধরে প্রকৃতিতে হেমন্তের আসা যাওয়া।

বিকেলগুলো এখন স্বল্পায়ু।  চারটার পর থেকেই ছায়া ঘনিয়ে আসে।  পাঁচটায় সন্ধ্যা ছুঁই ছুঁই।  হেমন্ত এসেছে।  দিন আরো ছোট হয়ে আসবে ক্রমেই।  বরাবর এ সময়টায় বৃষ্টি থাকে না।  কিন্তু এবার বৃষ্টি যেন থামছেই না।  তাই অন্য বছরের মতো এবার হেমন্তের আগমন ভিন্ন।

কৃষিনির্ভর আমাদের জনজীবনে হেমন্ত আনন্দ-বেদনার কাব্যের মতো।  হেমন্ত মানে পাকা ধানের উপর সোনালি রোদ্দুর।  এই সোনালি ফসল ছায়াপাত করে কৃষিজীবীদের জীবনে।  অগ্রহায়ণ তো পাকা ফসলের ডালা সাজিয়ে আসছেই।  মাঠে মাঠে চোখে পড়ে তার প্রস্তুতি।  মেঘমুক্ত নীল আকাশ।  নীলের বাটি যেন উপুড় হয়ে পড়ে আছে হেমন্তের আকাশে।  শুভ্র শরতের পর ধোয়ামোছা পরিষ্কার আকাশ মন কেড়ে নেয়।  আহ! কী তৃপ্তির সুবাস বাতাসে।  মৌ মৌ গন্ধে মেতে ওঠে পাড়া।  শিশির স্নানে গাছের পাতারা আরও নির্মল সবুজ হয়ে ওঠে।

সন্ধ্যা নামার আগেই কুয়াশার হালকা চাদরে ঢাকা পড়ে সন্ধ্যার প্রকৃতি।  বাতাসে হিমেল আমেজ।  পাখির কলকাকলীতে মুখরিত ভোর। নাম না জানা হাজার রকমের পরিযায়ী পাখি মুখর করে তোলে বাংলার নদী-মাঠ-জলাশয়।  রক্তের রঙ বুকে মেখে হেসে ওঠে উষার আকাশ।  কী নির্মল কী সিগ্ধ-হাস্যোজ্জল! ভোরের সোনালী আলোয় দুর্বা ঘাসের ডগায় মুক্তো-দানা হয়ে টলমল করতে থাকে শিশির। কোথাও আবার নিঝুমতা ভেঙে ডেকে ওঠে ডাহুক।  আকাশে উড়ে বেড়ায় চেনা-অচেনা পাখির ঝাঁক।

নিকটতম বিল-ঝিল বা জলাশয়ের শোভা বর্ধন করে ফুটন্ত পদ্মফুল।  বাহারি কলমিলতাও কম যায় না।  কামিনী, গন্ধরাজ ও মল্লিকা ফুলে শোভিত হেমন্ত প্রকৃতি।  মেঠো ফুল, বুনোফল ও বনের সবুজতো আছেই।

হেমন্তের শেষভাগে চলে ফসল তোলার তোড়জোড়।  ধান কাটা ও ধান মাড়াইয়ে দিনমান ব্যস্ত থাকে গাঁয়ের কিষান-কিষানি।  শত ব্যস্ততায়ও অবসন্ন হননা তারা।  ক্লান্তিহীন কর্মমুখর জীবনে জড়িয়ে থাকে ফসলের হাসি- নবান্নের হাসি।

একদিকে আমন কাটার ধুম অন্যদিকে রবিশস্য বপণের প্রস্তুতি।  ধীরে ধীরে মাশকলাই, মটরশুটির ঘন সবুজ কচি চারায় ছেয়ে যায় মাঠ।  সরিষার হলুদ সমুদ্রে গন্ধে মাতোয়ারা চরাচর।  বিভিন্ন শাক সবজি ও মশলা যেমন- গাজর, কপি, আলু ও পেঁয়াজ রসুনের চাষ করতে দেখা যায়।  পতিত ভিটায় পড়ে থাকা মাচায় লাউ, সিম ও পুঁই এর কচি ডগা লকলকিয়ে বাড়তে থাকে।  চারদিকে তৃপ্তির অনাবিল হাসি-উল্লাস।

খুব ক্ষণস্থায়ী হেমন্ত অল্প সময়ের মধ্যেই বিভিন্ন রূপে নিজকে উপস্থাপন করে।  গাঢ় কুয়াশার সাথে ভারি রূপ নেয় শীত।  নতুন ধানে ভরে ওঠে আঙিনা।  ঘরে ঘরে তৈরি হয় নতুন চালের হরেক রকম পিঠা।  আগাম খেজুরের রস পাওয়া যায়।  নবান্ন উৎসবের সাথে খেজুরের রস নতুন মাত্রা যোগ করে।  গ্রাম বাংলার জলাশয় শুকিয়ে আসে।  মাঠ-ঘাট-হাওর-বাওর-বিলে পড়ে যায় মাছ ধরার ধুম। যেগুলো গ্রামবাংলার চিরচেনা ঐতিহ্যের কথা মনে করিয়ে দেয়।

হেমন্তকে বলা হয় অনুভবের ঋতু।  ম্লান, ধূসর, অস্পষ্ট।  তাকে যেভাবে অনুভব করা যায়, সেভাবে দেখা যায় না।  শীত, গ্রীষ্ম কিংবা বর্ষার মতো হেমন্ত তীব্র, প্রখর অথবা উন্মোচিত নয়।  বসন্তের মতো তার বর্ণ, গন্ধ, গরিমা নেই।  হেমন্ত মৌন, শীতল, বলা যায় অন্তর্মুখী।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘নৈবেদ্য স্তব্ধতা’ কবিতায় লিখেছেন-‘আজি হেমন্তের শান্তি ব্যাপ্ত চরাচরে/ জনশূন্য ক্ষেত্র মাঝে দীপ্ত দ্বিপ্রহরে/ শব্দহীন গতিহীন স্তব্ধতা উদার রয়েছে / পড়িয়া শ্রান্ত দিগন্ত প্রসার স্বর্ণশ্যাম ডানা মেলি।’

মাগুরা/শাহ মতিন টিপু

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়