Risingbd Online Bangla News Portal

ঢাকা     বুধবার   ০৪ আগস্ট ২০২১ ||  শ্রাবণ ২০ ১৪২৮ ||  ২৩ জিলহজ ১৪৪২

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ধরে রেখেছে সুতিহার দিঘি

আজমাল হোসেন মামুন || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৭:৩২, ১৯ জুলাই ২০২১  
সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ধরে রেখেছে সুতিহার দিঘি

‘মোরা এক বৃন্তে দু’টি কুসুম হিন্দু-মুসলমান।
মুসলিম তার নয়ন-মণি, হিন্দু তাহার প্রাণ’

জাতীয় কবি নজরুল-রচিত পঙ্‌ক্তি দুটির প্রতিফলন ঘটেছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের একটি গ্রামে। চার দশকেরও বেশি সময় গ্রামের হিন্দু এবং মুসলিম জনগোষ্ঠীকে একসূত্রে গেথে রেখেছে সুতিহার দিঘি৷

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলাধীন নাচোল উপজেলার নেজামপুর ইউনিয়নের গ্রাম বরেন্দা।  মাটির দেয়াল-ঘেরা ছোট ছোট ঘর, গাছগাছালিতে ভরপুর এই গ্রাম পাখিদের অভয়ারণ্য। এখানে ১০ শতাধিক মুসলিম এবং ৮ শতাধিক হিন্দু সম্প্রদায় বাস করে। এদের অধিকাংশই কৃষিজীবি। গ্রামের মানুষের পানির প্রয়োজন মেটায় এই দিঘির পানি। এলাকার মুসলমান সম্প্রদায় ‘আল্লাহর নেয়ামত’ এবং হিন্দু সম্প্রদায় ‘মা’ হিসেবে গণ্য করে এই দিঘিকে।

লোকমুখে শোনা যায়, ব্রিটিশ আমলে কিছু উপজাতি হিন্দু এবং মুসলমান ভারতের রাঢ় এলাকা থেকে এসে এই পতিত ভূমিতে নতুনভাবে বসতি স্থাপন করে। বন কেটে জমিগুলো আবাদযোগ্য করে তারা। গ্রামের নামও তাদের দেয়া- বরেন্দা। গ্রামে দুটি দিঘি রয়েছে। একটি সেতাহার, অপরটি সুতিহার দিঘি। সেতাহার এবং সুতিহার নাম নিয়েও রয়েছে গল্প। লোকমুখে প্রচলিত এরা দুই ভাইবোন। এদের নামানুসারে দিঘি দুটোর নামকরণ। সেতাহার দিঘি ব্যক্তি মালিকানাধীন হলেও সুতিহার দিঘি বরেন্দা গ্রামের সম্পদ।

১৯৯৮ সালে বরেন্দা গ্রামের ৭ তরুণ ‘যুব উন্নয়ন কেন্দ্র’ থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে যুব সমিতি গঠন করে। সমিতির নামে সুতিহার দিঘি জেলা প্রশাসনের কাছে লিজ নিয়ে মাছ চাষের উদ্যোগ নেয়। এতে সাধারণ মানুষ ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। কারণ তারা মনে করে মাতৃতুল্য এই দিঘি গ্রামের সবার। এ নিয়ে যুব সমিতি ও গ্রামবাসীর মধ্যে সংঘর্ষ থেকে মামলা পর্যন্ত হয়েছিল। ২০০১ সালে দু'পক্ষের সংঘর্ষে ১ জন প্রাণ হারান। এরপর উভয় পক্ষ মামলা করে। প্রায় ৪ বছর ধরে মামলা চলার পর জেলা প্রশাসন, আওয়ামী লীগের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত সভাপতি জিয়াউর রহমান এবং স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান মো. আব্দুল আওয়ালের উদ্যোগে মীমাংসা হয়। যুব সমিতিকে পুনর্গঠিত করে ৮০ সদস্যবিশিষ্ট ওই কমিটির নাম দেয়া হয় ‘বরেন্দা সার্বিক গ্রাম উন্নয়ন কমিটি’। ২০০৬ সাল পর্যন্ত দিঘির আয় থেকে মামলার খরচসহ ক্ষতিপূরণ দেয় নবগঠিত কমিটি। এরপর থেকে দিঘির মালিকানা গ্রামের প্রতিটি মানুষের।

জানা যায়, এই দিঘি থেকে মাছ চাষ করে প্রতিবছর আয় হয় প্রায় ১২ লাখ টাকা। টাকা ব্যয় করা হয় গ্রামের উন্নয়নে। মো. নুরুল ইসলাম নামে স্থানীয়  উন্নয়নকর্মী জানান, দিঘির আয় থেকে হিন্দুদের শ্মশানের জন্য জায়গা কিনে সীমানাপ্রাচীর দেয়া হয়েছে। হিন্দু সম্প্রদায়ের উপাসনার জন্য উপজেলার মধ্যে সবচেয়ে বড় ১টি মন্দির নির্মাণ করা হয়েছে। মন্দিরের নাম দেওয়া হয়েছে বরেন্দা সর্বজনীন মন্দির। 

মুসলমানদের জন্য দিঘির পূর্ব কোণায় বরেন্দা কেন্দ্রীয় গোরস্থান এবং দক্ষিণ পাড়ায় গোরস্থান তৈর করা হয়েছে। নির্মাণ করা হয়েছে গোরস্থান এবং ঈদগাহের সীমানা প্রাচীর। আরো নির্মাণ করা হয়েছে সমিতির নিজস্ব ক্লাব ঘর। গ্রামের প্রত্যেক পরিবারের বিশুদ্ধ খাবার পানির ব্যবহারও নিশ্চিত করা হয়েছে এই দিঘি থেকে প্রাপ্ত আয়ে। 

দিঘি থেকে উৎপাদিত কিছু মাছ প্রতি পরিবারের মধ্যে সমান ভাগে ভাগ করে দেয়া হয়। অসহায় গরিব মানুষের মেয়ের বিয়ে, প্রবীণদের চিকিৎসায় নগদ সহায়তা দেওয়া হয় সমিতির পক্ষ থেকে। সব মিলিয়ে সুতিহার দিঘিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে সম্প্রীতির বন্ধন। 

ঢাকা/তারা

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়