বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ধর্ষণের শাস্তি
সাতসতেরো ডেস্ক || রাইজিংবিডি.কম
ছবি: প্রতীকী
ধর্ষণ পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই জঘন্যতম অপরাধ হিসেবে বিবেচিত। তবে এই অপরাধের শাস্তি দেশভেদে ভিন্ন। কোথাও মৃত্যুদণ্ড, কোথাও যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, আবার কোথাও রাসায়নিক খোজাকরণ বা কেমিক্যাল ক্যাস্ট্রেশনের মতো কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ধর্ষণবিরোধী আইন আরও কঠোর করার দাবি জোরালো হওয়ায় বিভিন্ন দেশ নতুন নতুন শাস্তির বিধান যুক্ত করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু কঠোর শাস্তি নয়; দ্রুত বিচার, সামাজিক সচেতনতা এবং ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তবুও বিশ্বজুড়ে ধর্ষণের শাস্তি নিয়ে মানুষের আগ্রহ ও বিতর্ক বাড়ছে।
যেসব দেশে ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড
বর্তমানে কয়েকটি দেশে ধর্ষণের জন্য মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে। বিশেষ করে শিশু ধর্ষণ, সংঘবদ্ধ ধর্ষণ বা ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় এসব দেশে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
চীন, সৌদি আরব ও ইরান
চীনে ধর্ষণের ফলে ভুক্তভোগীর মৃত্যু বা গুরুতর শারীরিক ক্ষতি হলে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হতে পারে। সৌদি আরব ও ইরানে শরিয়া আইনের আওতায় ধর্ষণের জন্য মৃত্যুদণ্ডের নজির রয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতেও গুরুতর ধর্ষণ মামলায় মৃত্যুদণ্ডের বিধান আছে।
ভারত
ভারতে ২০১৮ সালে আইন সংশোধন করে ১২ বছরের কম বয়সী শিশুকে ধর্ষণের ঘটনায় মৃত্যুদণ্ডের বিধান যুক্ত করা হয়। এছাড়া সংঘবদ্ধ ধর্ষণ বা ধর্ষণের কারণে ভুক্তভোগীর মৃত্যু হলে সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে ফাঁসি দেওয়া যেতে পারে।
বাংলাদেশ
বাংলাদেশেও ২০২০ সালে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে সংশোধনী এনে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড যুক্ত করা হয়। তবে মানবাধিকার সংস্থাগুলোর একাংশের দাবি, শুধু শাস্তি বাড়ালেই অপরাধ কমে না; প্রয়োজন কার্যকর বিচারব্যবস্থা।
রাসায়নিক খোজাকরণ নিয়ে বিতর্ক
বিশ্বের কয়েকটি দেশে ধর্ষকদের জন্য কেমিক্যাল ক্যাস্ট্রেশন বা রাসায়নিক খোজাকরণের বিধান রয়েছে। এটি এমন একটি চিকিৎসাপদ্ধতি, যেখানে বিশেষ ওষুধের মাধ্যমে যৌন আকাঙ্ক্ষা বা সক্ষমতা কমিয়ে দেওয়া হয়।
পাকিস্তান
পাকিস্তান ২০২১ সালে ধর্ষণবিরোধী আইনে রাসায়নিক খোজাকরণের বিধান যুক্ত করে। বিশেষ করে সিরিয়াল বা সংঘবদ্ধ ধর্ষকদের ক্ষেত্রে এই শাস্তির কথা বলা হয়।
ইন্দোনেশিয়া
ইন্দোনেশিয়া শিশু ধর্ষণের ঘটনায় রাসায়নিক খোজাকরণ এবং কিছু ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ডের অনুমোদন দিয়েছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট জোকো উইদোদো শিশুদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতা ঠেকাতে এই কঠোর ব্যবস্থা চালু করেন।
দক্ষিণ কোরিয়া
দক্ষিণ কোরিয়া ২০১১ সালে শিশু যৌন অপরাধীদের জন্য রাসায়নিক খোজাকরণ আইন কার্যকর করে। পরে এর প্রয়োগ আরও বিস্তৃত করা হয়।
কোথাও স্থায়ী খোজাকরণের বিধান
বিশ্বের কিছু দেশে আরও কঠোর ব্যবস্থা হিসেবে সার্জিক্যাল ক্যাস্ট্রেশন বা স্থায়ী খোজাকরণের আইন রয়েছে।
মাদাগাস্কার সম্প্রতি শিশু ধর্ষকদের জন্য শল্যচিকিৎসার মাধ্যমে স্থায়ী খোজাকরণের আইন কার্যকর করেছে। বিশেষ করে ১০ বছরের কম বয়সী শিশুকে ধর্ষণের ঘটনায় এই শাস্তি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে
এছাড়া চেক প্রজাতন্ত্রেও কিছু যৌন অপরাধীর ক্ষেত্রে সার্জিক্যাল ক্যাস্ট্রেশনের নজির রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের অবস্থান
যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে রাসায়নিক খোজাকরণের বিধান থাকলেও ধর্ষণের জন্য মৃত্যুদণ্ড কার্যকর নয়। দেশটির সুপ্রিম কোর্ট ১৯৭৭ সালের এক রায়ে প্রাপ্তবয়স্ক নারী ধর্ষণের ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ডকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করে।
তবে সম্প্রতি লুইজিয়ানা অঙ্গরাজ্যে শিশু ধর্ষকদের জন্য সার্জিক্যাল ক্যাস্ট্রেশনের আইন পাস হয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম।
অন্যদিকে ইউরোপের বেশিরভাগ দেশ ধর্ষণের শাস্তি হিসেবে দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ডকে প্রাধান্য দেয়। মানবাধিকার ও বিচারিক ভুলের ঝুঁকির কারণে মৃত্যুদণ্ড বা স্থায়ী শারীরিক শাস্তির বিরোধিতা করে অনেক দেশ।
কঠোর শাস্তিই কি সমাধান?
বিশ্বজুড়ে ধর্ষণের শাস্তি যতই কঠোর হোক, গবেষক ও মানবাধিকারকর্মীদের অনেকেই মনে করেন, অপরাধ কমাতে শুধু শাস্তির ভয় যথেষ্ট নয়। দ্রুত বিচার, ভুক্তভোগীর সুরক্ষা, সামাজিক শিক্ষা এবং আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার কার্যকারিতা সমানভাবে জরুরি।
কারণ আইন যত কঠোরই হোক, তার সঠিক প্রয়োগ না হলে অপরাধ কমানো কঠিন। তাই ধর্ষণবিরোধী লড়াইয়ে প্রয়োজন শাস্তির পাশাপাশি সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনও।
বিশ্বব্যাপী যৌন সহিংসতার চিত্র
জাতিসংঘ, ইউনিসেফ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ও ইউএন ওমেনসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার গবেষণা ও পরিসংখ্যান অনুযায়ী— বিশ্বে প্রতি ৩ জন নারীর মধ্যে প্রায় ১ জন জীবনের কোনো না কোনো সময়ে শারীরিক বা যৌন সহিংসতার শিকার হন। প্রায় ২৬৩ মিলিয়ন নারী জানিয়েছেন, তারা সঙ্গী নন—এমন কারও দ্বারা যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছেন।
রয়টার্স ও দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বে প্রতি ৮ জন মেয়ের মধ্যে ১ জন ১৮ বছর বয়সের আগেই ধর্ষণ বা যৌন নিপীড়নের শিকার হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রকৃত সংখ্যা প্রকাশিত তথ্যের চেয়েও বেশি। কারণ বিশ্বের বহু দেশে ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতার বড় অংশই রিপোর্ট হয় না।
গবেষণায় দেখা গেছে— বিশ্বে ধর্ষণের মাত্র প্রায় ১০ শতাংশ ঘটনা আনুষ্ঠানিকভাবে রিপোর্ট হয়। ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের যৌন নির্যাতনের প্রায় ৮০ শতাংশ ঘটনাই প্রকাশ পায় না। অনেক দেশে ধর্ষণ মামলায় সাজা হওয়ার হার মাত্র ৫ থেকে ৩০ শতাংশের মধ্যে। বহু দেশে মামলা প্রমাণের জটিলতা, সামাজিক চাপ ও দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়ার কারণে অপরাধীরা শাস্তি এড়িয়ে যায়। বিশ্বের প্রায় ৩০ শতাংশ দেশে ধর্ষণবিরোধী মামলার জন্য কার্যকর প্রসিকিউশন গাইডলাইন নেই।
সূত্র: বিবিসি, রয়টার্স, দ্য গার্ডিয়ান, বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, হেলথ পলিসি ওয়াচ
ঢাকা/লিপি