Risingbd Online Bangla News Portal

ঢাকা     বুধবার   ২৮ জুলাই ২০২১ ||  শ্রাবণ ১৩ ১৪২৮ ||  ১৬ জিলহজ ১৪৪২

কেমন ছিল একাত্তরের ১৪ ডিসেম্বর

শাহ মতিন টিপু || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১০:০২, ১৪ ডিসেম্বর ২০২০   আপডেট: ১৭:৩৪, ১৫ ডিসেম্বর ২০২০
কেমন ছিল একাত্তরের ১৪ ডিসেম্বর

১৪ ডিসেম্বর শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস।  আজ আমরা দিবসটিতে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মরণ করছি। কিন্তু একাত্তরের এই দিনটি কেমন ছিল। কেমন ছিল সেদিন ঢাকার পরিবেশ। 

ফ্লাশব্যাকে ফিরে গেলে আমরা দেখতে পাই- একাত্তরের এইদিনে ঢাকা বিজয়ে প্রচণ্ড হামলা চলছিল রাজধানীর চারদিকে। নিয়াজিদের হৃৎকম্প তখন তুঙ্গে।  ১৩ ডিসেম্বর রাত থেকে ১৪ ডিসেম্বর ভোর পর্যন্ত পূর্ব ও পশ্চিম দিক থেকে মিত্রবাহিনীর কামান অবিরাম গোলা ছুড়েছে।  গভর্নর মালিকের মন্ত্রিসভা পদত্যাগ করে আশ্রয় নিয়েছে রেডক্রসে।

এতে নিয়াজির অবস্থা আরও করুণ হয়ে ওঠে।  জেনারেল নিয়াজি বারবার নিরাপদ আত্মসমর্পণ নিশ্চিত করতে ভারতের সেনাপ্রধান মানেকশ’র সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন।  আত্মসমর্পণের পর জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী ব্যবহার নিশ্চিত হতে চাইছেন জেনারেল নিয়াজিসহ পাকিস্তানি জেনারেলরা।

মিত্রবাহিনীর কামানের গোলা নিক্ষেপ হয় ঢাকা ক্যান্টনমেন্টেও।  সে গোলার আওয়াজে কাঁপছে গোটা শহর।  ঢাকার সবাই বুঝল, আর রক্ষা নেই। গভর্নর মালিক সেদিন সকালেই পরিস্থিতি বিবেচনার জন্য গভর্নর হাউসে মন্ত্রিসভার এক জরুরী বৈঠক ডাকলেন। বৈঠক বসল বেলা ১১টা নাগাদ।  মিত্রবাহিনীও প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই জেনে গেল এই বৈঠকের খবরটা।  কয়েক মিনিটের মধ্যেই একঝাঁক ভারতীয় জঙ্গী বিমান গভর্নর হাউসের ওপর রকেট ছুড়ল। গোটা পাঁচেক গিয়ে পড়ল গভর্নর হাউসের ছাদের ওপর। মালিক ও তার মন্ত্রীরা ভয়ে কেঁপে উঠলেন। মিটিংয়ে উপস্থিত চিফ সেক্রেটারি, আইজি পুলিশসহ বড় বড় অফিসাররা ভয়ে যে যেমনি পারলেন পালালেন।

বিমান হানার পর গভর্নর মালিক পাকিস্তানি মিত্রদের সঙ্গে আবার বসলেন। সঙ্গে সঙ্গে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিলেন। ঢাকার আন্তর্জাতিক রেডক্রস কমিটির প্রতিনিধি রেনডের কাছে আশ্রয় চাইলেন। রেনড ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলকে রেডক্রসের অধীনে ‘নিরাপদ এলাকা’ করে নিয়েছেন।  বহু বিদেশি এবং পশ্চিম পাকিস্তানি আশ্রয় নেয় ওই হোটেলে।

এ ঘটনার পর নিয়াজির অবস্থা আরও করুণ হয়ে ওঠে।  ঢাকার ওপর তখন প্রচণ্ড আক্রমণ চলছে। প্রধান লক্ষ্য কুর্মিটোলা ক্যান্টনমেন্ট। নিয়াজি তখনও মার্কিনিদের ভরসায় মুখে বলছে, শেষ পর্যন্ত লড়ে যাব।  কিন্তু ভেতরে ভেতরে নিরাপদ আত্মসমর্পণের জন্য মরিয়া। মার্কিন সপ্তম নৌবহর যে বঙ্গোপসাগরের দিকে এগোচ্ছে এ খবর চার-পাঁচদিন আগে থেকেই জানা ছিল। গোটা দুনিয়ায় তখন সপ্তম নৌবহরের বঙ্গোপসাগরে আগমন নিয়ে জোর জল্পনা-কল্পনা চলছে।

মার্কিন সরকার যদিও ঘোষণা করল যে, কিছু আমেরিকান নাগরিক অবরুদ্ধ, বাংলাদেশ থেকে উদ্ধার করে নিয়ে যাওয়ার জন্যই সপ্তম নৌবহর বঙ্গোপসাগরে যাচ্ছে। কিন্তু কেউ তা বিশ্বাস করল না। সবার মনে তখন প্রশ্ন, প্রেসিডেন্ট নিক্সন কী ইয়াহিয়াকে রক্ষার জন্য মার্কিন নৌবহরকে যুদ্ধের মাঠে নামাবেন? ঠিক কি উদ্দেশ্যে মার্কিন সপ্তম নৌবহর বঙ্গোপসাগরে এসেছিল, তা আজও রহস্যাবৃত।

মিত্রবাহিনী তখনও ঠিক জানে না যে, ঢাকার ভেতরের অবস্থাটা কী। পাকবাহিনী কিভাবে ঢাকার লড়াইয়ে লড়তে চায় এবং ঢাকায় তাদের শক্তিই বা কতটা। মিত্রবাহিনী মনে করল, ঢাকার ভেতরে লড়াই করার জন্য যদি সেনাদের এগিয়ে দেওয়া যায় এবং সঙ্গে সঙ্গে যদি বিমান আক্রমণ চালানো হয়, তবে লড়াইয়ে সাধারণ মানুষও মরবে। মিত্রবাহিনী এটা কিছুতেই করতে চাইছিল না। তাই ওইদিনই তারা একদিকে যেমন ফের পাকবাহিনীকে আত্মসমর্পণের আহবান জানালেন এবং তেমনি অন্যদিকে ঢাকার সাধারণ নাগরিকদের অনুরোধ করলেন, আপনারা শহর ছেড়ে চলে যান।  উত্তর এবং পূর্ব- রাজধানীর দুদিকেই তখন আরও বহু মিত্রসেনা এসে উপস্থিত।

অপরদিকে একাত্তরের ১৪ ডিসেম্বর বাঙালি জাতির ইতিহাসে এক বেদনা বিধুর দিন। মুক্তিযুদ্ধে চূড়ান্ত বিজয়ের মাত্র ৪৮ ঘণ্টা আগে বাঙালি জাতিকে চিরতরে মেধাশূন্য ও পঙ্গু করে দেওয়ার লক্ষ্যে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান শিক্ষক, সাংবাদিক, ডাক্তার, আইনজীবী ও গুরুত্বপূর্ণ সরকারি-বেসরকারি পেশাজীবীদের ধরে নিয়ে গিয়ে পৈশাচিক কায়দায় হত্যা করা হয়।

১৪ ডিসেম্বর দখলদার বাহিনী যখন ঢাকায় নির্দয়ভাবে বুদ্ধিজীবী হত্যা করছে, ঠিক তখন যৌথ বাহিনী ঢাকার উপকণ্ঠে তুরাগ নদীর পশ্চিম পাড়ে পৌঁছে গেছে। পশ্চিম ও পশ্চিম-উত্তর দিক থেকে ঢাকাকে ঘিরে ফেলে মুক্তিবাহিনী তৈরি করে কালিয়াকৈর-সাভার-মিরপুর-ঢাকা বেষ্টনী। অপরদিকে মুক্তিযুদ্ধের ৩ নম্বর সেক্টরের যোদ্ধারা ১৪ ডিসেম্বর রাতে পৌঁছে যায় ঢাকার বাসাবোতে এবং দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের একটি দল ডেমরায়।

এদিনই সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খান পূর্বাঞ্চলীয় দখলদার বাহিনী প্রধান নিয়াজী ও গভর্নর ড. মালিকের কাছে যুদ্ধ বন্ধের নির্দেশ দিয়ে এক তার বার্তা পাঠালে চূড়ান্তভাবে ভেঙ্গে পড়ে দখলদার বাহিনীর মনোবল।  তখন চূড়ান্ত বিজয় অর্জন সময়ের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়।

ঢাকা/টিপু

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়