ঢাকা     সোমবার   ০৫ ডিসেম্বর ২০২২ ||  অগ্রহায়ণ ২১ ১৪২৯ ||  ০৯ জমাদিউল আউয়াল ১৪১৪

যে স্টেডিয়ামে খেলবেন মেসি রোনালদো নেইমার 

রামিন তালুকদার || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৭:৫৪, ১৯ নভেম্বর ২০২২   আপডেট: ১১:৫৩, ২১ নভেম্বর ২০২২
যে স্টেডিয়ামে খেলবেন মেসি রোনালদো নেইমার 

আধুনিক স্থাপত্যশৈলীর অনিন্দ্য সুন্দর উদাহরণ হয়ে ওঠা স্টেডিয়ামগুলো যেনো মরুর বুকে পদ্ম। শুধু বাহ্যিক সৌন্দর্য নয়, স্টেডিয়ামগুলোতে ব্যবহার করা হয়েছে সর্বাধুনিক প্রযুক্তি। দেশটির তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার কথা বিবেচনা করে স্টেডিয়ামগুলো শীতাতপনিয়ন্ত্রিত এবং পরিবেশবান্ধব। এক নজরে চোখ বুলিয়ে নেওয়া যাক নান্দনিক স্টেডিয়ামগুলোতে।

লুসাইল আইকনিক স্টেডিয়াম

রাজধানী দোহা থেকে প্রায় ২৩ কিলোমিটার উত্তরে লুসাইল শহরের কেন্দ্রবিন্দুতে স্টেডিয়ামটি অবস্থিত। দুই দশক আগেও দোহার বর্ধিত এই অংশে শহরের কোনো অস্তিত্ব ছিলো না। আধুনিক ও পরিকল্পিত শহরের এই ভেন্যু সবচেয়ে আলাদা ও আধুনিক। লণ্ঠনে দেখা আলো-ছায়ার পারস্পরিক প্রকাশ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তৈরি হয়েছে স্টেডিয়ামের নকশা। চারপাশে রয়েছে পানির কৃত্রিম ফোয়ারা। প্রবেশ পথে রয়েছে একটি বিশেষ সেতু। গরম আবহাওয়া নিয়ন্ত্রণে রাখতে সুবিশাল স্টেডিয়ামে থাকছে নিজস্ব সৌরশক্তিচালিত শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং উপরে কাচের বিশেষ আবরণ।

৭৬৭ মিলিয়ন ডলার খরচ করে পাঁচ বছর ধরে তৈরি করা এই স্টেডিয়ামের নকশা করেছে বিখ্যাত ব্রিটিশ প্রকৌশল প্রতিষ্ঠান ‘ফোস্টার প্লাস পার্টনার্স গ্রুপ লিমিটেড’। চারদিকে কৃত্রিমভাবে তৈরি করা হয়েছে সবুজের সমারোহ। বিশ্বের দশম বৃহত্তম এই ফুটবল স্টেডিয়ামে এক সঙ্গে ৮০ হাজার দর্শক দেখতে পারবেন মেসি-নেইমাদের ফুটবলশৈলী। প্রথম সেমিফাইনাল এবং ফাইনাল ম্যাচ এই স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হবে।  

স্টেডিয়াম ৯৭৪

বিশ্বকাপের অন্যতম বড় চমক ‘স্টেডিয়াম ৯৭৪’। স্টেডিয়ামটি স্থানান্তরযোগ্য। ভেন্যু নির্মাণ করতে ৯৭৪টি শিপিং কন্টেইনার ব্যবহার করা হয়েছে বলেই এমন নাম। এর মূল কাঠামো দাঁড়িয়ে আছে স্টিলের ওপর। স্পেনের স্থাপত্যবিষয়ক সংস্থা ‘ফেনউইক ইরিবারেন আর্কিটেক্টস’র ডিজাইন করা স্টেডিয়ামটি হামাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে কয়েক মিনিট দূরে অবস্থিত।

২০১৭ সালে শুরু হওয়া ৪৫ লাখ বর্গমিটারের স্টেডিয়ামটি ২০২১ সালের নভেম্বরে উদ্বোধন করা হয়। তখন এর নাম ছিল ‘রাসা আবু আবুদ’। দশ দিন পর নাম বদলে ফেলা হয়। বিশ্বকাপ শেষে স্টেডিয়ামটি ভেঙে ফেলা হবে! কাতার জানিয়েছে, কন্টেইনারগুলো খুলে অন্য একটি উন্নয়নশীল দেশে নিয়ে যাওয়া হবে যাতে তারা এই স্টেডিয়াম ব্যবহার করে নিজেদের ফুটবলের উন্নতি করতে পারে। বিশ্বকাপের ইতিহাসের প্রথম অস্থায়ী এই ভেন্যুর দর্শক ধারণ ক্ষমতা ৪০ হাজার। 

আল থুমামা স্টেডিয়াম 

স্টেডিয়ামটি তৈরি হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের ঐতিহ্যবাহী টুপি ‘গাহফিয়া’র আদলে। নকশা করেছেন কাতারের স্থপতি ইব্রাহিম এম জাইদাহ। পরিবেশ এবং প্রাসঙ্গিক স্থাপত্যকে গুরুত্ব দিয়ে এর নকশা করা হয়েছে। ভেন্যুটি দোহা থেকে ১২ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত। স্টেডিয়ামের চারদিকের ৫০ হাজার বর্গমিটার এলাকাজুড়ে একটি পার্ক তৈরি করা হয়েছে যার মধ্যে ৮৪ শতাংশ দেশীয় গাছ। ৪০ হাজার দর্শক ধারণ ক্ষমতার এই স্টেডিয়ামটির নির্মাণ খরচ ৩৪২ মিলিয়ন ডলার। বিশ্বকাপ শেষে এখানে একটি মসজিদ এবং হোটেল তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। এ কারণে স্টেডিয়ামের আসন সংখ্যা অর্ধেক কমিয়ে ফেলা হবে। বিশ্বকাপের মোট ৮টি ম্যাচ গড়াবে এই মাঠে। 

আল বায়াত স্টেডিয়াম

আল বায়াত স্টেডিয়াম দেখতে আরব বিশ্বের ঐতিহ্যবাহী বেদুইন তাঁবুর মতো। এটি দ্বিতীয় বৃহত্তম ভেন্যু। এই মাঠে বসে একসঙ্গে এক হাজার সংবাদকর্মী কাজ করতে পারবেন। স্টেডিয়ামটি পার্ল ডাইভিং এবং মাছ ধরার জন্য বিখ্যাত উত্তরের শহর আল খোরে অবস্থিত। স্টেডিয়ামের নকশা যেমন কাতারের অতীত এবং বর্তমানকে সম্মান করে, তেমনি শহরের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং ইতিহাসও তুলে ধরে। বিশ্বকাপ চলাকালে কাতারের তাপমাত্রা ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যেতে পারে। তাই তাপ থেকে বাঁচতে স্টেডিয়ামে বহনযোগ্য একটি ছাদ রয়েছে। এর নকশা তৈরি করেছে ডেলিভারি অ্যান্ড লিগ্যাসি এবং অ্যাসপায়ার জোন ফাউন্ডেশন। ২০১৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে এর নির্মাণ কাজ শুরু হয়। ২০২০ সালে হয় উদ্বোধন। ৬০ হাজার দর্শক ধারণ ক্ষমতার এই স্টেডিয়ামে ফিফা বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচ এবং দ্বিতীয় সেমিফাইনাল ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে। 

এডুকেশন সিটি স্টেডিয়াম

এটি এমন এক স্থান যেখানে অনেকগুলো বিশ্ববিদ্যালয়, স্পোর্টস অর্গানাইজেশন এবং গবেষণা কেন্দ্র অবস্থিত, যা বিশ্বে সুপরিচিত। এর নকশায় ফুটিয়ে তোলা হয়েছে ঐতিহাসিক ইসলামিক স্থাপত্য এবং আধুনিক প্রযুক্তির সংমিশ্রণ। এটা বিশ্বের সবচেয়ে বেশি পরিবেশবান্ধব স্টেডিয়ামগুলোর একটি। যেখানে ২০ শতাংশ সবুজ কাঁচামাল ব্যবহার করা হয়েছে। 

বাইরের দিকে স্টেডিয়ামটি একটি হীরার আকারের যার ডাকনাম ‘মরুভূমির হীরা’। ত্রিভুজাকৃতি এ নকশার রঙ সূর্যের স্থান পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নিজ থেকে পরিবর্তিত হতে থাকবে, দিনে চকচক করবে এবং রাতে করবে ঝলমল। ২০০৩ সালে এই স্টেডিয়াম নির্মাণ করা হলেও বিশ্বকাপ সামনে রেখে সংস্কার করা হয়েছে। এটি কাতারের অন্যতম ব্যায়বহুল স্টেডিয়াম যা তৈরি করতে ৭০০ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি খরচ হয়েছে। স্টেডিয়ামটিতে ৪০ হাজার দর্শক একত্রে খেলা উপভোগ করতে পারবেন। 

আহমেদ বিন আলী স্টেডিয়াম

কাতারের সবচেয়ে বিখ্যাত ফুটবল ক্লাব আল-রাইয়ান এসসির হোম ভেন্যু এটি। মরুভূমির প্রান্তে অবস্থিত এ শহর নিয়ে অনেক রূপকথার গল্প প্রচলিত রয়েছে স্থানীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে। তাদের সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যের প্রতীক প্রতিফলিত করে তৈরি করা হয়েছে এই স্টেডিয়াম। এর নকশার অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য উৎকলিত সম্মুখভাগ। রাতের আলো ঝলমলে স্টেডিয়ামটির সৌন্দর্য মুগ্ধকর। ২০০৩ সালে তৈরি করা এই স্টেডিয়ামের ধারণ ক্ষমতা বর্তমানে ৫০ হাজার। ম্যাচ চলাকালীন সর্বোত্তম আরাম নিশ্চিত করতে সমর্থকদের একটি লাইটওয়েট ক্যানোপি এবং উন্নত কুলিং সিস্টেমের মাধ্যমে সুরক্ষিত করা হবে। 

আল-জানোব স্টেডিয়াম

দোহার দক্ষিণের প্রাচীনতম এলাকাগুলোর একটি আল ওয়াকরাহতে অবস্থিত এই স্টেডিয়াম। এর নকশা উপকূলীয় শহরের সামুদ্রিক ঐতিহ্যের সঙ্গে মিলিয়ে কাতারের ঐতিহ্যবাহী ধো নৌকার বাতাসে ভরা পালের আকৃতি থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তৈরি করা হয়েছে। এতে থাকা বহনযোগ্য ছাদ এবং একটি উদ্ভাবনী কুলিং সিস্টেম বছরজুড়েই মাঠটি শীতল রাখে। প্রয়াত ব্রিটিশ-ইরাকি স্থপতি ডেম জাহা হাদিদ এই স্টেডিয়ামের ডিজাইন করেন। অনেকের মতে স্টেডিয়ামটি ‘মেয়েদের গোপনাঙ্গের’ মতো দেখায়। ডেম জাহা অবশ্য এই তুলনায় খেপে গিয়েছিলেন। ৪০ হাজার ধারণক্ষমতার এই স্টেডিয়ামটির পার্কিংয়ে একসঙ্গে ৫০ হাজার গাড়ি রাখা যাবে।  ২০১৪ সালে নির্মাণ কাজ শুরুর পর ২০১৯ সালে এর উদ্বোধন হয়। খরচের পরিমাণ ৬৫৬ মিলিয়ন ডলার। আতিথেয়তা এবং বিনোদনের সুবিধার্থে অবকাশ যাপনের সর্বাধুনিক সুবিধা সমন্বিত পার্ক দ্বারা বেষ্টিত স্টেডিয়ামটি আগামী দিনগুলোতে কাতারের পর্যটনে বিশেষ ভূমিকা রাখবে।  

খলিফা ইন্টারন্যাশনাল স্টেডিয়াম

আল রাইয়ান শহরে এই স্টেডিয়াম প্রথম চালু করা হয় ১৯৭৬ সালে। স্টেডিয়ামটির একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এতে রয়েছে আকর্ষণীয় নকশার দ্বৈত খিলান যার সঙ্গে আবার দীর্ঘ পথজুড়ে প্রশস্ত শামিয়ানা ছড়ানো। কাতারের সাবেক আমির খলিফা বিন হামাদ আল থানির নামানুসারে এর নামকরণ করা হয়। সংস্কারের পর ২০১৭ সালে পুনরায় এর উদ্বোধন করা হয়। স্টেডিয়ামটিতে অনেক আগে থেকেই জাতীয় ও আন্তর্জাতিক খেলাধুলা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। বর্তমানে স্টেডিয়ামটিতে মোট ৪৫ হাজার ৪১৬ জন দর্শক একসঙ্গে খেলা উপভোগ করতে পারবেন। বিশ্বকাপের তৃতীয় স্থান নির্ধারণ ম্যাচসহ আটটি ম্যাচ এখানে অনুষ্ঠিত হবে।

তারা//

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়