ঢাকা     সোমবার   ১৫ আগস্ট ২০২২ ||  শ্রাবণ ৩১ ১৪২৯ ||  ১৬ মহরম ১৪৪৪

ময়নামতীর চরের কবি

শাহ মতিন টিপু || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১০:১১, ২৭ জুন ২০২২   আপডেট: ১০:১১, ২৭ জুন ২০২২
ময়নামতীর চরের কবি

‘এবারে আমার শেষ হয়ে এলো/ প্রবাসের দিনগুলি/ যাবার বেলায় বারে বারে হায়/মন ওঠে তবু দুলি।/ কেটেছে হেথায় কয়টি বছর/সুখে-দুখে বেদনায়/ স্মরণ ভরিয়া রহিল সে সব/ভুলিব না কভু তায়।/ আমার স্মরণে তোমাদের ছবি/জেগে রবে অনুক্ষণ/ বিদায় এবার ফুরায়েছে মোর/প্রবাসের প্রয়োজন।’

লাইনগুলো কবি বন্দে আলী মিয়ার ‘বিদায় প্রহর’ শিরোনামের কবিতার। মৃত্যুর চার বছর আগে তিনি এই কবিতাটি লিখেছিলেন। কবিতাটি স্থান পেয়েছিলো তার ‘ধরিত্রী’ কাব্যে।

কবি বন্দে আলী মিয়ার ৪৩তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। তিনি ১৯৭৯ সালের ২৭ জুন রাজশাহীর কাজীহাটের বাসভবনে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা যান। পরে পাবনার রাধানগরের ‘কবিকুঞ্জ’তে তাকে সমাহিত করা হয়। 

বন্দে আলী মিয়াকে বলা যায়, গ্রামীণ জীবনের ভাষ্যকার। তার কবিতায় গ্রামীণ জীবনের স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি দেখতে পাওয়া যায়। 

পাঠক মনে আজও জেগে রয়েছে তার ‘ময়নামতীর চর’। ছবির মতোই এই চরের দৃশ্যপট তিনি এই কবিতায় এঁকে গেছেন। যার প্রশংসা করেছিলেন স্বয়ং কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। এই কবিতাটির জন্যই তার প্রথম কাব্যগ্রন্থের নামকরণ হয়েছিলো ‘ময়নামতীর চর’ । 

‘ময়নামতীর চর’ এর কয়েকটি লাইন-

এ-পারের এই বুনো ঝাউ আর ও পারের বুড়ো বট/মাঝখানে তার আগাছায় ভরা শুকনো গাঙের তট ;/এরি উঁচু পারে নিত্য বিহানে লাঙল দিয়েছে চাষী,/কুমীরেরা সেথা পোহাইছে রোদ শুয়ে শুয়ে পাশাপাশি/কূলে কূলে চলে খরমূলা মাছ, দাঁড়িকানা পালে পালে/ছোঁ দিয়ে তার একটারে ধরি’ গাঙ চিল বসে ডালে/ঠোঁটে চেপে ধরি’ আছাড়ি আছাড়ি নিস্তেজ করি তায়/মুড়ো পেটি লেজ ছিঁড়ি একে একে গিলিয়া গিলিয়া খায়।

রবীন্দ্রনাথ ‘ময়নামতীর চর’ সম্পর্কে লিখেছেন- ‘তোমার ময়নামতীর চর কাব্যখানিতে পদ্মাচরের দৃশ্য এবং তার জীবনযাত্রার প্রত্যক্ষ ছবি দেখা গেল। তোমার রচনা সহজ ও স্পষ্ট, কোথাও ফাঁকি নেই। সমস্ত মনের অনুরাগ দিয়ে তুমি দেখেছ এবং কলমের অনায়াস ভঙ্গিতে লিখেছ। তোমার সুপরিচিত প্রাদেশিক শব্দগুলো যথাস্থানে ব্যবহার করতে তুমি কুণ্ঠিত হওনি, তাতে করে কবিতাগুলো আরো সরস হয়ে উঠেছে। পদ্মাতীরের পাড়াগাঁয়ের এমন নিকটস্পর্শ বাংলা ভাষায় আর কোনো কবিতায় পেয়েছি বলে আমার মনে পড়ছে না। বাংলা সাহিত্যে তুমি আপন বিশেষ স্থানটি অধিকার করতে পেরেছ বলে আমি মনে করি।’ (২৬ জুলাই ১৯৩২)।

কবির জন্ম ১৯০৬ সালের ১৭ জানুয়ারি পাবনা শহরের রাধানগর মহল্লায়।   

বাবার নাম মুন্সী উমেদ আলী মিয়া এবং মা নেকজান নেসা। কবির শৈশব ও কৈশোর কেটেছে পাবনার গ্রামীণ ও নাগরিক পরিমন্ডলে। ১৯২৬ সালে তার বাবার ইচ্ছানুসারে শহরের জেলাপাড়া মহল্লার রাবেয়া খাতুনের সাথে তাঁর প্রথম বিয়ে হয়। পরবর্তী সময়ে তিনি আরো তিনটি বিয়ে করেন। ওই তিন স্ত্রীর নাম হেনা, শামসুন্নাহার ও পরীবানু। তিনি ১৯২৭ সালে কৃতিত্বের সাথে চিত্র বিদ্যায় ডিপ্লোমা কোর্স শেষ করেন ।

প্রায় ১৬ বছর কবি কলকাতায় করপোরেশন স্কুলে শিক্ষকতা করেন। কলকাতায় থাকার সুবাদে সমকালীন পত্রপত্রিকার সাথে কবি বন্দে আলী মিয়ার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এর কিছুদিন পর কবি ‘ইসলাম দর্শন’ -এর সাথে জড়িয়ে যান। করপোরেশন স্কুলে শিক্ষক থাকাকালে তিনি ‘কিশোর পরাগ’, ‘শিশু বার্ষিকী’, ‘জ্ঞানের আলো’ প্রভৃতি মাসিক পত্রিকার সম্পাদনার কাজেও জড়িত ছিলেন।

১৯৬২ সালে তিনি শিশুসাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য বাংলা একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন। পরে ১৯৬৫ রাজশাহী বেতারকেন্দ্রে স্ক্রিপ্ট রাইটার হিসেবে চাকরি নেন এবং একই বছর সাহিত্য-প্রতিভার স্বীকৃতি স্বরূপ পাকিস্তান সরকারের প্রেসিডেন্ট পুরস্কার লাভ করেন। কবি বন্দে আলী মিয়াকে ১৯৯০ সালে বাংলাদেশ সরকারের মরণোত্তর স্বাধীনতা পদকে ভূষিত করা হয়।

/টিপু/

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়