Risingbd Online Bangla News Portal

ঢাকা     বুধবার   ২২ সেপ্টেম্বর ২০২১ ||  আশ্বিন ৭ ১৪২৮ ||  ১৩ সফর ১৪৪৩

জুটি বাঁধতে সঙ্গীকে উপহার দেয় ক্ষুদে গাঙচিল

শামীম আলী চৌধুরী || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৮:৩০, ২৬ জুলাই ২০২১   আপডেট: ১৮:৩৯, ২৬ জুলাই ২০২১
জুটি বাঁধতে সঙ্গীকে উপহার দেয় ক্ষুদে গাঙচিল

লেখক ছবিগুলো রাজশাহীর পদ্মার চর থেকে তুলেছেন

সময়টা ছিল ২০১৭ সালের মার্চ। বন্যপ্রাণী গবেষক ও আলোকচিত্রী আদনান আজাদ আসিফকে সঙ্গী করে নৈশ কোচে রাজশাহীর উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। ভোরে রাজশাহী পৌঁছে সকালের নাস্তা সেরে বটতলা ঘাটে যাই। সেখানে অনিক নৌকা নিয়ে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল। দুপুরের জন্য প্রয়োজনীয় খাবার তুলে নিলাম নৌকায়। আমাদের উদ্দেশ্য পাখির খোঁজে পদ্মানদী চষে বেড়ানো।

নৌকায় বসেই বিভিন্ন পাখি সম্পর্কে আদনানের কথা শুনছিলাম। বিশেষ করে যে পাখি নিয়ে এই লেখা তার সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারি। আদনানের বর্ণনার পর থেকেই পাখিটি দেখার জন্য মন উসখুস করতে থাকে। যদি পাখিটির দেখা পেতাম! পদ্মার দুই ধারে তখন কৃষক জেগে ওঠা চরে ধানের বীজতলা তৈরির কাজে ব্যস্ত। চিরায়ত বাংলার নান্দনিক দৃশ্য। তাদের কিছু ছবি তুললাম।

আমাদের নৌকা পদ্মার বুক চিড়ে ঢেউ তুলে এগুচ্ছে, ঢেউ আর  হরেক প্রজাতির পাখির কাকলীতে মুখর পরিবেশ। কথার ফাঁকে ফাঁকে উড়ন্ত পাখিদের কিছু ছবি তুললাম। একইসঙ্গে আদনানের বর্ণনার সেই পাখি দেখার প্রবল ইচ্ছা কাজ করছিল তখন। পাকড়া মাছরাঙা, চকাচকি, বড় বক, ধুসর বকসহ বেশ কিছু পাখির ছবি তোলার পর আদনান নৌকার মাঝি অনিককে হাতের বাঁ দিকের একটা চরে যেতে বললে অনিক নৌকা ঘুরিয়ে ফেলল।

চরের প্রবেশ মুখে পৌঁছার আগেই আদনান অনিককে নৌকার ইঞ্জিন বন্ধ করতে বলল। কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই ও বলল, মিয়াভাই যে পাখির কথা বলছিলাম সেই পাখি সামনে বসে আছে। ওর কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে পাখিটিকে খুঁজতে লাগলাম।

নৌকা ভেসে চলছে। কিছুটা পথ সামনে যাবার পর পাখিটির দেখা পেলাম। আনন্দে আত্মহারা প্রায়। যদি পরে না পাই এই ভেবে দূর থেকে কয়েকটি রেকর্ড শট নিলাম। এরই মধ্যে আমাদের নৌকাও পাখিটির কাছাকাছি চলে এসেছে। আদনান ইশারায় নৌকায় শুয়ে পড়ার নির্দেশ দিলো।

যে পাখির সম্পর্কে বলছি, যদি তার জীবনচক্র সম্পর্কে কিছু না বলি তবে গল্প অসমাপ্ত থেকে যায়। প্রজননকালে জোড়া বাঁধতে ছেলেপাখিরা খুব ব্যস্ত হয়ে পড়ে। মেয়েপাখিটি নদীর ধারে বা কিছুটা শুকনো জায়গায় বালুর উপর বসে থাকে। পুরুষপাখি প্রেম নিবেদনের জন্য মেয়ে পাখিটিকে মাছ শিকার করে খাওয়ায়। বেশ কিছু পুরুষপাখি মেয়ে পাখিটিকে পাওয়ার জন্য প্রতিযোগিতায় নেমে পড়ে। পুরুষপাখিরা মাছ শিকার করে ঠোঁটে গেঁথে মেয়েপাখিটির কাছে আসে। এভাবে চলতে থাকে পুরুষপাখিদের প্রতিযোগিতা।

মেয়েপাখিটি যে পুরুষপাখিটিকে পছন্দ করে তার দেয়া মাছ ঠোঁটে নেয়। পুরুষপাখিটি আবারো ছুটে যায় মাছ শিকারের জন্য। আবার এর ব্যতিক্রমও ঘটে। একটি পুরুষপাখি থেকে ২-৩ বার মাছ নেবার পর অন্য পুরুষপাখির মাছও সে নেয়। প্রথম পাখিটি তা দেখতে পেলে দ্বিতীয় পুরুষপাখিকে তাড়া করে। এভাবে ৮-১০ বার মাছ খাওয়ার পর মেয়েপাখিটি পুরুষপাখির প্রেমে পড়ে। এরপর তারা সুখের সংসার বাঁধে। নৌকায় বসে আদনান এভাইে পাখিটির জীবনচক্রের বর্ণনা দিচ্ছিল।

ক্ষুদে গাঙচিল ২২-২৫ সে.মি. দৈর্ঘ্যের স্টারনুলা বংশের ও লরিদ পরিবারের ছোট আকারের সাদা সামুদ্রিক পাখি। এদের মাথার তাজ চাঁদি কুচকুচে কালো ও চোখ কাজল কালো। কপাল সাদা। খাটো লেজ চেরা। এদের ঠোঁট হলুদ এবং ঠোঁটের অগ্রভাগ বাদামি। পা ও পায়ের পাতা উজ্জ্বল হলুদ। পিঠের পালক ধূসর ও বুকতল সাদা। ছেলে ও মেয়েপাখির চেহেরায় ভিন্নতা নেই। তাই সহজে পৃথক করা খুব কঠিন। ক্ষুদে গাঙচিল উপকূল, নদী, মিঠাপানির হ্রদ, লবণাক্ত পানি ও জলাধারে বিচরণ করে। সচারচর ছোট ছোট দলে থাকে। প্রজননকালে ঝাঁকে দেখা যায়। অগভীর পানির সামান্য উপরে উড়ে পানিতে ঝাঁপ দিয়ে শিকার ধরে।

এদের খাদ্য তালিকায় রয়েছে ছোট ছোট মাছ, চিংড়ি জাতীয় অমেরুদণ্ডীয় প্রাণী ও পানির উপর ভাসমান পোকা। মার্চ থেকে মূলত এদের প্রজননের প্রস্তুতিকাল শুরু। মে-জুন মাস এদের প্রজননকাল। এ সময় বালুর চরে খোলা আকাশের নিচে কিছুটা বালু সরিয়ে গর্ত করে ঘাস বা তৃণ দিয়ে বাসা বানায়। নিজেদের বানানো বাসায় মেয়েপাখিটি ২-৩টি ডিম পাড়ে। দুধরাজ পাখির মতো এরাও প্রকৃতিতে হুমকির মুখে রয়েছে। ডিমে তা দেয়া থেকে শুরু করে ছানা ফোটানো পর্যন্ত এই সময়টুকু যুদ্ধ করেই বেঁচে থাকতে হয়। যেহেতু খোলা জায়গায় ডিম পাড়ে তাই মানুষের পায়ের চাপে ডিম নষ্ট হয়। আবার অনেক সময় সাপও এদের ডিম খেয়ে ফেলে। ছানা ফোটার পরও বিভিন্ন প্রাণী থেকে বেঁচে থাকার জন্য এদের লড়াই করতে হয়।

ক্ষুদে গাঙচিল বাংলাদেশের দুর্লভ আবাসিক পাখি। বরিশাল, চট্টগ্রাম, ঢাকা, খুলনা ও রাজশাহী বিভাগের নদী ও উপকূলে এদের বিচরণ দেখা যায়। এ ছাড়াও ইউরোপ, আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া, ভারত, পাকিস্তান ও এশিয়ার অনেক দেশেই এদের বিস্তৃতি রয়েছে। এরা বিশ্বের বিপদমুক্ত বলে বিবেচিত। বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী আইনে এই প্রজাতি সংরক্ষিত।

বাংলা নাম: ক্ষুদে গাঙচিল
ইংরেজি নাম: Little Tern
বৈজ্ঞানিক নাম: Sternula albifrons (Pallas, 1764)  

হাসনাত/তারা

সর্বশেষ