ঢাকা     মঙ্গলবার   ০৯ জুন ২০২৬ ||  জ্যৈষ্ঠ ২৬ ১৪৩৩ || ২৩ জিলহজ ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

উড়তে চাওয়া এক নারীর গল্প

সাতসতেরো ডেস্ক || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ০৯:২৫, ৯ জুন ২০২৬   আপডেট: ০৯:২৮, ৯ জুন ২০২৬
উড়তে চাওয়া এক নারীর গল্প

অ্যামেলিয়া এয়ারহার্ট

বিশ শতকের শুরুর পৃথিবীটা আজকের মতো ছিল না। তখন নারীদের জন্য সমাজের নির্ধারিত গণ্ডি ছিল খুব ছোট। মেয়েদের কাজ ঘর সামলানো, সন্তান লালন-পালন আর সামাজিক নিয়ম মেনে চলা—এটাই ছিল প্রচলিত ধারণা। বিমান চালানো, দুঃসাহসিক অভিযান কিংবা বিশ্বরেকর্ড গড়া ছিল পুরুষদের ক্ষেত্র বলে ধরা হতো।

আরো পড়ুন:

কিন্তু সেই সময়েই এক তরুণী সব বাধা ভেঙে আকাশকে নিজের স্বপ্নের ঠিকানা বানিয়েছিলেন। তার নাম অ্যামেলিয়া এয়ারহার্ট। তিনি শুধু একজন পাইলট ছিলেন না; তিনি ছিলেন সাহস, স্বাধীনতা এবং নারীর সম্ভাবনার এক জীবন্ত প্রতীক।

শৈশবেই ছিল বাঁধন ভাঙার সাহস
১৮৯৭ সালের ২৪ জুলাই, আমেরিকার ক্যানসাস রাজ্যের ছোট্ট শহর অ্যাচিসনে জন্ম নেন অ্যামেলিয়া মেরি এয়ারহার্ট। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন প্রচলিত ধারণার বাইরে। যখন অধিকাংশ মেয়েকে পুতুল নিয়ে খেলতে উৎসাহিত করা হতো, তখন অ্যামেলিয়া গাছে চড়তেন, পাহাড় বেয়ে নামতেন, কাদায় খেলতেন, এমনকি রাইফেল দিয়ে শিকারও করতেন। তার মা এমি এয়ারহার্ট বিশ্বাস করতেন, ছেলে-মেয়ের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। এই শিক্ষাই অ্যামেলিয়ার আত্মবিশ্বাসের ভিত্তি তৈরি করে দেয়।

ছোটবেলায় একবার বাড়ির গুদামঘরের ছাদ থেকে কাঠের তৈরি স্লেডে চড়ে নিচে নামতে গিয়ে তিনি পড়ে যান। ঠোঁট কেটে গেলেও তার মন্তব্য ছিল, “এটা ঠিক ওড়ার মতো লাগল!” যেন সেদিনই আকাশ তাকে প্রথম ডাক দিয়েছিল।

আকাশের প্রেমে পড়া
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় কানাডার টরন্টোতে আহত সৈনিকদের সেবায় নার্সের সহকারী হিসেবে কাজ করতেন অ্যামেলিয়া। সেখানে যুদ্ধবিমান চালকদের গল্প শুনতে শুনতে তার মনে উড়ানের প্রতি আকর্ষণ আরও বাড়তে থাকে।

অবশেষে ১৯২০ সালের ডিসেম্বরে জীবনের মোড় ঘুরে যায়। মাত্র ১০ ডলার খরচ করে একটি ১০ মিনিটের বিমানভ্রমণে অংশ নেন তিনি। আকাশে উঠে নিচের পৃথিবীকে ছোট হয়ে যেতে দেখে তার মনে একটাই উপলব্ধি জন্ম নেয়—“আমাকে উড়তেই হবে।”

স্বপ্নের জন্য সংগ্রাম
কিন্তু স্বপ্ন পূরণের পথ সহজ ছিল না। সে সময় নারী পাইলট প্রায় ছিলই না। উড়ান শেখার খরচ জোগাড় করতে অ্যামেলিয়া ট্রাক চালক, ফটোগ্রাফার, স্টেনোগ্রাফারসহ নানা কাজ করেছেন।

তার প্রশিক্ষক ছিলেন নারী পাইলট অনিতা “নিতা” স্নুক। কয়েক মাসের মধ্যেই তিনি নিজের প্রথম বিমান কিনলেন—উজ্জ্বল হলুদ রঙের কিনার এয়ারস্টার। আদর করে নাম দিলেন ‘দ্য ক্যানারি’।

১৯২২ সালের ২২ অক্টোবর এই বিমান নিয়েই তিনি ১৪,০০০ ফুট উচ্চতায় উঠে নারী পাইলটদের জন্য একটি নতুন উড়ান রেকর্ড গড়েন।

প্রথমবার আটলান্টিক পাড়ি
১৯২৮ সালে অ্যামেলিয়ার জীবনে আসে বড় সুযোগ। প্রকাশক জর্জ পুটনামের উদ্যোগে তিনি “ফ্রেন্ডশিপ” নামের বিমানে করে আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দেন।

যদিও তিনি তখন যাত্রী ছিলেন, তবু বিশ্বের প্রথম নারী হিসেবে আকাশপথে আটলান্টিক পাড়ি দেওয়ার ইতিহাস গড়েন। কিন্তু এই সাফল্যেও তিনি পুরোপুরি সন্তুষ্ট ছিলেন না। কারণ তিনি জানতেন, একদিন তাকে নিজেই বিমান চালিয়ে এই মহাসাগর পেরোতে হবে।

একা আটলান্টিক জয়
১৯৩২ সালের ২০ মে সেই স্বপ্ন পূরণের যাত্রা শুরু হয়। চার্লস লিন্ডবার্গের ঐতিহাসিক একক উড়ানের পাঁচ বছর পর অ্যামেলিয়া একা লকহিড ভেগা বিমান নিয়ে উড়ে যান আটলান্টিকের ওপর দিয়ে। ঝড়, বরফ জমা, যান্ত্রিক ত্রুটি—সব বাধা অতিক্রম করে প্রায় ১৫ ঘণ্টা পর উত্তর আয়ারল্যান্ডে অবতরণ করেন।

এর মাধ্যমে তিনি বিশ্বের প্রথম নারী হিসেবে এককভাবে আটলান্টিক মহাসাগর অতিক্রম করেন এবং ইতিহাসের দ্বিতীয় ব্যক্তি হিসেবে এই কৃতিত্ব অর্জন করেন।

এই সাফল্যের জন্য তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ‘ডিস্টিংগুইশড ফ্লাইং ক্রস’ লাভ করেন—প্রথম নারী হিসেবে।

রেকর্ডের পর রেকর্ড
এরপর সাফল্য যেন তার নিত্যসঙ্গী হয়ে ওঠে। ১৯৩২ সালে তিনি প্রথম নারী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ননস্টপ একক উড়ান সম্পন্ন করেন।

১৯৩৫ সালে তিনি একা হাওয়াই থেকে ক্যালিফোর্নিয়া উড়ে যান—যা আগে কোনো মানুষই এককভাবে করতে পারেননি। তিনি প্রতিষ্ঠা করেন নারী পাইলটদের সংগঠন ‘নাইন্টি-নাইনস’, লেখালেখি করেন, বক্তৃতা দেন এবং নারীদের স্বাধীন ও সক্রিয় জীবনযাপনে উৎসাহিত করেন।

পৃথিবী প্রদক্ষিণের স্বপ্ন
অ্যামেলিয়ার শেষ বড় স্বপ্ন ছিল বিষুবরেখা বরাবর পৃথিবী প্রদক্ষিণ করা। ১৯৩৭ সালে নেভিগেটর ফ্রেড নুনানকে সঙ্গে নিয়ে তিনি বিশ্বভ্রমণের যাত্রা শুরু করেন। দক্ষিণ আমেরিকা, আফ্রিকা, ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া পেরিয়ে তারা নিউ গিনিতে পৌঁছে যান। তখন পর্যন্ত প্রায় ২২,০০০ মাইল পথ অতিক্রম করেছেন।
বাকি ছিল মাত্র ৭,০০০ মাইল।

রহস্যময় অন্তর্ধান
১৯৩৭ সালের ২ জুলাই নিউ গিনির লে শহর থেকে হাওল্যান্ড দ্বীপের উদ্দেশে উড়াল দেন অ্যামেলিয়া ও নুনান। গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই তাদের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। মার্কিন ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ অনুসন্ধান অভিযান চালানো হলেও তাদের কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। আজও অ্যামেলিয়া এয়ারহার্টের অন্তর্ধান বিশ্বের অন্যতম বড় বিমান-রহস্য হিসেবে রয়ে গেছে।

যে উত্তরাধিকার আজও বেঁচে আছে
অ্যামেলিয়া এয়ারহার্টের জীবন মাত্র ৩৯ বছরের ছিল, কিন্তু তার প্রভাব শতাব্দী পেরিয়েও অমলিন।
তিনি প্রমাণ করেছিলেন, সাহস থাকলে সমাজের তৈরি সীমারেখা ভেঙে দেওয়া যায়। তিনি দেখিয়েছিলেন, আকাশ কারও একার নয়।

আজ বিশ্বের অসংখ্য নারী পাইলট, নভোচারী, প্রকৌশলী ও বিজ্ঞানীর স্বপ্নের পেছনে কোথাও না কোথাও অ্যামেলিয়ার অনুপ্রেরণা কাজ করে।

তিনি একবার বলেছিলেন, “সাহসী হওয়াই সবচেয়ে কঠিন কাজ। বাকি সব সহজ।”

হয়তো তিনি হারিয়ে গেছেন প্রশান্ত মহাসাগরের কোথাও। কিন্তু যখনই কোনো নারী বিমান চালিয়ে মাটি ছেড়ে আকাশে উড়ে যান, তখন ইতিহাসের আকাশে আবারও ডানা মেলে উড়ে ওঠেন অ্যামেলিয়া এয়ারহার্ট।

ঢাকা/লিপি

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়