RisingBD Online Bangla News Portal

ঢাকা     সোমবার   ২৬ অক্টোবর ২০২০ ||  কার্তিক ১১ ১৪২৭ ||  ০৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

টাকা নয় সেবা দিতে ৩৫ বছর ছুটেছেন যে ডাক্তার

সাজেদ রোমেল || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১০:৩৪, ২৫ অক্টোবর ২০১৯   আপডেট: ০৫:২২, ৩১ আগস্ট ২০২০
টাকা নয় সেবা দিতে ৩৫ বছর ছুটেছেন যে ডাক্তার

চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে কর্মস্থলের চেয়ে চেম্বারে টাকা আয়, গ্রামে থাকতে না চাওয়ার সব সময়ের অভিযোগ থাকলেও ময়মনসিংহের এএসএম শহীদুল্লাহ ৩৫ বছর পার করলেন রোগীদের সেবায়।

ময়মনসিংহ মেডিক‌্যাল কলেজ থেকে পাস করে ১৯৮৪ সালে সরকারি চাকরি শুরু করেন তিনি। চাকরি জীবনে কয়েক বছর ছাড়া পুরো পেশা জীবন কাটিয়েছেন গ্রামের গরিব রোগীদের সেবায়।  এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে অবসরে যাওয়ার পর কিশোরগঞ্জের প্রেসিডেন্ট আব্দুল হামিদ মেডিক‌্যাল কলেজের কমিউনিটি মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ‌্যাপক ও উপাধ‌্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। 

কয়েক দশক আগে থেকে ময়মনসিংহ শহরে চিকিৎসা বাণিজ‌্য শুরু হলেও সেদিকে যাননি শহরেরই আকুয়ায় জন্ম নেয়া এই ডাক্তার। বরং সরকারি হাসপাতালে অতিরিক্ত সময় দিয়েছেন রোগীদের। এরপরও সময় পেলেই ছুটে যেতেন গ্রামে বিনামূল‌্যে চিকিৎসা সেবা দিতে। কিন্তু কখনো বাণিজ‌্যিক চেম্বারে বসেননি।

ডা. শহীদুল্লাহ রাইজিংবিডিকে বলেন, একদিন মানবসেবার জন‌্যই এ পেশায় এসেছিলাম। সে চেতনায় আজও আছি। সৎপথে থেকে মানসিক তৃপ্তি নিয়ে থাকার জন‌্যই চেম্বার বা অতিরিক্ত সময়ে টাকা রোজগারে যাইনি। বরং সে সময়টা গরিব রোগীদের দিয়ে শান্তি পাই। বিশেষ করে ত্রিশালে গরিব রোগীদের চিকিৎসা দিতে চলে যেতাম। এখন বয়স হলেও চেষ্টা করি মানুষের জন‌্য কিছু করার।

তার সহপাঠীরা বলেন, নানা লবিং-গ্রুপিং করে পদ-পদবি ও পদোন্নতি এবং শহরে বদলির চেষ্টার অভিযোগ শোনা যায় অনেক ডাক্তারের বিরুদ্ধে। কিন্তু সে পথে কখনো যাননি ডা. শহীদুল্লাহ। রোগীর চাপ কম থাকার সময় প্রকৃতিপ্রেমী ডা. শহীদুল্লাহ চলে যান পাহাড়, সমুদ্র, বনভূমিতে।

ডা. শহীদুল্লাহ পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়েন ছোটবেলা থেকে। পড়তে ভালোবাসেন জীবনানন্দ দাশের কবিতা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ‌্যমে যেমন প্রতি জুমআর দিনে কোরআন-হাদিস ও ইসলামী কোন ঘটনার সুন্দর বর্ণনা দেন। আবার শিক্ষক দিবসে ডা. সর্বপল্লী রাধকৃষ্ণানকে শ্রদ্ধা জানাতেও ভুলেন না তিনি।

আকুয়া জুবিলী কোয়ার্টার্সে প্রবীণ দুলন মিয়া বলেন, তাকে সব সময় দেখতাম এলাকায় চিকিৎসার সেবার পাশাপাশি নিয়মিত নামাজ পড়তেন। স্থানীয় দরিদ্র কলোনির নুরজাহান বেগম বলেন, পরিচিত- অপরিচিত কোনো রোগী গেলেই তিনি গুরুত্ব দিয়ে চিকিৎসা সেবা দেন। কখনো বিনামূল‌্যে ওষুধও দেন।

সরকারি চাকরি থেকে অবসরের সময় ডা. শহীদুল্লাহর এক ছাত্র নাদিরুজ্জামান হিমেল লিখেছেন, ‘স‌্যার, আপনার শিক্ষকতা জীবনের এক বর্ণিল অধ‌্যায়ের সমাপ্তি। আপনার কাছ থেকে সবসময়ই কিছু না কিছু পেয়েছি, সবচেয়ে বেশি পেয়েছি ভালবাসা।’ উত্তরের ডা. শহীদুল্লাহর সেই চিরায়ত কামনা, ‘ভাল মানুষ হও, ভাল চিকিৎসক হও’, যে শিক্ষা তিনি নিজের জীবনে চর্চা করেছেন সবসময়।’

আবার ছাত্র-ছাত্রীরাও তার নিষ্ঠা ও ভালোবাসার অশেষ কৃতজ্ঞতা জানান প্রতিনিয়ত। ওয়াহিদ হৃদয় নামের তার এক ছাত্র ফেসবুকে লিখেছেন, ‘কমিউনিটি মেডিসিনের মতো কঠিন সাবজেক্টটাতেও ১০০% পাসের রেকর্ড যে মানুষটার হাত ধরে তিনি আমাদের Asm Shahidullah স্যার। আমার দেখা সেরা পাঁচজন ভালো মানুষের একজন।’

বাবা এ এ সাইফুদ্দিন নূর এবং মা রাবেয়া আক্তার খাতুনের সন্তান ডা. শহীদুল্লাহ। নিজের এলাকায় কেউ তাকে ডাক নামে ডাকেন। আবার কেউ মাশরুক, অনেকে মশরুক এবং বয়স্ক গরিব মানুষরা মশশুক ডাক্তার নামেও ডাকেন। অমায়িক, ভদ্র, নির্মোহ হিসেবে পরিচিত  ডা. শহীদুল্লাহর স্ত্রী ফার্মাকোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডাক্তার শামীমা সুলতানা (এক সময় বাংলাদেশ বেতারের প্রথম শ্রেণির কণ্ঠশিল্পী ছিলেন)।  ডাক্তার দম্পতির ছেলে মোহাম্মদ হাসিন ইশরাক নিলয় কম্পিউটিার ইঞ্জিনিয়ার। মেয়ে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজে প্রথম বর্ষে অধ্যায়নরত।

ডা. শহীদুল্লাহ বলেন, ছোটবেলায় কবি শামসুল ফয়েজ অত্যন্ত যত্নসহকারে আমাদের পড়াশোনা দিক নির্দেশনা দিতেন। কিন্তু উনি জানেন না, এই প্রতিবেদকসহ অনেকেই ছোটবেলা থেকে তাকেই আদর্শ মেনে এসেছেন। কেউ স্বীকার করেন, কেউ করে না। সবচেয়ে বড় কথা, তিনি কোনো স্বীকৃতি বা পুরস্কার পান বা না পান, সৎ ও নিবেদিতপ্রাণ এই ডাক্তারের বড় স্বীকৃতি দেন তার রোগী এবং ছাত্র-ছাত্রীরা। তারা যে সবাই ডাক্তারের সুস্থ, সুন্দর, কর্মসফল দীর্ঘজীবন কামনা করেন, সেটাই বড় অনুপ্রেরণা।


ঢাকা/সাজেদ/সাইফ

রাইজিংবিডি.কম

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়